তাকলীদের অর্থ ও প্রকারভেদ

তাকলীদের দুটো অর্থ আছে একটি আভিধানিক, অপরটি পারিভাষিক বা শরীয়তে ব্যবহৃত। তাকলীদের আভিধানিক অর্থ হলো গলায় বেষ্টনী বা হার লাগানো। শরীয়তের পরিভাষায় তাকলীদ হলো কারো উক্তি বা কর্মকে নিজের জন্য শরীয়তের জরুরী বিধান হিসেবে গ্রহণ করা কেননা তার উক্তি বা কর্ম আমাদের জন্য দলীলরূপে পরিগণিত। কারণ উহা শরীয়তে গবেষণা প্রসূত। যেমন আমরা ইমাম আজম সাহেব (রহমতুল্লাহে আলাইহে) এর উক্তি ও কর্মকে শরীয়তের মাসআলার দলীলরূপে গণ্য করি এবং সংশ্লিষ্ট শরীয়তের দলীলাদি দেখার প্রয়োজন বোধ করি না।
হুসসামীর টীকায় রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর অনুসরণ অধ্যায়ের ৮৬ পৃষ্ঠায় ‘শরহে মুখতাসারুল মানার’ হতে উদ্ধৃত করা হয়েছে-

التَّقْلِيْدُ اِتبَاعُ الرَّجْلِ غَيْرَهُ فِيْمَا سَمِعَه يَقُوْلُ اَوْفِىْ فِعْلِه عَلى زَعْمِ اَنَّهُ مُحَقِّقٌ بِلَا نَظَرٍ فِى الدَّلِيْلِ

অর্থাৎ-তাকলীদ হলো কোন দলীল প্রমাণের প্রতি দৃষ্টিপাত না করে কোন গবেষকের উক্তি বা কৃত কর্ম শুনে তাঁর অনুসরণ করা।
‘নূরুল আনওয়ার’ গ্রন্থে তাকলীদের বর্ণনায় একই কথা বর্ণিত হয়েছে।
ইমাম গাযযালী (রাহমতুল্লাহে আলাইহে) ও কিতাবুল মুস্তাফা এর ২য় খণ্ডের ৩৮৭ পৃষ্ঠায় বলেছেন-

اَتَّقْلِيْدُ هُوَ قَبُوْلُ قَوْلٍ بِلَا حُجَّةٍ

অর্থাৎ তাকলীদ হলো কারো উক্তিকে বিনা দলীলে গ্রহণ করা।
মুসাল্লামুসছবুত গ্রন্থে বলা হয়েছে

اَلتَّقْلِيْدُ اَلْعَمْلُ بِقَوْلِ الْغَيْرِ مِنْ غَيْرِ حُجَّةٍ

(অর্থাৎ-তাকলীদ হলো কোন দলীল প্রমাণ ব্যতিরেকে অন্যের কথানুযায়ী আমল করা।)
উপরোক্ত সংজ্ঞা থেকে বোঝা গেল যে হুযুর আলাইহিস সালামের অনুসরণকে তাকলীদ বলা যাবে না। কেননা তার প্রত্যেকটি উক্তি ও কর্ম শরীয়তের দলীল। আর তাকলীদের ক্ষেত্রে শরীয়তের দলীলের প্রতি দৃষ্টিপাত করা হয় না। সুতরাং আমাদেরকে হুযুর আলাইহিস সালামের উম্মত হিসেবে অভিহিত করা হবে তার মুকাল্লিদ বা অনুসরণকারী হিসেবে গণ্য করা যাবে না। অনুরূপভাবে সাহাবায়ে কিরাম ও দ্বীনের ইমামগণও হুযুর আলাইহিস সালামের উম্মত মুকাল্লিদ নন। এরূপ সাধারণ মুসলমানগণ যে কোন আলিমেদ্বীনের অনুসরণ করে থাকেন, এটাকেও তাকলীদ বলা যাবে না। কেননা কেউ আলিমদের কথা বা কর্মকে নিজের জন্য দলীল রূপে গ্রহণ করে না। আলিমরা কিতাব দেখে কথা বলেন এ কথা উপলদ্ধি করে তাঁদেরকে মান্য করা হয়। যদি তাদের  ফতওয়া ভূল কিংবা কিতাবের বিপরীত প্রমাণিত হয় তখন কেউ তা গ্রহণ করবে না। পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানীফা (রাহমতুল্লাহে আলাইহে) যদি কুরআন বা হাদীছ বা উম্মতের সর্বসম্মত অভিমত দেখে কোন মাসআলা ব্যক্ত করেন তাও যেমনি গ্রহণযোগ্য আবার নিজস্ব কিয়াস বা যুক্তিগ্রাহ্য কোন মত প্রকাশ করলে তাও গ্রহণীয় হবে। এ পার্থক্যটা স্মরণ রাখা একান্ত দরকার।
তাকলীদ দুই রকমের আছে তাকলীদে শারঈ ও তাকলীদে গায়র শারঈ। শরীয়তের বিধান সম্পর্কিত ব্যাপারে কারো অনুসরণ করাকে তাকলীদে শারঈ বলা হয়। যেমন রোযা, নামায, যাকাত ইত্যাদি মাসাইলে ধর্মীয় ইমামদের অনুসরণ করা হয়। আর দুনিয়াবী বিষয়াদিতে কারো অনুসরণ করাকে তাকলীদে গায়র শারঈ বলা হয়। যেমন চিকিৎসকগণ চিকিৎসা শাস্ত্রে বু’আলী সীনাকে, কবিগণ দাগ, আমীর বা মির্যা গালিবকে এবং আরবী ভাষার দ্বিবিধ ব্যাকরণ নাহব ও ছরফের পণ্ডিতগণ সীবওয়াই ও খলীলকে অনুসরণ করে থাকেন। এ রকম প্রত্যেক পেশার লোকেরা তাদের নিজ নিজ পেশার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অনুসরণ করে থাকে। এ গুলো হলো দুনিয়াবী তাকলীদ।
আবার সুফীয়ানে কিরাম তাদের ওয়াজীফা ও আমলের ব্যাপারে নিজ নিজ মাশায়িখের উক্তি ও কর্মের অনূসরণ করে থাকেন। এটা অবশ্য দ্বীনী তাকলীদ কিন্তু শারঈ তাকলীদ নয়। বরং একে তাকলীদ ফিত তারীকত বলা হয়। কেননা এখানে শরীয়তের মাসাইলের হালাল হারামের ব্যাপারে অনুসরণ করা হয় না। হ্যাঁ যে কর্ম পদ্ধতির অনুসরণ করা হয় উহাও ধর্মীয় কাজ বৈকি।
তাকলীদে গায়র শারঈ কোন ক্ষেত্রে যদি শরীয়তের পরিপন্থী হয় তাহলে সে তাকলীদ হারাম। যদি ইসলাম বিরোধী না হয় তাহলে জায়েয। বৃদ্ধা মহিলারা আনন্দ বিষাদের সময় বাপ-দাদাদের উদ্ভাবিত কতগুলো শারীয়ত বিরোধী প্রথার অনুসরণ করে, ইহা হারাম। চিকিৎসকগণ চিকিৎসা শাস্ত্রের ব্যাপারে বু’আলী সীনা প্রমুখের অনুসরণ করে থাকেন, ইহা ইসলাম বিরোধী না হলে জায়েয। প্রথম প্রকারের হারাম তাকলীদকে কুরআন শরীফের বিভিন্ন আয়াতে নিষেধ করা হয়েছে এবং এ ধরনের তাকলীদকারীদের নিন্দা করা হয়েছে। এ সম্পর্কে নিম্নে কয়েকটি আয়াতের উল্লেখ করা হলো-

وَلَا تُطِعْ مَنْ اَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ اَمْرُه فُرُطًا

(তার কথা শুনবেন না, যার দিলকে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ করেছি যে নিজ প্রবৃত্তির বশীভূত ও যার কাজ সীমা লঙ্ঘন করেছে)

وَ اِنْ جَاهَدَ اكَ  عَلى اَنْ تُشْرِكَ بِى مَالَيْسَ لَكَ بِه عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا

এবং যদি তারা (পিতা-মাতা) তোমাকে এমন কোন বস্তুকে আমার অংশীদাররূপে স্বীকার করানোর চেষ্টা করে যার সম্পর্কে তোমার সম্যক ধারণা নেই তবে তাদের কথা শুনিও না।)

وَ اِذَا قِيْلَ لَهُمْ تَعَالَوْا اِلى مَا اَنْزل اللهُ وَاِلى الرَّسُوْلِ قَالُوْا حَسْبُنَا مَا وَجَدْ نَا عَلَيْهِ اَبَاءَنَا وَلَوْ كَانَ اَبَاءُهُمْ لَايَعْلَمُوْنَ شَيْأً وَّيَهْتَدُوْنَ

(এবং যখন তাদেরকে (কাফিরদেরকে) বলা হয় আল্লাহ তা’আলা যা অবতীর্ণ করেছেন, সে দিকে এবং রসূলের দিকে আগমন কর, তখন তারা বলতো ওই কর্মপন্থাই আমাদের জন্য যথেষ্ট যা আমাদের বাপ-দাদাদের মধ্যে অনুসৃত হয়ে আসছে। যদিও তাদের বাপ-দাদাগণ না কিছুই জানতো না সৎ পথে ছিল।

وَ اِذَا قِيْلَ لَهُمُ اتَّبِعُوْا مَااَنْزَلَ اللهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا اَلْفَيْنَا عَلَيْهِ ابَاءنَا (ط)

(যখন তাদেরকে বলা হতো আল্লাহর অবতীর্ণ প্রত্যাদেশ অনুযায়ী চলো, তখন তারা বলতো আমরা আমাদের বাপ-দাদাগণকে যে পথে পেয়েছি সে পথেই চলবো।
উল্লেখিত আয়াত ও এ ধরনের অন্যান্য আরও আয়াতে শরীয়তের মুকাবিলায় মূর্খ বাপ-দাদাগণের হারাম ও গর্হিত কার্যাবলীর অনুসরণ করার নিন্দা করা হয়েছে। তারা বলতো আমাদের বাপ-দাদাগণ যেরূপ করতেন আমরাও সেরূপ করবো সে কাজ জায়েয হোক বা না জায়েয। উল্লেখ্য যে উল্লেখিত আয়াতের সঙ্গে শারঈ তাকলীদ এবং ধর্মীয় ইমামগণের অনুসরণের কোন সম্পর্ক নেই। অতএব ঐ সমস্ত আয়াতের ভিত্তিতে ইমামগণের তাকলীদকে শিরক কিংবা হারামরূপে গণ্য করা ধর্মহীনতার নামান্তর। এ কথাটুকু স্মরণ রাখা দরকার। -সুত্রঃ জা’আল হক ১ম খন্ড-

ব্যক্তিগত তাকলীদের বর্ণনা

মিশকাত শরীফের কিতাবুল ইমারাতে মুসলিম শরীফের উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণিত আছে হুযুর আলাইহিস সালাম ইরশাদ ফরমান –

مَنْ اَتَاكُمْ وَاَمْرَكُمْ جَمِيْعٌ عَلى رَجُلٍ وَاحِدٍ يُرِيْدُ اَنْ يَّشُقَّ عَصَاكُمْ وَيُفَرِّقُ جَمَاعَتَكُمْ فَاقْتُلُوْهُ

অথাৎ – তোমরা সর্ব সম্মতিক্রমে কোন এক জনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছ, এমতাবস্থায় যদি অন্য কেউ তোমাদের নিকট এসে তোমাদের লাঠি (ঐক্য) ভেঙ্গে দিতে ও তোমাদের মাঝে দলা-দলি সৃষ্টির প্রয়াস পায়, তাহলে তোমরা তাকে হত্যা করে দাও।
এখানে ব্যক্তি বিশেষ বলতে ইমাম ও উলামায়ে দ্বীনকে বোঝানো হয়েছে। কেননা শরীয়ত বিরোধী কাজে সমকালীন শাসকের আনুগত্য জায়েয নয়।
ইমাম মুসলিম (রহমতুল্লাহে আলাইহে) তাঁর সংকলিত ‘মুসলিম শরীফে’ ইমারত শীর্ষক আলোচনায়,

بَابُ وُجُوْبِ طَاعَةِ الْاُمَرَاءِ فِىْ غَيْرِ مَعْصِيَةٍ

পাপাচার ব্যতীত অন্যান্য বিষয়ে শাসকের আনুগত্য করা ওয়াজির নামে একটি পৃথক অধ্যায় রচনা করেছেন। এ থেকে বোঝা যায় যে একজনের আনুগত্য করার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু।
মিশকাত শরীফে কিতাবুল ‘বুয়ূ’ ‘বাবুল ফারাইযে’ বুখারী শরীফের উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে: হযরত আবু মুসা আশআরী (রহমতুল্লাহে আলাইহে) হযরত ইবন মাসউদ (রহমতুল্লাহে আলাইহে) সম্পর্কে বলেছিলেন-

لَاتَسْئَلُوْا نِىْ مَادَامَ هَذَا الْحِيْرُ فِيْكُمْ

অর্থাৎ যতদিন এ আল্লামা (হযরত ইবন মাসউদ (রহমতুল্লাহে আলাইহে) আপনাদের মধ্যে থাকবেন ততদিন আমার নিকট মাসাইল জিজ্ঞাসা করবেন না । এতে বোঝা যায় সর্বোত্তম ব্যক্তির উপস্থিতিতে অপেক্ষাকৃত কম মাহাত্মের অধিকারী ব্যক্তির আনুগত্য করতে নেই এবং প্রত্যেক অনুসারী ব্যক্তির দৃষ্টিতে স্বীয় ইমাম সর্বশ্রেষ্ট বিবেচিত হন।
ফাতহুল কাদীর আছে-
মুসলমানদের শাসনকর্তা যখন জেনে শুনে মুসলমানদের জন্যে এমন একজন প্রশাসক নিয়োগ করলেন, যার থেকে অগ্রাধিকার পাওয়ার উপযূক্ত ও কুরআন হাদীসে অপেক্ষাকৃত অভিজ্ঞ ব্যক্তি রয়েছেন, তখন তিনি আল্লাহ, রসুল আলাইহিস সালাম এবং সাধারন মুসলমানদের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করলেন।

মিশকাত শরীফে ‘কিতাবুল ইমারাত’ এর ১ম পরিচ্ছেদ আছেঃ

وَمَنْ مَاتَ وَلَيْسَ فِىْ عنُقِه بَيْعَةٌ مَاتَ مَيْتَةً جَاهِلِيَّةً

(যে ব্যক্তি মারা গেল, অথচ তাঁর গলে বায়’আত বন্ধন রইল না । সে অজ্ঞতার মৃত্যুবরণ করলো।)
এখানে বায়’আত বলতে ইমামের বায়’আতের অর্থাৎ তাবলীদ বা অনুসরণ ও আওলিয়া কিরামের হাতে বায়’আত গ্রহণ এ উভয় প্রকারের বায়’আতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে? এখন বলুন, এ যুগে ভারতীয় ওহাবীগণ কোন সুলতানের বায়’আত গ্রহণ করেছেন?

তাকলীদের সমর্থনে এ কয়েকটি  আয়াত ও হাদীছের বর্ণনা করা হল। এগুলো ছাড়া আরও অনেক আয়াত ও হাদীছ উল্লেখ করা যেতে পারে। কিন্তু বক্তব্য সংক্ষেপ করার উদ্দেশ্যে এখানে ইতি টানা হলো।
এখন উম্মতের আমল পর্যালোচনা করে দেখুন তবে ‘তাবিয়ীনদের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত  সমস্ত উম্মত তাকলীদের পথে চলে আসছে অর্থাৎ যে নিজে মুজতাহিদ নয়, সে অপর একজন মুজতাহিদের  অনুসরণ করছে। উম্মতের ইজমা’র উপর আমল করার বিষয়টা কুরআন হাদীছ থেকে প্রমাণিত ও আবশ্যকীয়ও বটে।
আল্লাহ তা’আলা কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেছেনঃ

وَمَنْ يَّشَاقِقِ الرَّسُوْلَ مِنْ بَعْدِ مَاتَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعُ غَيْرَ سَبِيْلِ الْمُؤْمِنِيْنَ نُوَلِّهِ مَاتَوَلّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيْرًا

(সঠিক পথ প্রকাশিত হওয়ার পরেও যে ব্যক্তি রসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিরোধিতা করে, মুসলমানদের পথ ছেড়ে ভিন্ন পথে চলে, তাকে আমি তার স্বীয় অবস্থায় ছেড়ে দিব, এবং তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবো। এটা কতই না নিকৃষ্ট স্থান)
এ আয়াত থেকেও বোঝা গেল, সাধারণ মুসলমানদের জন্য মনোনীত যে পথ, সে পথ অবলম্বন করা ফরয বা অবশ্য কর্তব্য। তাকলীদের ব্যাপারে মুসলমানদের সার্বিক সম্মতি বা ইজমা রয়েছে।
মিশকাত শরীফের ‘আল ইতিসাম বিল  কিতাব ওয়াসসুন্নাহ’অধ্যায় আছে-

اِتَّبِعُوْا السَّوَادَ الْاَعْظَمَ فَاِنَّهُ مَنْ شَذَّشُذَّ فِى النُّارِ

(সর্ববৃহৎ দলের পদাঙ্ক অনুসরণ কর। কেননা, যে মুসলমানদের দল থেকে পৃথক রয়েছে, তাকে পৃথক ভাবে জাহান্নামে পাঠানো হবে।)
অন্য এক হাদীছে আরও আছে-

مَارَاَهُ الْمُؤْمِنُوْنَ حَسَنًا فَهُوَ عِنْدَ اللهِ حَسَنٌ

অর্থাৎ যে পথ ও মতকে মুসলমানরা ভাল জানেন, উহা আল্লাহর কাছেও ভাল ও পছন্দনীয় হিসেবে গণ্য।
এখন ভেবে দেখুন, বর্তমানে এবং এর আগেও সাধারণ মুসলমানগণ ব্যক্তি বিশেষের তাকলীদকে ভাল জ্ঞান করে আসছেন; মুকাল্লিদ বা অনুসারী হয়ে কালাতিপাত করছেন। এখনও আরব- আজমের মুসলমানগণ ব্যক্তি বিশেষের তাকলীদ বা অনুসরণ করে থাকেন। সুতরাং, যে লা মাযহাবী হল, সে ইজমায়ে উম্মতকে অস্বীকার করলো। ইজমা বা সর্ব সম্মত মতকে স্বীকার না করলে, হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাদিআল্লাহু আনহু) ও হযরত উমর ফারুক (রাদিআল্লাহু আনহু) এর খিলাফতকে কিরূপে প্রমান করবেন? তাঁদের খিলাফতও ইজমায়ে উম্মত থেকেই প্রমাণিত। যে ব্যক্তি এ দু’জনের মধ্যে যে কোন এক জনের খিলাফতকে অস্বীকার করে, সে কাফির হিসেবে গণ্য। (ফাতওয়ায়ে শামী ইত্যাদি কিতাব দেখুন) একই-ভাবে তাকলীদের ব্যাপারেও উম্মতের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
তাফসীরে খাযিনে وَكُوْنُوْا مَعَ الصَّادِقِيْنَ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গক্রমে বলা হয়েছে যে, হযরত আবু বকর (রাদিআল্লাহু আনহু) আনসারদেরকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, কুরআন শরীফে মুহাজিরগণকে صَادِقِيْنَ  (সত্যবাদী) আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইরশাদ করা হয়েছে- اُلَئِكَ هُمُ الصَّادِقُوْنَ (তারাই সত্যবাদী) এর পর তিনি বলেছিলেন- وَكُوْنُوْا مَعَ الصَّادِقِيْنَ (সত্যবাদীদের সাথে থাকুন) সুতরাং আপনারাও পৃথক খিলাফত কায়েম করবেন না, আমাদের সাথে থাকুন।
অনুরূপ আমিও লা মাযহাবীদেরকে বলছি সত্যবাদীরা তাকলীদ করেছ্নে, আপনারাও তাদের পথ অনুসরণ করুন অর্থাৎ মাযহাবের অনুসারী হোন।
আকলী বা জ্ঞান ও যুক্তি ভিত্তিক প্রমাণঃ এ পৃথিবীতে কোন লোক অপরের অনুসরণ ছাড়া কোন কাজই করতে পারে না। প্রত্যেক পেশা ও বিদ্যার নির্ধারিত রীতিনীতির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ লোকদের নির্দেশ পালন করতেই হয়। ধর্মীয় বিষয়সমূহ পার্থিব কর্মকান্ডের তুলনায় অনেক জটিল ও সমস্যাসঙ্কুল। অতএব, এতেও অভিজ্ঞ ধর্মীয় মনীষীদের অনুসরণ করতে হবে বৈকি।
ইলমে হাদীছের মধ্যেও তাকলীদের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। যেমন, বলা হয় অমুক হাদীছটি যাঈফ (দুর্বল), কেননা ইমাম বুখারী (রহমতুল্লাহে আলাইহে) বা অমুক মুহাদ্দিছ অমুক বর্ণনাকারীকে যঈফ (দুর্বল) বলেছেন। এখানে তাঁর অভিমতটা গ্রহন করাটাই হলো তাকলীদ।
কুরআনের কিরাতের ব্যাপারেও ক্বারীদের তাকলীদ করা হয়। যেমন, বলা হয়ে থাকে অমুক ক্বারী অমুক আয়াতটাকে এভাবে পড়েছে। কুরআনের স্বরচিহ্ন, اِعْرَاب আয়াত ايت ইত্যাদির ব্যাপারেও তাকলীদ করা হয়। যখন জামাআতে নামায আদায় করা হয়, তখন সমস্ত মুক্তাদী ইমামেরই তাকলীদ করেন। ইসলামী রাজ্যে সমস্ত মুসলমান একজন বাদশাহের তাকলীদ করে থাকেন। রেল গাড়ীর সমস্ত যাত্রী এক ইঞ্জিনেরই তাকলীদ করেন। মোট কথা, মানুষ প্রত্যেকটি কাজেই অপরের অনুসারী বা মুকাল্লিদ।
স্মর্তব্য যে, উল্লেখিত সব ক্ষেত্রে ব্যক্তি বিশেষের তাকলীদের বিষয়টি পরিস্ফুট হয়েছে। নামাযের মধ্যে ইমাম একজন ছাড়া দু’জন হয় না। ইসলামী রাজ্যের বাদশাহ দু’জন হয় না। সুতরাং শরীয়তের ইমামও একজন ছাড়া দুইজন কি করে সম্ভব?
মিশকাত শরীফে ‘কিতাবুল জিহাদ’ এর ‘আদাবুস সফর’ অধ্যায়ে আছেঃ

اِذَا كَانَ ثَلَاثَةٌ فِى سَفَرٍ فَلْيُؤَمِّرُوْا اَحَدَهُمْ

অর্থাৎ যখন তিনজন লোক ভ্রমনে বের হয়, একজনকে আমীর বা নেতা মনোনীত করা বাঞ্ছনীয়। -সুত্রঃ জা’আল হক ১ম খন্ড-

তাকলীদ সম্পর্কে তাফসীরকারক ও মুহাদ্দিছগণের অভিমত

প্রখ্যাত হাদীছ গ্রন্থ  ‘দারমী’র الاقتداء بالعلماء (আল ইকতিদাউ বিল উলামা) অধ্যায়ে আছেঃ

اَخْبَرْنَا يَعْلى قَالَ اَخْبَرْ نَا عَبْدُ الْمَلِكِ عَنْ عَطَاء اَطِيْعُوا اللهَ وَاطِيْعُوا الرَّسُوْلَ وَاُلِى الْاَمْرِ مِنْكُمْ قَالُوْا اُوْلُوالْعِلْمِ وَالْفِقْهِ

অর্থাৎ- আমাদেরকে ইয়া’লা বলেছেন। তিনি বলেন, আমাকে আবদুল মালিক বলেছেন, আবদুল মালিক‘আতা’ থেকে বর্ণনা করেছেন, আল্লাহর আনুগত্য কর, রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তোমাদের মধ্যে যারা আদেশ দাতা আছেন, তাদের আনুগত্য কর।’ ‘আতা’ বলেছেন এখানে জ্ঞানী ও ফিকহাবিদগণকে আদেশ প্রদানের অধিকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
তাফসীরে খাযিনে فَاسْئَلُوْا اَهْلَ الذِّكْرِ اِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ
(যদি তোমরা না জান, জ্ঞানীদের নিকট থেকে জিজ্ঞাসা করিও)
আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখা হয়েছেঃ

فَاسْئَلُوْا الْمُؤْمِنِيْنَ الْعلَمِيْنَ مِنْ اَهْلِ الْقُرْانِ

অর্থাৎ তোমরা ঐ সকল মুমিনদের নিকট থেকে জিজ্ঞাসা কর, যারা কুরআনের জ্ঞানে পারদর্শী।
তাফসীরে দুররে মানসুরে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখা হয়েছে- অর্থাৎ ইবনে মারদাওয়াই হযরত আনাস (রহমতুল্লাহে আলাইহে) থেকে বর্ণনা করেছেন, আনাস (রহমতুল্লাহে আলাইহে)বলেছেন আমি হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) কে বলতে শুনেছি যে, কতেক লোক নামায পড়ে, রোযা রাখে, হজ্বও জিহাদ করে; অথচ তারা মুনাফিক গণ্য হয়।
আরয করা হলঃ ইয়া রাসুলাল্লাহে (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) কি কারণে তাদের মধ্যে নিফাক (মুনাফিকী) এসে গেল? প্রত্যুত্তরে হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ ফরমালেন, নিজ ইমামের বিরূপ সমালোচনা করার কারণে। ইমাম কে? এ কথা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি ইরশাদ ফরমান আল্লাহ তা’আলা বলেছেন-
فَاسْئَلُوْا اَهْلَ الذِّكْرِ (الايته)
অর্থাৎ আয়াতে উল্লেখিত আহলে যিকরকে ইমাম বলা হয়।
তাফসীরে সাবীতে সুরা কাহাফের وَاذْكُرْ رَبَّكَ اِذَا نَسِيْتَ
আয়াতের  ব্যাখ্যায় লিপিবদ্ধ আছেঃ অর্থাৎ চার মাযহাব ছাড়া অন্য কোন মাযহাবের তাকলীদ বা অনুসরণ জায়েয নয় যদিও সে মাযহাব সাহাবীদের উক্তি, সহীহ হাদীছ ও কুরআনের আয়াতের  সহিত সঙ্গতিপূর্ণ হয়। যে এ চার মাযহাবের কোন একটির অনুসারী নয়, সে পথভ্রষ্ট এবং পথভ্রষ্টকারী। কেননা হাদীছ ও কুরআন কেবল বাহ্যিক অর্থ গ্রহণই হলো কুফরীর মূল।
সংশ্লিষ্ট হাদীছ সমূহঃ
মুসলিম শরীফের ১ম খন্ডে ৫৪ পৃষ্ঠায় اِنَّ الدِّيْنَ نَّصِيْحَةُ এর বর্ণনা অধ্যায়ে আছে-

عَنْ تَمِيْمُ الدَّارِىْ اَنَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ قَالَ الدِّيْنُ النَّصِيْحَةُ قُلْنَا لِمنْ قَالَ لِلّهِ وَلِكِتَابِه وَلِرَسُوْلِه وَلِاَئِمَّةِ الْمُسْلِمِيْنِ وَعَامَّتِهِمْ

অর্থাৎ ‘তামীম দারী’ থেকে বর্ণিত, হুযুর  (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ ফরমান, ধর্ম হলো কল্যাণ কামনা। আমরা (উপস্থিত সাহাবীগণ) আরয করলাম, কার কল্যাণ কামনা? তিনি ফরমালেন, আল্লাহর, তার কিতাবের, তার রসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর, মুসলমানদের, মুজতাহিদ ইমামগণের এবং সাধারণ মুসলমানদের। মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘নববীতে’ এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে।
(অর্থাৎ এ হাদীছ ‘উলামায়ে দ্বীন’কেও ইমামদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উলামায়ে দ্বীন এর কল্যান কামনার অর্থ হচ্ছে তাদের বর্ণিত হাদীছসমূহ গ্রহণ করা, শরীয়ত বিধিতে তাঁদের অনুসরন করা এবং তাদের সম্পর্কে ভাল ধারণা পোষণ করা। -সুত্রঃ জা’আল হক ১ম খন্ড-

তাকলীদ ওয়াজিব হওয়ার দলীলাদির বিবরণ

তাকলীদ যে ওয়াজিব, এটা কুরআনের আয়াত, সহীহ হাদীছ, উম্মতের কর্মপন্থা ও তাফসীরকারকদের উক্তি সমূহ থেকে প্রমাণিত। সাধারণ তাকলীদ হোক বা মুজতাহিদের তাকলীদ হোক উভয়ের প্রমাণ মওজুদ রয়েছে। (নিম্নে ওগুলো উপস্থাপন করা হল।)

(১) اِهْدِ نَاالصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيْمَ-صِرَاطَ الَّذِيْنَ اَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ

অর্থাৎ আমাদেরকে সোজা পথে পরিচালিত কর। ওনাদের পথে যাঁদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ।
এখানে সোজা পথ বলতে ওই পথকে বোঝানো হয়েছে, যে পথে আল্লাহর নেক বান্দাগণ চলেছেন। সমস্ত তাফসীর কারক, মুহাদ্দিছ, ফিকহবিদ ওলীউল্লাহ গাউছ কুতুব ও আবদাল হচ্ছেন আল্লাহর নেক বান্দা। তারা সকলেই  মুকাল্লিদ বা অনুসারী ছিলেন। সুতরাং তাকলীদই হলো সোজা পথ।
কোন মুহাদ্দিছ, মুফাসসির ও ওলী লা-মাযহাবী ছিলেন না। লা-মাযহাবী হলো ঐ ব্যক্তি যে মুজতাহিদ না হয়েও কারো অনুসারী নয়। অবশ্য মুজতাহিদ হয়ে কারো অনুসরণ না করলে তাকে লা- মাযহাবী বলা যাবে না। কেননা মুজতাহিদের জন্য তাকলীদ নিষিদ্ধ।

(২) لَايُكَلِّفُ اللهُ نَفْسًا اِلَّا وُسْعَهَا

(আল্লাহ তা’আলা কারো উপর ক্ষমতার অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পন করেন না)
এ আয়াত থেকে বোঝা গেল, আল্লাহ তা’আলা কারো উপর সাধ্যাতীত কার্যভার চাপিয়ে দেন না। সুতরাং যে ব্যক্তি ইজতিহাদ করতে পারে না, কুরআন থেকে মাসাইল বের করতে পারে না, তার দ্বারা তাকলীদ না করিয়ে প্রয়োজনী সমস্যার সমাধান বের করানো তার উপর ক্ষমতা বহির্ভূত কার্যভার চাপানোর নামান্তর। যখন গরীবের উপর যাকাত ও হজ্জ ফরয নয়, তখন অজ্ঞ লোকের মাসাইল বের করার কোন প্রয়োজন থাকতে পারে কি?

(৩) وَالسَّابِقُوْنَ الْاَوَّلُوْنَ مِنَ الْمُهَاجِرِيْنَ وَالْاَنْصَارِ وَالَّذِيْنَ اتَّبِعُهُمْ بِاِحْسَانٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوْاعَنْهُ

(যে সকল মুহাজির এবং আনসার অগ্রগামি যারা প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক পথে অগ্রসর হয়েছেন এবং পরবর্তী পর্যায়ে যারা সৎ উদ্দেশ্যে পূর্ববর্তীদের অনুগামী হয়েছেন, আল্লাহ তা’আলা তাদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তার (আল্লাহর) প্রতি সন্তুষ্ট।)
বোঝা গেল যে, যারা মুহাজির ও আনসারগণের অনুসরণ বা তাকলীদ করেন, আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট। এখানেও তাকলীদের কথা ব্যক্ত করা হয়েছে।

(৪) اَطِيْعُوا للهَ وَاَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ وَاُولِى الْاَمْرِ مِنْكُمْ

(আল্লাহর আনুগত্য কর, তাঁর রসুলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্যে যারা আদেশ প্রদানকারী রয়েছে, তাদেরও।) এ আয়াতে তিনটি সত্বার আনুগত্যের নির্দেশ  দেয়া হয়েছে-
(১) আল্লাহর (কুরআনের) আনুগত্য, (২) রসুলের (হাদীছের) আনুগত্য এবং (৩) আদেশ দাতাগণের (ফিকহাবিদ মুজতাহিদ আলিমগণ) আনুগত্য। লক্ষ্যণীয় যে, উক্ত আয়াতে- اَطِيْعُوْا (আতীউ) শব্দটি দু’বার ব্যবহৃত হয়েছে আল্লাহর জন্য একবার এবং রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ও আদেশ প্রদানকারীদের জন্য একবার। এর রহস্য হলো আল্লাহ যা হুকুম করবেন, শুধু তাই পালন করা হবে, তার কর্ম কিংবা নীরবতার ক্ষেত্রে আনুগত্য করা যাবে না। তিনি কাফিরদেরকে আহার দেন, কখনও কখনও তাদেরকে বাহ্যিকভাবে যুদ্ধে জয়ী করান। তারা কুফরী করলেও সাথে সাথে শাস্তি দেন না। এ সব ব্যাপারে আমরা আল্লাহকে অনুসরণ করতে পারি না। কেননা এতে কাফিরদেরকে সাহায্য করা হয়। কিন্তু নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ও মুজতাহিদ ইমামের প্রত্যেকটি হুকুমে, প্রত্যেকটি কাজে, এমন কি যে সমস্ত ক্ষেত্রে তাঁরা নীরবতা অবলম্বন করেন, সে সমস্ত ক্ষেত্রেও তাদের আনুগত্য করা যায়। এ পার্থক্যের জন্য اَطِيْعُوْا শব্দটি দু’বার ব্যবহৃত হয়েছে।
যদি কেউ বলে اُوْلِى الْاَمْرِ (উলীল আমর) দ্বারা ইসলামী শাসন কর্তাকে বোঝানো হয়েছে, এতে উপরোক্ত বক্তব্যে কোন রূপ তারতম্য ঘটবে না। কেননা শুধু শরীয়ত সম্মত নির্দেশাবলীতেই শাসনকর্তার আনুগত্য করা হবে, শরীয়ত বিরোধী নির্দেশাবলীর ক্ষেত্রে আনুগত্য করা হবে না। ইসলামী শাসনকর্তা হচ্ছেন কেবল হুকুম প্রয়োগকারী। তাঁকে শরীয়তের যাবতীয় আহকাম মুজতাহিদ আলিমগণের নিকট থেকে জেনে নিতে হবে। দেখা যাচ্ছে, আসল আদেশ প্রদানকারী হচ্ছেন ফিকহবিদ।
ইসলামী সুলতান ফিকহবিদ আলিমের বর্ণিত অনুশাসন জারী করেন মাত্র। সমস্ত প্রজাদের হাকিম বাদশাহ হলেও বাদশাহের হাকিম হচ্ছেন মুজতাহিদ আলিম। শেষ পর্যন্ত اُوْلِى الْاَمْرِ (উলিল আমর) হলেন মুজতাহিদ আলিমগণই। اُوْلِى الْاَمْرِ (উলীল আমর) বলতে যদি কেবল ইসলামী বাদশাহ ধরে নেয়া হয়, তাতেও তাকলীদ প্রমাণিত হয়। আলিমের না হলেও অন্ততঃ বাদশাহের তাকলীদতো প্রমাণিত হয়। মনে রাখতে হবে যে, এ আয়াতে আনুগত্য বলতে শরীয়তের আনুগত্য বোঝানো হয়েছে।
এ আয়াতে এ বিষয়ের প্রতিও পরোক্ষ ইঙ্গিত রয়েছে যে অনুশাসন তিন রকমের আছে, কতগুলো সরাসরি কুরআন থেকে সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত। যেমন অন্তঃসত্ত্বা নয়, এমন মহিলার স্বামী মারা গেলে, তাকে চার মাস দশদিন ‘ইদ্দত’ পালন করতে হয়, এদের প্রতি  আল্লার নির্দেশ اَطِيْعُوْا اللهَ (আতীউল্লাহ) থেকে এ অনুশাসন গৃহীত হয়েছে। আর কতগুলো অনুশাসন সরাসরি হাদীছ থেকে স্পষ্টরূপে প্রমাণিত। উদাহরণ স্বরূপ, সোনা-রূপা নির্মিত অলংকার ব্যবহার পুরুষের জন্য হারাম। এ ধরনের অনুশাসন মেনে চলার জন্য اَطِيْعُوْا الرَّسُوْلُ (আতীউর রসুল) বলা হয়েছে। আর কতকগুলো অনুশাসন আছে যেগুলো স্পষ্টভাবে কুরআন বা হাদীছ থেকে প্রতীয়মান হয় না। যেমন স্ত্রীর সঙ্গে পায়ুকামে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারটি অকাট্যভাবে হারাম হওয়ার বিধান। এ ধরনের অনুশাসন মেনে চলার জন্য اُوْلِى الْاَمْرِ مِنْكُمْ (উলীল আমরে মিনকুম) বলা হয়েছে। এ তিন রকম শরীয়ত বিধির জন্য তিনটি আদেশ দেয়া হয়েছে।

(৫) فَاسلُوْا اَهْلَ الذِّكْرِ اِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ

(হে লোক সকল! তোমাদের যদি জ্ঞান না থাকে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর।)
এ আয়াত থেকে বোঝা গেল যে, যে বিষয়ে অবহিত নয়, সে যেন সে বিষয়ে জ্ঞানীদের নিকট থেকে জেনে নেয়। যে সব গবেষণালব্ধ মাসাইল বের করার ক্ষমতা আমাদের নেই, ঐগুলো মুজতাহিদগনের নিকট থেকে জিজ্ঞাসা করে জেনে নিতে হবে। কেউ কেউ বলেন যে, এ আয়াতে ঐতিহাসিক ঘটনাবলী জেনে নেয়ার কথাই ব্যক্ত করা হয়েছে, এর পূর্ববর্তী আয়াত থেকেও এটাই প্রতীয়মান হয়। কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয়। কেননা এ আয়াতের শব্দগুলো বিশেষিত বা শর্তযুক্ত নয়। আর না জানাটাই হলো জিজ্ঞাসা করার মূল কারণ। সুতরাং যে বিষয়ে আমরা জানি না, সেটা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা একান্ত প্রয়োজন।

(৬) وَاتَّبِعْ سَبِيْلَ مَنْ اَنَابَ اِلَىَّ

(যিনি আমার দিকে (আল্লাহর দিকে) রুজু করেছেন তার পদাঙ্ক অনুসরন কর।)
এ আয়াত থেকে এও জানা গেল যে আল্লাহর দিকে ধাবিত ব্যক্তিবর্গের অনুসরণ (তাকলীদ) করা আবশ্যক। এ হুকুমটাও ব্যাপক, কেননা আয়াতের মধ্যে বিশেষত্ব জ্ঞাপক কোন কিছুর উল্লেখ নেই।

(৭) وَالَّذِيْنَ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ اَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ اَعْيُنٍ وجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِيْنَ اِمَامًا

এবং তাঁরা আরয করেন- হে আমাদের প্রভু! আমাদের স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের দ্বারা আমাদের চোখ জুড়িয়ে দাও এবং আমাদেরকে পরহেযগারদের ইমাম বানিয়ে দাও।
‘তাফসীরে মাআলিমুত তানযীলে’ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে।
فَنَقْتَدِىْ بِالْمُتَّقِيْنَ وَيَقْتَدِى بِنَا الْمُتَّقُوْنَ
অর্থাৎ যাতে আমরা পারহেযগারদের অনুসরণ করতে পারি, আর পারহেযগারগণও আমাদের অনুসরণ করার সুযোগ লাভ করতে পারেন।
এ আয়াত থেকেও বোঝা গেল যে, আল্লাহ ওয়ালাদের অনুসরণ বা তাকলীদ করা একান্ত আবশ্যক।

(৮) فَلَوْلَانَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوْ افِى الدِّيْنِ وَلِيُنْذِرُوْ اقَوْ مَهُمْ اِذَا رَجَعُوْا اِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُوْنَ

(সুতরাং এমন কেন করা হয় না যে তাদের প্রত্যেক গোত্র হতে একটি দল ধর্মীয় জ্ঞান অন্বেষণের জন্য বের হয়ে পড়তো এবং ফিরে এসে নিজ গোত্রকে ভীতি প্রদর্শন করতো। যাতে গোত্রের অন্যান্য লোকগণ মন্দ, পাপ কার্যাবলী থেকে দুরে সরে থাকতে পারে।
এ আয়াত থেকে বোঝা গেল প্রত্যেকের মুজতাহিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কেউ কেউ ফিকহবিদ হবেন, অন্যরা কথায় ও কর্মে তাঁদের অনুসরন  করবে।

(৯) وَلَوْرَدُّوْهُ اِلَى الرَّسُوْلِ وَاِلى اُوْلِى الْاَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِيْنَ يَسْتَنْبِطُوْنَهُ مِنْهُمْ

(এবং যদি এ ক্ষেত্রে তারা রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ও আদেশদানকারী যোগ্য ব্যক্তিদের প্রতি রুজু করতো তাহলে নিশ্চয় তাদের মাঝে যারা সমস্যার সমাধান বের করার যোগ্যতা রাখেন, তাঁরা এর গুঢ়তত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারতেন।)
এ আয়াত থেকে পরিষ্কার বোঝা গেল যে, হাদীছ, ঘটলাবলীর খবর ও কুরআনের আয়াত সমূহকে প্রথমে মুজতাহিদ আলিমদের কাছে পেশ করতে হবে। এরপর তাঁরা যে রকম বলবেন, সে ভাবে আমল করতে হবে। শ্রুত খবর থেকে কুরআন-হাদীছের স্থান অনেক উর্ধে। সুতরাং উহাকে মুজতাহিদের কাছে পেশ করা দরকার।

(১০) يَوْمَ نَدْعُوْا كُلُّ اُنَاسٍ بِاِمَامِهِمْ

(যে দিন আমি প্রত্যেক দলকে নিজ নিজ ইমাম সহকারে ডাকবো….।
তাফসীরে রূহুল বয়ানে’ এর ব্যাখ্যায় লিখা হয়েছে-

اَوْمُقَدَّمٍ فِى الدِّيْنِ فَيُقَالُ يَا حَنْفِىُّ يَاشَافِعِىُّ

(কিংবা ইমাম হচ্ছেন ধর্মীয় পথের দিশারী, তাই কিয়ামতের দিন লোকদিগকে ‘হে হানাফী’ হে সাফেঈ! বলে আহবান করা হবে।)
এ থেকে বোঝা গেল, কিয়ামতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ইমামের সাথে ডাকা হবে। ডাকা হবে হে হানাফী মতাবলম্বীগণ! হে মালিকী মযহাবের অনুসারীগণ! চলো। এখন প্রশ্ন হলো, যে ইমাম মানেনি, তাকে কার সাথে ডাকা হবে? এ সম্পর্কে সুফীয়ানে কিরাম (রহমতুল্লাহে আলাইহে) বলেন যে, যার ইমাম নেই, তার ইমাম হলো শয়তান।

(১১) وَاِذَاقِيْلَ لَهُمْ امنُوْا كَمَا اَمَنَ النَّاسُ قَالُوْا اَنُؤْمِنَ كَمَا اَمَنَ السُّفْهَاءُ

(এবং যখন তাদেরকে বলা হয়- ‘তোমরা ঈমান আন, যেরূপ সত্যিকার বিশুদ্ধ চিত্ত মু’মিনগণ ঈমান এনেছেন। তখন তারা বলে- আমরা কি বোকা ও বেওকুফ লোকদের মত বিশ্বাস স্থাপন করব?
বোঝা গেল যে, ঐ ধরনের ঈমানই গ্রহনযোগ্য, যে ঈমান নেক বান্দাগণ পোষণ করেন। অনুরূপ, মাযহাব ওটাই যেটার অনুসারী হচ্ছে নেক বান্দাগণ।  উহাই হলো তাকলীদ। -সুত্রঃ জা’আল হক ১ম খন্ড-

তাকলীদ কার জন্য ওয়াজিব আর কার ওয়াজিব নয়

প্রাপ বয়স্ক ও সুস্থ বিবেকের অধিকারী মুসলমানকে দু’ শ্রেণীতে ভাগ করা যায়-মুজতাহিদ  ও গায়র মুজতাহিদ। মুজতাহিদ হলো এমন মুসলমান যিনি নিজ জ্ঞান ও যোগ্যতায় কুরআনী ইঙ্গিত ও রহস্যাবলী বুঝতে পারেন, কালামের উদ্দেশ্য অনুধাবন করার যোগ্যতা রাখেন, গবেষণা করে মাসাইল বের করতে পারেন, নাসিখ ও মানসুখ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন, ইলমে ছরফ, নাহর বালাগাত (অলংকার শাস্ত্র) ইত্যাদি বিষয়ে পূর্ণ পারদর্শিতা অর্জন করেছেন, যাবতীয় আহকামের সাথে সম্পর্ক যুক্ত সমস্ত আয়াত ও হাদীছসমূহ সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান রাখেন, সর্বোপরি যিনি মেধা, প্রজ্ঞা ও বোধশক্তির অধিকারী হন। (তাফসীরাতে আহমদীয়া ইত্যাদি তাফসীর গ্রন্থ দেখুন) আর যে ব্যাক্তি ঐ স্তরে পৌঁছতে পারেনি যার মধ্যে উল্লেখিত যোগ্যতা নেই, সে হলো গায়র-মুজতাহিদ বা মুকাল্লিদ (অনুসারী)। গায়র-মুজতাহিদের জন্য মুজতাহিদের তাকলীদ একান্ত জরুরী। আর মুজতাহিদের জন্য তাকলীদ বা অপরের অনুসরণ করা নিষিদ্ধ। মুজতাহিদের ছয়টি শ্রেণী আছে- 

যথাঃ-(১) শরীয়তের মুজতাহিদ, 
(২) মাযহাবের অন্তর্ভূক্ত মুজতাহিদ, 
(৩) মাসাইলের মুজতাহিদ,
(৪) আসহাবে তাখরীজ, 
(৫) আসহাবে তারজীহ ও 
(৬) আসহাবে তমীয (মুকাদ্দমায়ে শামী ‘তবকাতে ফুকহা’ এর বিবরণ দ্রষ্টব্য)।
(১) শরীয়তের মুজতাহিদ হলেন ঐ সমস্ত জ্ঞানী-গুণী জন, যারা ইজতিহাদের নীতিমালা নির্ধারণ করেছেন। যেমন, ধর্মীয় চার ইমামগণ হযরত আবূ হানিফা (রহমতুল্লাহে আলাইহে),  হযরত শাফিঈ (রহমতুল্লাহে আলাইহে), হযরত মালিক (রহমতুল্লাহে আলাইহে),  ও হযরত আহমদ ইবন হাম্বাল  (রহমতুল্লাহে আলাইহে)।
(২) মাযহাবের অন্তর্ভূক্ত মুজতাহিদ হলেন ঐ সমস্ত ধর্মীয় ইমাম, যারা প্রথমোক্ত শ্রেণীর মুজতাহিদ কর্তৃক নির্ধারিত নীতিমালার অনুসরণ করেন ও ঐ মসস্ত নীতিমালার অনুসরণ করে নিজেরাই শরীয়তের আনু্ষাঙ্গিক মাসাইল বের করতে পারেন। যেমন- ইমাম আবু ইউসুফ (রহমতুল্লাহে আলাইহে) মুহাম্মদ (রহমতুল্লাহে আলাইহে) ও ইবনে মুবারক (রহমতুল্লাহে আলাইহে) তাঁরা সবাই ইজতিহাদের মৌলিক নীতিমালার ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফা (রহমতুল্লাহে আলাইহে) এর অনুসারী। কিন্তু মাসাইলে নিজেরাই মুজতাহিদ।
(৩) মাসআলাসমূহের মুজতাহিদ হলেন ঐ সকল ইমামগণ, যারা মৌলিক নীতিমালা ও আনুষাঙ্গিক মাসাইলের ক্ষেত্রে অন্যের অনুসারী কিন্তু তাঁরা যে সব মাসাইলে ইমামগণের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না, ওগুলোর সমাধান কুরআন হাদীছ প্রভৃতি প্রামাণ্য দলীলাদি থেকে বের করতে পারেন। যেমন ইমাম তাহাবী (রহমতুল্লাহে আলাইহে) কাযী খাঁন (রহমতুল্লাহে আলাইহে) শামসুল আইম্মা সরখসী (রহমতুল্লাহে আলাইহে) প্রমুখ।
(৪) আসহাবে তাখরীজ হলেন ঐ সকল মুজতাহিদ, যারা ইজতিহাদের যোগ্যতা অর্জন  করেননি, তবে ধর্মীয় ইমামগণের কারো অস্পষ্ট ও সংক্ষিপ্ত উক্তির বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদানের যোগ্যতা রাখেন। যেমন ইমাম করখী (রহমতুল্লাহে আলাইহে) প্রমুখ ।
(৫) আসহাবে তারজীহ হলেন ঐ মুজতাহিদ, যারা ইমাম সাহেব (রহমতুল্লাহে আলাইহে) এর একাধিক রিওয়ায়াতসমূহ থেকে একটিকে প্রাধান্য দিতে পারেন। অর্থাৎ যদি কোন একটি মাসালায় ইমাম আবু হানিফার  (রহমতুল্লাহে আলাইহে)  দু’ধরনের রিওয়ায়াত থাকে, তাঁরা কোনটাকে প্রাধান্য দেয়া যাবে, তা বলতে পারেন। অনুরুপ কোন মাসআলায় ইমাম  সাহেব  (রহমতুল্লাহে আলাইহে) ও সাহিবায়নের (ইমাম মুহাম্মদ রহমতুল্লাহে আলাইহে) ও ইমাম আবু ইউসুফ  (রহমতুল্লাহে আলাইহে) মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হলে, তারা যাচাই করে যে কোন একজনের উক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে মন্তব্য করতে পারেন যে উক্তি সমূহের মধ্যে এ উক্তিটাই অধিক গ্রহণযোগ্য কিংবা অমুকের উক্তিই সর্বাধিক সঠিক। যেমন ‘কুদুরী’ ও ‘হিদায়া’ গ্রন্থদ্বয়ের মাননীয় প্রণেতাদ্বয়।
(৬) আসহাবে তামীয হলেন ঐ সমস্ত মুজতাহিদ, যাঁরা জাহির মাযহাব ও কম গুরুত্বপূর্ণ রেওয়ায়াত সমূহের  মধ্যে, কিংবা দুর্বল, জোরালো ও সর্বাধিক জোরালো উক্তি সমূহের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারেন। এ যোগ্যতার ভিত্তিতে অগ্রাহ্য উক্তি ও দুর্বল রিওয়ায়াত সমূহ বর্জন করে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য উক্তি সমূহ গ্রহণ করেন। যেমন কনযুদ দাকাইক ও দুবরুল মুখতার ইত্যাদির প্রণেতাগণ। 
যাদের মধ্যে উল্লেখিত ছয়টি স্তরের কোনটির যোগ্যতা নেই, তাঁরা নিছক অনুসারী বা মুকাল্লিদ হিসেবে পরিগণিত। যেমন-আমরা ও আমাদের যুগের সাধারণ আলিমগণ। তাঁদের একমাত্র কাজ হলো কিতাব দেখে বা অধ্যয়ন করে জনগণকে মাসাইল শিক্ষা দেয়া।
আমি আগেই বলেছি যে, মুজতাদিদের জন্য অপরকে অনুসরণ করা হারাম। অতএব, উল্লেখিত ছয় স্তরের মধ্যে যিনি যেই স্তরের মুজতাহিদ হবেন, তিনি সে স্তরের অন্য কারো তাকলীদ  করবেন না; তিনি উপরের স্তরের মুজতাহিদের তাকলীদ করবেন। উদাহরণ স্বরূপ, ইমাম আবূ ইউসূফ (রহমতুল্লাহে আলাইহে) ইমাম মুহাম্মদ (রহমতুল্লাহে আলাইহে) মৌলিক নীতিমালার ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা (রহমতুল্লাহে আলাইহে) এর মুকাল্লিদ বা অনুসারী, কিন্তু মাসাইলের ক্ষেত্রে নিজেরাই মুজতাহিদ। এ জন্য মাসাইলের ব্যাপারে তাঁরা কারো অনুসারী নন।
আমার উপরোক্ত আলোচনার মধ্যে নিম্নবর্ণিত লা মাযহাবীদের অনেক অবান্তর প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁরা প্রশ্ন করে থাকেন, ইমাম আবু ইউসুফ (রহমতুল্লাহে আলাইহে) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহমতুল্লাহে আলাইহে) যখন হানাফী মাযহাবের অনুসারী, তখন তাঁরা বিভিন্ন মাসাইলে ইমাম আবু হানীফা (রহমতুল্লাহে আলাইহে) এর বিরোধিতা করেন কেন? এর উত্তর বলতে হবে যে তাঁরা মৌলিক নীতিমালার ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা (রহমতুল্লাহে আলাইহে) এর অনুসারী, যার জন্য নির্ধারিত নীতিমালার ক্ষেত্রে কোন বিরোধিতা করেন না। তবে আনুসাঙ্গিক অনেক মাসাইলে ভিন্নমত পোষণ করেন, কেননা এগুলোর ব্যাপারে তাঁরা দিজেরাই মুজতাহিদ, অন্য কারো অনুসারী নন।
নিম্নে উল্লেখিত প্রশ্নেরও অবতারনা করার আর অবকাশ রইল না। তাঁরা প্রশ্ন করতে পারেন আপনারা অনেক মাসাইলে ইমাম আবু হানীফা (রহমতুল্লাহে আলাইহে) এর উক্তিকে বাদ দিয়ে সাহেবান (রহমতুল্লাহে আলাইহে) এর উক্তি অনুযায়ী ফাতওয়া দিয়ে থাকেন। এর পরেও আপনারা হানাফী মতাবলম্বী হলেন কিভাবে? এর উত্তর হলো ফকীহগণের মধ্য আসহাবে তারজীহ এর যোগ্যতা ও গুণাবলীর অধিকারী ফকীহ বিদ্যমান আছেন, যারা কয়েকটি উক্তির মধ্য থেকে একটিকে প্রাধান্য দেন। এ জন্য আমরা তাঁদের প্রাধান্য দেয়া উক্তি অনুসারে ফাতওয়া দিয়ে থাকি।
তারা আরও প্রশ্ন করতে পারেন-আপনারা নিজেদেরকে হানাফী বলে কেন দাবী করেন, আপনাদের ইউসুফী বা মুহাম্মদী বা ইবনে মুবারকী বলাই বাঞ্ছনীয় নয় কি? কেননা অরেক জায়গায় আপনারা ইমাম সাহেব (রহমতুল্লাহে আলাইহে) এ উক্তিকে বাদ দিয়ে উনাদের উক্তি অনুযায়ী আমল করে থাকেন। এর উত্তর হলো ইমাম আবু ইউসুফ (রহমতুল্লাহে আলাইহে) মুহাম্মদ (রহমতুল্লাহে আলাইহে) ও ইবনে মুবারক (রহমতুল্লাহে আলাইহে) প্রমুখের সমস্ত উক্তি ইমাম আবু হানীফা (রহমতুল্লাহে আলাইহে) এর নির্ধারিত নীতিমালার উপর ভিত্তি করেই বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং তাঁদের উক্তিকে গ্রহণ করা মানে প্রকৃত পক্ষে ইমাম সাহেব (রহমতুল্লাহে আলাইহে) এর উক্তিকে গ্রহন করা।

যেমন হাদিছ অনুযায়ী আমল করা মানে প্রকৃত পক্ষে কুরআন অনুযায়ী আমল করা। কেননা মহাপ্রভূইতো এ নির্দেশ দিয়েছেন। উদাহরণ স্বরূপ ইমাম আবু হানীফা (রহমতুল্লাহে আলাইহে) বলেছেন “যদি কোন হাদীছ সহীহ প্রমাণিত হয়ে যায় তখন সেটাই হবে আমর মাযহাব।” এমতাবস্থায় যদি মাযহাবের অন্তর্ভুক্ত কোন মুজতাহিদ কোন সহীহ হাদীছ পেয়ে সে অনুসারে আমল করেন তাহলে তিনি লা-মাযহাবী হবেন না বরং হানাফীই থেকে যাবেন। কেননা তিনি ইমাম সাহেব (রহমতুল্লাহে আলাইহে) এর উক্ত নীতিমালা অনুযায়ী হাদীছ অনুসারে আমল করেছেন। মুকদ্দমায়ে শামীতে-

صَحَّ عَنِ الْاِمَامِ اِذَا صَحَّ الْحَدِيْثُ فَهُوَ مَذْهَبِىْ

এর বর্ণনা প্রসঙ্গে এর বিস্তারিত বিবরণ দেখুন। ইমাম সাহেব (রহমতুল্লাহে আলাইহে) এর উপরোক্ত উক্তির মর্ম এও হতে পারে যে, যখন কোন হাদীছ নির্ভুল প্রমাণিত হলো, তখনই সেটা আমার মাযহাবরূপে গণ্য হল। অর্থাৎ প্রত্যেক মাসআলা ও হাদীসকে আমি পর্যাপ্ত বিচার-বিশ্লেষণ ও খুটিনাটি সব কিছুর পর্যালোচনা করে গ্রহণ করেছি। বস্তুতঃ ইমাম সাহেব (রহমতুল্লাহে আলাইহে) এর নিকট প্রত্যেকটি মাসআলা নিয়ে ব্যাপক বিচার-বিশ্লেষণ করা হতো এবং মুজতাহিদ শিষ্যদের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক সব কিছুর ব্যাপক তাত্ত্বিক পর্যালোচনার পর ওটা গ্রহণ করা হতো।
এই সংক্ষিপ্ত আলোচনাটুকু স্মরণ রাখলে ইনশাআল্লাহ অনেক সমস্যার সমাধান করা যাবে, সুধী পাঠকমণ্ডলীর অনেক কাজে আসবে।
কোন কোন লা-মাযহাবী আলিম বলে  থাকেন যেহেতু আমাদের ইজতিহাদ প্রয়োগ করার ক্ষমতা আছে সেহেতু আমরা কাউকে অনুসরণ করি না। এ অবান্তর উক্তির জন্য দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন নেই। ইজতিহাদের জন্য কতটুকু জ্ঞান দরকার আর তারা কতটুকু জ্ঞানের অধিকারী শুধু সে প্রসঙ্গে আলোচনা করার প্রয়াস পাচ্ছি।
হযরত ইমাম রাযী (রহমতুল্লাহে আলাইহে) ইমাম গাযযালী (রহমতুল্লাহে আলাইহে) ইমাম তিরমিযী (রহমতুল্লাহে আলাইহে) ইমাম আবু দাউদ (রহমতুল্লাহে আলাইহে) গাউছে পাক (রহমতুল্লাহে আলাইহে) বায়যীদ বুস্তামী (রাহমতুল্লাহে আলাইহে) শাহ বাহাউল হক নকশবন্দী (রাহমতুল্লাহে আলাইহে) প্রমুখ ইসলামে এত উন্নত মর্যাদার  অধিকারী ও মাশায়িখ ছিলেন যে, তাঁদের নিয়ে মুসলমানগণ যতই গর্ববোধ করুক না কেন তা তাদের জ্ঞান গরিমা ও প্রজ্ঞার তুলনায় নেহায়ত কিঞ্চিতকররূপে প্রতিভাত হবে। অথচ উনাদের মধ্যে কেউ মুজতাহিদরূপে স্বীকৃতি পাননি। বরং তাঁরা ছিলেন মুকাল্লিদ বা অনুসারী। কেউ ইমাম শাফেয়ীর (রহমতুল্লাহে আলাইহে) আর কেউ ইমাম আবু হানীফার (রহমতুল্লাহে আলাইহে) অনুসারী ছিলেন। বর্তমান জামানায় উনাদের সমপরিমাণ মর্যাদা ও যোগ্যতার অধিকারী কেউ আছেন? যখন উনাদের জ্ঞান মুজতাহিদ এর স্তরে উপনীত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়, তখন যারা বিভিন্ন হাদীছ গ্রন্থের নামগুলো পর্যন্ত ঠিকমত বলতে পারে না, তারা কোন পর্যায়ে পড়বেন?
জনৈক ভদ্রলোক মুজতাহিদ হওয়ার দাবী করেছিলেন। আমি তাঁকে শুধু এতটুকু জিজ্ঞাসা করেছিলাম আচ্ছা বলুন দেখি সুরা তাকাছুর থেকে কয়টি মাসাইল বের করতে পারেন এবং এর মধ্যে ‘হাকীকত’ ‘মাজায’ ‘সরীহ’ ‘কিনাযা’ ‘জাহির’ ও ‘নাস’ কয়টি আছে? সে বেচারা নাকি (উসুলে ফিকহ শাস্ত্রে ব্যবহৃত উক্ত পারিভাষিক) শব্দগুলোর নামও শুনেনি।  -সুত্রঃ জা’আল হক ১ম খন্ড-

কোন ধরনের মাসাইলে তাকলীদ করা হয় আর কোন ধরনের মাসাইলে তাকলীদ করা হয় না

শারঈ তাকলীদ প্রসঙ্গে বিস্তারিত বিবরণ প্রয়োজন। শরীয়তের মাসাইল হচ্ছে তিন রকমের-(১) আকায়িদ (২) ঐ সমস্ত বিধি বিধান যেগুলো কোন গবেষণা ছাড়াই কুরআন হাদীছ থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত (৩) ঐ সমস্ত আহকাম যেগুলো কুরআন হাদীছ থেকে গবেষণা করে বের করা হয়েছে।

আকায়িদের ব্যাপারে কারো তাকলীদ বা অনুসরণ নাজায়েয। তফসীরে রূহুল বয়ানে সূরা হূদের শেষাংশের আয়াতঃ-نَصِيْبَهُمْ غَيْرَ مَنْقُوْضٍ 
এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছেঃ- (এ আয়াতে তাকলীদের নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়েছে। তাকলীদ হচ্ছে অপরের উক্তিকে বিনা প্রমাণে গ্রহণ করা। এটা  ধর্মের মৌলিক ও আন্তরিক বিশ্বাসের সহিত সম্পর্কিত বিষয়াদি ছাড়া অন্যাণ্য ক্ষেত্রে (আনুসাঙ্গিক ও ধর্মীয় কাজ কর্ম সম্পর্কীয় বিষয়াদিতে) বৈধ কিন্তু ধর্মীয় বুনিয়াদী বিষয়াদি ও আকায়িদের ক্ষেত্রে এটা বৈধ নয়। বরং এ ক্ষেত্রে দলীল প্রামণ ও চিন্তা ভাবনার প্রয়োজন থেকে যায়।)
যদি কেউ আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করে আমরা তাওহীদ রিসালত ইত্যাদি কিভাবে স্বীকার করে নিয়েছি? এর প্রত্যুত্তরে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর উক্তি বা তার রচিত ফিকহে আকবরের নাম উল্লেখ করলে চলবে না। বরং বলতে হবে যে তাওহীদ ও রিসালাতের দালীলাদির ভিত্তিতে এগুলো স্বীকার করে থাকি। কেননা এগুলো হচ্ছে আকায়িদ সম্পর্কিত বিষয় আকায়িদের ক্ষেত্রে তাকলীদ হয় না।
ফতওয়ায়ে শামীর মুকাদ্দামায়اَلتَّقْلِيْدُ المَفْضُوْلِ مَعَ الْاَفْضَلِ 
এর বর্ণনায় উল্লেখ আছেঃ
(শারয়ী আনুষাঙ্গিক মাসাইল ব্যতীত যে সব বিষয়ে আমরা বিশ্বাস রাখি এবং কারো অনুসরন ছাড়াই যে সমস্ত বিষয়ে বিশ্বাস রাখাটা প্রত্যেক মুকাল্লাফ (বালিগ ও বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তি) এর জন্য ওয়াজিব, সেগুলো হলো, আকায়িদের সহিত সম্পৃক্ত বিষয় যার ধারক ও বাহক হচ্ছে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত অর্থাৎ আশা’ইয়রা ও মাতুরীদিয়াহ সম্প্রদায়।) তাফসীরে কবীরে ১ম পারার আয়াত- فَاجِرْهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلَامَ اللهِ  এর তাফসীলে লিপিবদ্ধ আছেঃ-

هذِهِ الْايَةُ تَدُلُّ عَلى اَن التَّقْلِيْدَ غَيْرُ كَافٍ فِى الدِّيْنِ وَاَنه لابُدَّ مِنَ النَّظْرِ وَالْاِسْتِدْ لَالِ

অর্থাৎ এ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে ধর্মীয় ব্যাপারে তাকলীদ বা অনুসরণ যথেষ্ট নয়, যুক্তি প্রমাণ অন্বেষণেরও প্রয়োজনীতা অনুভূত হয়। 
শরীয়তের সুস্পষ্ট আহকামে কারো তাকলীদ জায়েয নয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামায, নামাযের নির্ধারিত রাকআত সমূহ, ত্রিশ রোযা রাখা অবস্থায় খানাপিনা হারাম হওয়া ইত্যাদি মাসাইল কুরআন হাদীছ থেকে সুস্পষ্ট ভাষায় প্রমাণিত । এ জন্য এ সমস্ত ক্ষেত্রে এ কথা বলা চলবে না যে নামায দিনে পাঁচ বার বা রোযা এক মাস এ জন্য নির্ধারিত, যেহেতু ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) বলেছেন বা তাঁর রচিত ‘ফিকহে আকবরে’ লিখা হয়েছে। বরং এ ক্ষেত্রে কুরআন থেকে সংশ্লিষ্ট দলীল প্রমাণাদি উপস্থাপন করতে হবে।
যে সব মাসাইল কুরআন হাদীছ বা ইজমায়ে উম্মত থেকে গবেষণা ও ইজতিহাদ প্রয়োগ করে বের করা হয়েছে, ঐ সমস্ত মাসাইলে মুজতাহিদ নয় এমন লোকের জন্য তাকলীদ ওয়াজিব।
আমি মাসাইলকে যে ভাবে ভাগ করে দেখিয়েছি ও উল্লেখ করেছি যে কোন ধরনের মাসাইলে অনুসরণ করতে হবে  আর কোন প্রকারের মাসাইলে তাকলীদ বা অনুসরণ করা যাবে না, এ বিষয়ের প্রতি যথার্থরূপে খেয়াল রাখতে হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে লা-মাযহাবীগণ আপত্তি উত্থাপন করেন যে দলীল প্রমাণাদির ভিত্তিতে মাসাইল বের করার মুকাল্লিদের কোন অধিকার নেই। তথাপি আপনারা কেন নামায-রোযার সমর্থনে কুরআনের আয়াত বা হাদীছ সমূহ পেশ করেন? 
এর উত্তরও উপরে বর্ণিত হয়েছে যে নামায-রোযা ফরয হওয়ার ব্যাপারটা তাকলীদী মাসাইলের অন্তর্ভুক্ত নয়। উপরের বর্ণনা থেকে এ কথাও জানা গেল যে আহকাম ছাড়া কোন ঘটনার খবর ইত্যাদিতে তাকলীদ হয় না। যেমন ইয়াযীদ প্রমুখের কাফির হওয়ার সম্পর্কিত মাসাআলা। কিয়াসের ভিত্তিতে বের করা মাসাইলেও ফকীহগণ কুরআন হাদীছ থেকে দলীলাদী পেশ করে থাকেন। এরূপ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বীকৃত সামাইলের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন। ঐ সব মাসাইল আগে থেকে ধর্মীয় ইমামের কথা অনুযায়ী স্বীকৃত হয়ে থাকে। সুতরাং দলীলের প্রতি দৃষ্টি পাত না করার অর্থ মুকাল্লিদের দলীল-প্রমাণাদির ভিত্তিতে সমস্যার সমাধাণ খুঁজে বের করা চলবে না। -সুত্রঃ জা’আল হক ১ম খন্ড-