উচ্চস্বরে যিকর করা ১ (প্রমাণ)

উচ্চস্বরে যিকরের বর্ণনা

পাঞ্জাব ও অন্যান্য জায়গায় ফজর ও ইশার নামাযের পর উচ্চস্বরে দরূদ শরীফ পড়ার রেওয়াজ আছে বিরোধিতাকারীগণ একে হারাম বলে এবং নানা রকম ফন্দি করা বিদআত, হানাফী নীতির বরখেলাপ এবং এর ফলে নামাযরত মুসল্লী নামাযে ভুল করে: তাই এটা হারাম। কিন্তু আমাদের অভিমত হলো উচ্চস্বরে যিকর করা জায়েয বরং কতেক জায়গায় আবশ্যক। অতএব প্রথম অধ্যায়ে এর প্রমাণসহ আলোচনা করা হল-

প্রথম অধ্যায়
উচ্চস্বরে যিকর করার প্রমাণঃ

উচ্চস্বরে যিকির করা জায়েয। কুরআন, হাদীছ ও উলামায়ে কিরামের উক্তি দ্বারা এটা প্রমানিত। কুরআন করীম ইরশাদ ফরমান –

فَذْكُرُواللهَ كَذِكْرِكُمْ اَبَاءَكُمْ اَوْ اَشَدَّذِكْرًا

আল্লাহর যিকর এমনভাবে কর, যেমন ভাবে তোমাদের বাপদাদাদের যিকর কর বরং তদপেক্ষা বেশী। মক্কার কাফিরগণ হজ্ব সমাপণান্তে একত্রিত হয়ে নিজ নিজ বংশের গুণকীর্তন ও পূর্বপুরুষদের শৌর্য বীর্য-বর্ণনা করতো। আল্লাহ তা’আলা একে নিষেধ করেছেন এবং এরস্থলে তাঁর যিকর করার নির্দেশ দিয়েছেন। এবং এতে কোন সন্দেহ নেই যে এটা উচ্চ স্বরেই হয়ে থাকবে। এ জন্যে উচ্চস্বরে তালবিয়া অর্থাৎ লাববাইক পাঠ সুন্নাত, বিশেষ করে বিভিন্ন কাফেলা একত্রিত হবার সময়। আল্লাহ তা’আলা আরও ইরশাদ ফরমান-

وَاِذَا قُرِءَ الْقُرْأَنَ فَاسْتَمِعُوْا لَهُ وَاَنْصِتُوْا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ

যখন কুরআন শরীফ পাঠ করা হবে,  তখন মনোযোগ সহকারে শুনুন এবং নিশ্চুপ থাকুন।
বোঝা গেল যে, উচ্চস্বরে কুরআন তিলাওয়াত জায়েয। নীরবে যিকর নয়, উচ্চস্বরের যিকরই শোনা যায় (তাফসীরে কবরে এ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য) মিশকাত শরীফের الذكر بعد الصلوت   অধ্যায়ে বর্ণিত আছে-

كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِذَا سَلَّمَ مِنْ صَلوتِه يَقُوْلُ بِصَوْتِه الْاَعْلى لَا اِلهَ اِلَّااللهُ وَحْدَهُ لَاشَرِيْكَ لَهُ

হুযুর আলাইহিস সালাম যখন নামায থেকে সালাম ফিরাতেন তখন উচ্চস্বরে   لَااِلَهَ اِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَاشَرِيْكَ لَهُ বলতেন মিশকাত শরীফে সেই জায়গায় আরও উল্লেখিত আছে –

عَنْ اِبْنِ عَبَّاسٍ قَالَ كُنْتُ اعْرِفُ اِنقِضَاءَ صَّلوةِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْتَكْبِيْرِ

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে আমি তকবীরের আওয়াজ থেকে হুযুর আলাইহিস সালামের নামায সমাপ্তি বুঝতে পারতাম। অর্থাৎ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস কম বয়সের কারণে মাঝে মধ্যে  জামাতে হাজির হতেন না। এ জন্য তিনি বলেন নামাযের পর মুসল্লীরা এত উচ্চস্বরে তকবীর বলতেন যে, আমরা ঘরের লোকেরা বুঝতে পারতাম যে নামায শেষ হয়েছে। প্রসিদ্ধ ‘লুমআত’ গ্রন্থে এ হাদীছের প্রেক্ষাপটে উল্লেখিত আছে –

 اَنَّ اِبْنَ عَبَّاسٍ كَانَ لَمْ يَحْضُرِ الْجَمَاعَةِ لِاَنَّهُ كَانَ صَغِيْرًا مِّمَّنْ لَايَوَاظِبَ عَلى ذَالِكَ

হযরত ইবনে আব্বাস ছোট ছিলেন এ জন্যে নিয়মিতভাবে জামাতে হাজির হতেন না। মুসলিম শরীফের প্রথম খন্ড اَلْذِكْرُ بَعْدُ الصَّلَوةِ শীর্ষক অধ্যায়ে সেই ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে-

اِنَّ رَفَعَ الضَوْتِ بِالذِّكْرِ حِيْنَ يَنْصَرِفُ النَّاسُ مِنَ الْمَكْتُوْبَةِ وَكَانَ عَلى عَهْدِ النَّبِىَّ صَلى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

ফরয সমূহ থেকে ফারেগ হওয়ার পর উচ্চস্বরে যিকর করা হুযুর আলাইহিস সালামের যুগে প্রচলিত ছিল । মিশকাত শরীফে ذكرالله عزوجل শীর্ষক অধ্যায় বর্ণিত আছে যে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ ফরমান-

فَاِنْ ذَكَرَنِىْ فِىْ نَفْسِه ذَكَرْتُهُ فِىْ نَفْسِىَ وَاِنْ ذَكَرَنِىْ فِىْ مَلَاءٍ ذَكَرْتُهُ فِىْ مَلَاءٍ خَيْرٍ مِنْهمْ

যে ব্যক্তি আমাকে মনে মনে স্মরণ করে, আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি আর যে ব্যক্তি সমাবেশে আমার যিকর করে, আমিও তাকে এর থেকে ভাল সমাবেশে (অর্থাৎ ফিরিশতাদের সমাবেশে স্মরণ করি। জামে সগীরে উল্লেখিত আছে –

عَنْ اَنَسٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اَكْثِرُوْا فِى الْجَنَازَةِ قَوْلَ لاِالَهَ اِلَّا اللهُ

হযরত আনাস থেকে বর্ণিত আছে যে, হুযুর আলাইহিস সালাম ইরশাদ ফরমান জানাযায় لَااِلَهَ اِلَّا اللهُ বেশী করে বলুন। এর থেকে বোঝা যায় যে, জানাযা নিয়ে যাবার সময় কলেমা তয়্যবা বা অন্য কোন যিকর ‍উচ্চস্বরে হোক বা নিম্নস্বরে সব রকমের জায়েয আছে।
মৌলভী রশীদ আহমদের হাদীছের উস্তাদ শেখ মুহাম্মদ থানবী রচিত ‘দলায়েলুল আযকার’ (দিল্লী থেকে প্রকাশিত) পুস্তিকার ৭৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখিত আছে –

اَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَجْهَرُ مَعَ الصَّحَابَةِ بِالْاَذْكَارِ وَالتهْلِيْلِ وَالتَّسْبِيْحِ بَعْدَ الصَّلَوةِ

হুযুর আলাইহিস সালাম নামাজের পর সাহাবায়ে কিরামের সাথে উচ্চ স্বরে তসবীহ তাহলীল পড়তেন। তাফসীর রূহুল বয়ানে চতুর্থ পারার আয়াত رَبَّنَا مَاخَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَالنَّارِ
এর ব্যাখ্যায় উল্লেখিত আছে –
উচ্চ স্বরে যিকর করা জায়েয বরং মুস্তাহাব, যদি কপটতা না থাকে এবং দ্বীনের প্রচারই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। যিকরের বরকত ঘরে অবস্থানরত শ্রোতাদের কাছেও পৌঁছবে এবং যিনি আওয়াজ শনে ‍যিকরে মশগুল হবেন, (তিনিও বরকতের ভাগী হবেন) এবং কিয়ামতের দিন আর্দ্র-শুষ্ক সব কিছু ‍যিকরকারীর ঈমানের সাক্ষ্য দিবে।
এর থেকে বুঝা গেল উচ্চস্বরে যিকরে দ্বীনের অনেক ফায়দা আছে। তাফসীরে খাযেন ও রুহুল বয়ানে ষষ্ঠ পারার আয়াত      وَاَتَيْنَا دَاوُدَ زَبُوْرَا এর ব্যাখ্যা প্রসংগে একটি রিওয়ায়েত উদ্ধৃত করা হয়েছে। রিওয়ায়েতটা হচ্ছে হুযুর আলাইহিস সালাম সৈয়্যদুনা আবু মুসা আশআরী (রাঃ) কে বললেন আজকের রাত্রে আমি তোমার কোরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ শুনেছি। তোমাকে তো সুমধুর দাউদী কণ্ঠ দান করা হয়েছে। তখন হযরত আবু মুসা আশআরী বলেন –

فَقُلْتُ اَمَا وَاللهِ لَوْ عَلِمتُ اِنَّكَ تَسْمَعُ لَخَبَّرْ تُه خَبِيْرًا – اَلتَّحْبِيْرُ حُسْنُ لصَّوْتِ

খোদার কসম, যদি আমি জানতাম যে আমার কুরআন তিলাওয়াত সাহেবে কুরআন (দঃ) শুনছেন, তাহলে আমি আরও আওয়াজ সুন্দর করে তিলাওয়াত করতাম ।
এ হাদীছ থেকে দুটি বিষয় জানা গেল। একটি হচ্ছে সাহাবায়ে কিরাম উচ্চস্বরে যিকর করতেন যার আওয়াজ বাহিরে শোনা যেত । অপরটি হচ্ছে কুরআন তিলাওয়াত আল্লারই এবাদত এবং ইবাদতের অস্থায় হুযুর আলাহিস সালামকে সন্তুষ্টি করা  সাহাবাযে কিরামের একান্ত আকাঙ্খা ছিল। আরব্য কবি কি সুন্দর বলেছেন-

حَمَامَةَ جُرَعَى خَوْمَةِ الْجَنْدَلِ اسْجِعِىْ فَانْتِ بِمَرْأى مِنْسُوَادٍ وَّمَسْمَعِىْ

(বিয়াবনের কবুতর মনের আনন্দে উচ্চস্বরে গান করছে আর তুমি সোয়াদ পাহাড়ের চূড়া থেকে ওকে দেখছ আর তার গান শুনছ।
মিশকাত শরীফের কিতাবুস সালাত শীর্ষক অধ্যায়ে বর্ণিত আছে এক রাত্রে হুযুর আলাইহিস সালাম তাঁর প্রানপ্রিয় সাহাবায়ে কিরাম রাত্রে কে কি করছেন দেখার জন্য বের হলেন । হযরত সিদ্দীকে আকবর (রাঃ) কে খুব নিম্নস্বরে এবং হযরত উমর (রাঃ) কে খুবই উচ্চস্বরে কুরআন তিলাওয়াত করতে দেখলেন। সকালে তাঁদের কাছে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে হযরত সিদ্দীকে আকবর আরয করলেন –

اَسْمَعْتُ مَنْ نَاجَيْتُ يَارَسُوْلَ اللهِ يَا حَبِيْبَ اللهِ

হে আল্লাহর হাবীব (দঃ) যাকে শোনানো আমার অভিপ্রায় ছিল, তাকে অর্থাৎ আল্লাহকে শুনিয়েছি। হযরত উমর ফারুক (রাঃ) আরয করলেন –
اَوْقِطَ الْوَسْنَانَ وَاَطْرُدُ الشَّيْطَانُ ঘুমন্তদেরকে জাগাতেছিলাম এবং শয়াতানকে তাড়াতেছিলাম। সুবহানাল্লাহ! উভয়ের উত্তর সমঃপুত হলো, কারো প্রতি তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেননি বরং হযরত সিদ্দীক আকবরকে বললেন, তুমি আওয়াজ আরও একটু বড় করবে’ এবং হযরত উমর ফারুককে বললেন তুমি আওয়াজ একটু ছোট করবে।
মিশকাত শরীফ কিতাবুল আসমায়ে তা’আলায় হযরত বরিয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে একবার আমি হুযুর আলাইহিস সালামের সাথে ইশার নামাযের সময় মসজিদে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম এক ব্যক্তি খুবই উচ্চস্বরে কুরআন তিলাওয়াত করছেন। আমি হুযুর আলইহিস সালামের কাছে আরয করলাম হে আল্লাহর হাবীব, এটা ভন্ডামি মাত্র । হুযুর ইরশাদ ফরমালেন- بَلْ مُؤمِنٌ مُنِيْبٌ (নয়, সে তওবাকারী মুমিন) ফতওয়ায়ে আলমগীরী কিতাবুল কারাহিয়ার চতুর্থ  অধ্যায়ে الصلوة والتسبيح وقرءة القران শীর্ষক আলোচনায় উল্লেখিত আছে-

قَاضٍ عِنْدَهُ جَمْعٌ عَظِيْم يَرْفَعُوْنَ اَصْوَاتَهُمْ بِالتَّسْبِيْحِ وَالتَّهْلِيْلِ جُمْلَةً لَابَأسَ بِه

কোন কাযীর দরবারে যদি বড় জমায়েত হয় এবং সবায় মিলে যদি দরূদ পড়ে, তাতে কোন ক্ষতি নেই। একই জায়গায় আলমগীরীতে আরোও উল্লেখিত আছে-

اَلْاَفْضَلُ فِىْ قِرَأةِ الْقُرْانِ خَارِجَ الصَّلَوةِ الْجَهْرُ

নামায ছাড়া অন্যান্য সময় উচ্চস্বরে কুরআন তিলাওয়াত করা ভাল। উক্ত ফাতওয়ার কিতাবে একই জায়গায় আরও বর্ণিত আছে-

اَمَّاالتَّسْبِيْح وَالتَّهْلِيْلِ لَابَأسَ بِذَالِكَ وَاِنْ رَفَعَ صَوْتَهُ

অর্থাৎ সুবহানাল্লা’ বা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলার মধ্যে কোন ক্ষতি নেই, যদিওবা উচ্চস্বরে বলা হয়। ফাতওয়ায়ে শামীর প্রথম খন্ডে احكام المسجد  এর বর্ণনার সাথে বর্ণিত আছে-

اَجْمَعَ الْعُلَمَاءُ سَلَفاوَخلَقًا عَلى اِسْتِحْبَابِ ذِكْرِالْجَمَاعَةِ فِى الْمَسَاجِدِ اِلَّا اَنْ يُّشَوّشُ جَهْرَهُمْ عَلى نَائِمِ اَوْ مُصَلّ اَوْ قَارِىٍ

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উলামায়ে কিরাম এ বিষয়ে ঐক্যমত প্রকাশ করেছেন, মসজিদ সমূহে সমবেতভাবে উচ্চস্বরে যিকর করা মুস্তাহাব। তবে তাদের উচ্চস্বরের জন্য যেন কোন বিশ্রামকারী বা নামাযী বা তিলাওয়াতকারীর অসুবিধা না হয়। শামীতে একই জায়গায় আরও উল্লেখিত আছে-
কতেক উলামা বলেন- উচ্চস্বরে যিকর করা আফযল কেননা এতে শ্রম বেশী এবং যারা শুনেন, তাদের কাছেও এর ফায়দা পৌঁছে থাকে । এটা অমনোযোগীদের আত্নাকে জাগ্রত করে, তাদের ধ্যান ধারণা ও শ্রবণ শক্তিকে খোদার যিকরের দিকে আকর্ষণ করে, তন্দা দূরীভূত হয় এবং আনন্দ বৃদ্ধি পায়।
দুর্রুল মুখতারে সালাতুল ঈদাইন অধ্যায়ে تكبير تشريق শীর্ষক আলোচনায় উল্লেখিত আছে –

وَلَا يُمْنَعُ الْعَامَّةُ مِنَ التكْبِيْرِ فِى الْاَسْوَاقِ فِى الْاَيَّامِ الْعَشْرِ وَبِه نَاخُذُ

ঈদুল আযহা- এর প্রথম দশ দিন সাধারণ মুসলমানদেরকে বাজারে নারায়ে তকবীর দেওয়া থেকে বাধা দিও না। আমরা তা পছন্দ করি। সম্ভবতঃ তখনকার যুগে সাধারণ লোকেরা ঈদের সময় বাজারে নারায়ে তকবীর দিতেন । যদিও বা এটা বিদআত কিন্তু বলেছেন, ‘এ ব্যাপারে বাধা দিও না’। এ ইবারতের প্রেক্ষাপটে শামীতে উল্লেখিত আছে-
ইমাম আবু হানীফা (রাঃ) থেকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে কুফাবাসী ও অন্যান্য এলাকার লোকেরা যিলহজ্ব মাসের দশ দিন পর্যন্ত বাজার ও মসজিদ সমূহে যে তকবীর বলে তা মুস্তাহাব কি না। তিনি বলেছেন হ্যাঁ । ইমাম আবু জাফর (কুঃসিঃ) তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে সাধারণ লোকদেরকে এ তকবীর বলা থেকে বাধা দেয়া উচিত নয়। কেননা ওরা এমনিতে ভাল কাজের প্রতি কম আগ্রহী। এ অভিমতটা আমরা গ্রহণ করি। এর থেকে বোঝা গেল বাজারের তকবীর মুস্তাহাব।
ইমাম নববী (রহঃ) রচিত ‘কিতাবুল আযকার’ গ্রন্থে اَلصَّلوَةُ عَلَى النَّبِىِّ শীর্ষক আলোচনায় উল্লেখিত আছে-
অর্থাৎ হাদীছ শরীফ ইত্যাদি অধ্যয়নকারীদের উচিত যে যখন হুযুর আলাইহিস সালামের আলোচনা হয়, তখন যেন উচ্চস্বরে সালাত ও সালাম পাঠ করে। আমাদের উলায়ে কিরাম তলবিয়া অর্থাৎ লাববাইকা বলার সময় উচ্চস্বরে দরূদ শরীফ পড়ার কথা বলেছেন ।
এগুলো ছাড়া আরও অনেক হাদীছও ফকীহগণের উক্তি উপস্থাপন করা যায়। কিন্তু বক্তব্য সংক্ষেপ করার জন্য এতটুকু যথেষ্ট মনে করলাম । খোদার শুকরিয়া যে বিরুদ্ধ বাদীদের অগ্রদূত মৌলভী রশীদ আহমদ ছাহেবও এ ব্যাপারে আমাদের সাথে একমত। যেমন ফাতওয়ায়ে রশিদিয়ার তৃতীয় খন্ড
كتاب الخطر والاباحة  এর ১০৪ পৃষ্ঠায় একটি প্রশ্ন উত্তর আছে । প্রশ্নটা হচ্ছে যিকর দুআ ও দরূদ উচ্চস্বরে বেশী বা কম উচ্চস্বরে হোক, পাঠ করা জায়েয আছে কিনা। উত্তর যে সমস্ত জায়গায় উচ্চস্বরে যিকির করার সুস্পষ্ট প্রমাণ আছে, সে সব ব্যতীত উচ্চস্বরে জিকির করা ইমাম আবু হানীফার মতে মাকরূহ। কিন্তু সহেবাইন (ইমাম উবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ) ও অন্যান্য ফকীহ ও মুহাদ্দিছগণের মতে জায়েয। আমাদের গুরুজনদের কাছে সাহেবাইনের মতামতই গ্রহণীয়।”
লক্ষ প্রমাণাদির থেকে তোমার সাক্ষ্যই অধিক গুরুত্ব পূর্ণ।
এখন আর কোন দেওবন্দী ওহাবীর অধিকার নেই যে কোন সুন্নী মুসলমানকে উচ্চস্বরে যিকর করা থেকে বাধা দেয় । কেননা বিনা মাকরূহে এর জায়েয হওয়া সমম্পর্কে চূড়ান্ত স্বীকৃতি পাওয়া গেছে। বিবেকিও বলে যে কয়েকটি কারণ উচ্চস্বরে যিকর করা জায়েয।
প্রথমতঃ শরীয়তে আছে যে শ্রম অনুপাতে ছওয়াব পাওয়া যায়। এ জন্য ঠান্ডায় ওযু করা, অন্ধকার রাতে মজিদে জামাত পড়ার জন্য আসা এবং দূর থেকে মসজিদে আসার জন্য অতিরিক্ত ছওয়াব রয়েছে। (মিশকাত শরীফ ও অন্যান্য গ্রন্থ দেখুন ) মনে মনে যিকরের থেকে উচ্চস্বরে যিকরের মধ্যে কষ্ট বেশী।
দ্বিতীয়তঃ মিশকাত শীফের কিতাবুল আযানে বর্ণিত আছে যে যতদূর মুয়াযযিনের আওয়াজ পৌঁছবে, ওই পর্যন্ত সমস্ত গাছ-পালা, ঘাস, জ্বীন ও ইনসান কিয়ামতের দিন ওনার ঈমানের সাক্ষ্য দিবে। তাই উচ্চস্বরে যিকরের দ্বারা এ ফায়দাটা পাবার আশা করা যায়।
তৃতীয়তঃ মনে মনে যিকরের ফায়দা কেবল যিকরকারীই পেয়ে থাকে কিন্তু উচ্চস্বরে যিকরের ফায়দা যিকরকারী নিজেও পেয়ে থাকে যেমন শব্দে ইত্যাদির ধাক্কায় আত্না জাগ্রত হয় এবং শ্রোতারাও উপকৃত হয়, যেমন যিকরে আওয়াজ শুনে ওরাও যিকর করতে পারে। আর ‍যিকর না করলেও শোনার ছওয়াবতো পাবে। ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামাই ভাল।’
চতুর্থতঃ মিশকাত শরীফের لااذان অধ্যায়ে বর্ণিত আছে যে আযানের আওয়াজের দ্বারা শয়তান পালিয়ে যায় । একটু আগে উল্লেখিত হয়েছে যে হযরত ফারুকে আযম (রাঃ) হুযূর আলাইহিস সালামের প্রশ্নের উত্তরে আরয করেছিলেন اَطْرُدُالشَّيْطَانُ (শয়তানকে তাড়াচ্ছিলাম)। এতে বোঝা যায়, আযান ছাড়া অন্যান্য যিকরেও শয়তান পালিয়ে যায়। তাই উচ্চস্বরে যিকরের দ্বারা শয়তান থেকেও রেহাই পাওয়া যায়।
পঞ্চমতঃ উচ্চস্বরে যিকরের ফলে ঘুম, তন্দ্রা ও অলসতা দূলীভূত হয়। আর মনে মনে যিকরের ফলে অনেক সময় ঘুম এসে যায়। কিন্তু আমার এ সমস্ত বক্তব্য কেবল ওই অবস্থায় ফলপ্রসূ হবে, যদি লোক দেখানো অভিপ্রায় না হয়। আর যদি লোক দেখানোর নিয়ত হয়, তাহলে যিকর কেন, এ রকম মুরাকাবা করা ও নামায পড়াও গুনাহ হবে।
নকবন্দীয়া তরীকার মশায়েখে কিরাম নীরবে যিকর করার প্রতি আগ্রহী । তাঁদের বক্তব্য হচ্ছে-
অর্থাৎ মনে মনে তোমার স্মরণে এক কিনারায় একাকী বসে আছি। কিন্তু তুমি এ একাকীত্বের মধ্যেও অদ্ভুত মাহফিলের আয়োজন করেছ।)
অন্যান্য সিলসিলার বুযুর্গানে কিরাম উচ্চস্বরে যিকরের সমর্থক। তাঁদের বক্তব্য হচ্ছে-
অর্থাৎ সারা বিশ্বে আমরা ছড়িয়ে আছি কিন্তু অন্তরের চোখে তোমাকে দেখছি। জামায়েতের মধ্যে আছি কিন্তু আকাকিত্বের স্বাদ পাচ্ছি। উভয় পক্ষ খোদার প্রিয়। নকশবন্দীগণ নির্জনতায় সমাবেশ করেন আর অন্যান্যগণ সমাবেশের মধ্যে একাকীত্ব প্রকাশ করেন। كُلًّاوَّعَدَ اللهُ الْحُسْنَى (আল্লাহ তাআলা সবাইর কাছে বেহেশতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের এ  পার্থক্য হালাল-হারাম নিয়ে নয়, নিজ নিজ তরীকাগত। কেউ কারো দোষারোপ করেন না। আমরা এ পূর্ণ আলোচনাটা ওই সমস্ত দেওবন্দী ও অন্যান্য বাতিলপন্থীদের জন্য নিয়ে করা হয়েছে, যার উচ্চস্বরে যিকর করাকে হারাম বলে ফাতওয়া দেয়। আফসোস মুজাদ্দিদে আলফে ছানীর (রহঃ) সেই বাণী- ‘আমি একাজটা নিজে করি না, আবার অস্বীকারও করি না’ বিসর্জিত। -সুত্রঃ জা’আল হক ২য় খন্ড-