নবী (দঃ) কে মানুষ কিংবা ভাই বলে আখ্যায়িত করা হারাম

নবী মানব জাতীর মধ্যে আবির্ভূত হয়ে থাকেন, আর মানবই হন; জ্বিন কিংবা ফিরিশতা নন। এটি হচ্ছে পার্থিব বিধি-বিধান অনুযায়ী। কেননা মনুষ্য সৃষ্টির সূচনা হয় হযরত আদম (আ:) থেকে- তিনিই হলেন মানুষের পিতা । আর হুযুর (আলাইহিস সালাম) সে সময়েও নবী ছিলন  যখন আদি পিতা হযরত আদম (আ:) মাটির ও পানির সাথে একাকার ছিলেন । স্বয়ং হুযুর (আলাইহিস সালাম) ইরশাদ করেন-

كُنْتُ نَبِيَّا وَ اَدَمُ بَيْنَ الْمَاءِ وَالطِّيْنِ

আমি তখনও নবী ছিলাম, যখন হযরত আদম (আঃ) পানি ও মাটির সাথে একীভূত ছিলেন ।] সে সময় অর্থাৎ হযরত আদম (আঃ) এর সৃষ্টির পূর্বে হুযুর আলাইহিস সালাম নবী ছিলেন, মানব ছিলেন না । এসব কিছুই সঠিক । তবে, নবীদেরকে ‘বশর’ বা ‘ইনসান’ বলে আহবান করা, কিংবা হুযুর (আলাইহিস সালাম ) কে ‘হে মুহাম্মদ’, ‘হে ইব্রাহীমের পিতা’, ‘হে ভাই’, ‘হে দাদা’, ইত্যাদি ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক নির্দেশক শব্দাবলী দ্বারা সম্বোধন করা ‘হারাম’ বা নিষিদ্ব । যদি কেউ অবমাননার উদ্দেশ্যে এভাবে সম্বোধন করে, তা’হলে ‘কাফির’ বলে গণ্য হবে ।
‘আলমগীরী’ও অন্যান্য ফিকাহ এর কিতাবসমূহে আছে, যে ব্যক্তি হুযুর (আলাইহিস সালাম) কে অবমাননা করার উদ্দেশ্যে ‘هَذَا الرَّجُلُ এ লোকটি’ বলে অভিহিত করে, সে ‘কাফির’। তাকে বরং ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ ! ‘ইয়া শফীয়াল মুযনেবীন’“ইত্যাদি সম্মান সূচক  শব্দাবলী দ্বারা স্মরণ করা জরুরী । কবিগণ তাদের কাব্যে ‘ইয়া মুহাম্মদ’ লিখে থাকেন বটে, তবে তা স্থানের সংকীণ্নতার কারণে লিখা হয় । অবশ্য কবিতা পাঠকারী যেন সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম পড়ে নেন । যেমন এ পংক্তিতে বলা হয়েছে। واه كيا جود وكرم هے شه بطحاتير
(বাহ! হে সপ্রশস্থ, বিস্তীর্ণ ভূ-খন্ড তথা মক্কার বাদশাহ! ‘তোর’ দান ও বদান্যতা কী অপূর্ব !) এ ‘তোর’ শব্দটি নিবিড় সম্পর্ক ও আবদার নির্দেশক শব্দ । যেমন বলা হয়ে থাকে  হে মাওলা! আমি তোর জন্য উৎসর্গিকৃত । ওহে মা! তুই কোথায়? ‘হে আল্লাহ! তুই আমাদের প্রতি দয়া কর’ ।  এ ধরনের ‘তুই’ ও ‘তোর’ প্রভৃতি শব্দাবলীর তাৎপর্য ভিন্ন।
১। কুরআন কারীমে ইরশাদ করেছে-

لَا تَجْعَلُوْا دُعَاءَ الرَّسُوْلِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُمْ بَعْضًاوَ لَاتَجْهَرُوْ الَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ اَنْ تَحْبَطَ اَعْمَالُكُمْ وَاَنْتُمْ لَاتَشْعُرُوْنَه

অর্থাৎ তোমরা তোমাদের মধ্যে রাসুলকে ডাকার এমন রীতির প্রচলন করিও না, যেমন করে  তোমরা একে অপরকে ডেকে থাক । তাঁর সমীপে চেঁচিয়ে কথা বলিও না, যেমন করে তোমরা পরস্পরের সাথে উচ্চস্বরে কথা বল; পাছে তোমাদের আমলসমূহ তোমাদের অজ্ঞাতসারে  ব্যর্থতায় পর্যবসিত না হয় ।
আমলসমূহ কুফরের কারণে নস্যাৎ হয়ে থাকে ।  ‘মদারেজ’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে –
وصل از جمله رعايت حقوق اوليست
শীর্ষক আলোচনায় উল্লেখিত আছেঃ-

مخوانيد ا ور ابنام مبارك اوچنانكه مى خوانيد بعضے از شما بعض را بلكه باگويد يارسول لله يانبى الله يا توقير وتوضيع.

অর্থাৎ- নবী (আলাইহিস সালাম) কে তাঁর পবিত্র নাম ধরে ডাকতে নেই,  যেমন তোমরা পরম্পরকে ডেকে থাক । বরং তাঁকে আদব সম্মান ও বিনয়  সহকারে এভাবেই ডাকবে-  ‘ইয়া রাসুলাল্লা’ । ইয়া নাবীয়াল্লা’ ।
তাফসীরে ‘রুহুল বয়ানে’ উক্ত আয়াত এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে এরূপঃ

وَالْمَعْنَى لَاتَجْعَلُوْ ابِدَاءَ كُمْ اِيَّاهُ وَتَسْمِيْتَكُمْ لَهُ كَنِدَاءِ بَعْضِكُمْ بَعْصًالِاِسْمِهِ مِثْلُ يَامُحَمَّدُ وَيَااِبْنَ عَبْدِ اللهِ وَلَكِنْ بِلَقَبِهِ الْمُعَظَّمِ مِثْلُ يَنَبِىَّ اللهِ وَيَارَسُوْلَ اللهِ كَمَا قَالَ اللهُ تَعَالَى يَااَيُّهَاا لنَّبِىُّ وَيَااَيُّهَا الرَّسُوْلُ

অর্থাৎ মূল কথা হচ্ছে হুজুর (আলাহিস সালাম) কে ডাকার ও তাঁর নাম লওয়ার সময় এমন ভাবে ডাকবে না’ যে ভাবে তোমরা পরস্পরকে নাম ধরে ডাকাডাকি কর । যেমন- হে মুহাম্মদ! ওহে আবদুল্লার পুত্র ! তবে, তাঁকে মহিমান্বিত উপাধিসমূহের মাধ্যমে ডাকবে, যেমন -ওহে আল্লাহর নবী ! ওহে আল্লার রাসুল ! যেমন  স্বয়ং মহা প্রভু আল্লাহ তাঁকে ‘হে নবী ।’ হে রাসুল বলে সম্বোধন করে থাকেন ।
এসব কুরআনের  আয়াত, তাফসীরকারক ও হাদীছবেত্তাগণের উক্তি সমূহ থেকে বোঝা যায় যে, যে কোন অবস্থায় হুজুর (আলাইহিস সালাম) এর মান মর্যাদার প্রতি সবিশেষ লক্ষ রাখতে হবে, চাই ডাকার সময় হোক, বা কথা বলার সময় হোক কিংবা তাঁর সাথে যে কোন আচরণের সময় হোক ।
২। পার্থিব মান-সম্মানের  অধিকারী ব্যাক্তিবর্গকেও  তাদের নাম ধরে ডাকা যায় না । ‘মাকে আম্মাসাহেবানী’, বাপকে ‘শ্রদ্ধেয় পিতা’ এবং ভাইকে ‘ভাইজান’ ইত্যাদি শব্দাবলীর দ্বারা অভিহিত করা হয় । কেউ যদি নিজের মাকে ‘বাপের বউ’ বাপকে ‘মার স্বামী’  বলে অভিহিত করে’ কিংবা তাদের  নাম ধরে ডাকে’ বা ‘ভাই’ ইত্যাদি বলে আহবান করে’ তাকে বেআদব’ অভদ্র বলা হবে’  যদিও কথাগুলো সত্য । তার সম্পর্কে বলা হবে -সমতাসূচক শব্দাবলী  দ্বারা কেন সে মরুব্বীদের সম্বোধন করলো? আর হুজুর (আলাইহিস সালাম) হচ্ছেন  আল্লহ পাকের সর্ব শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি, তাঁর নাম ধরে ডাকা, বা তাঁকে ‘ভাই’ ইত্যাদি বলে অভিহিত করা নিশ্চিতরূপে ‘হারাম’। ঘরের মধ্যে বোন, মা, স্ত্রী ও কন্যা সবেই মেয়ে লোক কিন্তু তাদের নাম, কাজকর্ম ও তাদের সাথে আচরণের রীতি-নীতি ভিন্ন। কেউ যদি মাকে স্ত্রী বলে বা স্ত্রীকে মা ডাকে, সে বেঈমান ; যে ব্যাক্তি তাদের সবাইকে একই দৃষ্টিভঙ্গি দেখে,  সে ‘মরদুদ’। অনুরূপ, যে  নবীকে উম্মত ও উম্মতের কাউকে নবীর মত মনে করে, সে ‘মলউন’ (অভিশপ্ত) । দেওবন্দীগণ নবীকে উম্মতের সমপর্যায়ে নিয়ে  এসেছে বা তাদের পথের দিশারী/নেতা মওলী ইসমাঈল, সৈয়দ আহমদ বেরলবীকে নবীর স্তরে নিয়ে গেছেন । খোদা মাফ করুন । (‘সিরাতুল সুস্তাকীম’ গ্রন্থের সমাপ্তি পর্ব  দ্রষ্টব্য)
৩। মহান আল্লাহ তায়ালা যাকে কোন বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন, তাঁকে সাধারণের জন্য ব্যবহৃত উপাধি দ্বারা  আহবান করা তাঁর উচ্চ পদ  মর্যাদাকে অস্বীকার করার নামান্তর । পার্থিব সরকারের পক্ষ থেকে কেউ যদি ‘নবাব’ বা খান ‘বাহাদুর’ খেতাব পান, তাহলে তাকে ‘মানুষ’ ,মানব সন্তান’ বা ‘ভাই’ ইত্যাদি বলে ডাকা তথা তাঁর প্রপ্ত উপাধির মাধ্যমে না ডাকা অপরাধ হিসেবে গণ্য । কারণ এ ধরনের আচরণ দ্বারা সরকার প্রদত্ত উপাধিসমূহের প্রতি তার অসন্তোষ প্রকাশ পাচ্ছে ।  তাহলে যে মহান সত্ত্বাকে আল্লাহ তা’আলা ‘নবী-রাসুল’ ইত্যাদি উপাধিকে ভূষিত করেছেন’ তাকে ওসব উপাধি বাদ দিয়ে ‘ভাই’  ইত্যাদি বলে  অভিহিত করা মারাত্মক অপরাধ ।
৪। স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা মহা প্রতিপালক হয়েও যেখানে কুরআন করীমের মধ্যে হুযুর  (আলাইহিস সালাম) কে ‘হে মুহাম্মদ’ হে  ‘মুমিনদের ভাই’ বলে সম্বোধন করেননি, বরং ‘হে নবী’ ‘হে রাসুল’ হে কম্বলাবৃত বন্ধু’ ‘হে চাদর পরিহিত বন্ধু প্রভৃতি প্রিয়-উপাধিসমূহ দ্বারা সম্বোধন করেছেন, সে ক্ষেত্রে আমাদের মত গোলামদের তাঁকে মানুষ’ বা ভাই’ বলে আখ্যায়িত করার কি অধিকার আছে?
৫ । কুরআন মক্কার কাফিরদের চিরাচরিত প্রথার বর্ণনা দিচ্ছে-

قَالُوْا مَا اَنْتُمْاِلَّابَشَرٌ مِّثْلُنَا لَئِنْ اَطَعْتُمْ بَشْرً امِثْلَكُمْ اِىَّكُمْ اِذًا لَّخَسِرُوْنَ

(তাঁরা বলত, আপনারা আমাদেরই মত মানুষ বৈ অন্য কিছু নন)।  (তোমরা যদি তোমাদের মত একজন মানুষের কথা  মত চল, তাহলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে গণ্য ।) ইত্যাদি ইত্যাদি ।
এ ধরনের আরও অনেক আয়াত আছে । এভাবে সমতা বিধান বা আম্বিয়ায়ে কিরামের মান-সম্মান খর্ব করা ইবলীসের রীতি । সে বলেছিল –

خَلَقْتَنِىْ مِنْ نَّارٍ وَّخَلَقْتَهُ مِنْ طِيْنٍ

[হে খোদা! তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ আগুন থেকে, আর তাকে (হযরত আদম আলাইহিস সালাম) সৃষ্টি করেছে  মাটি থেকে।] এ কথার তাৎপর্য  হলো আমি তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ।’ এরূপ আমাদের ও পয়গাম্বরদের মধ্যে কি পার্থক্য আমরা যেমন মনুষ তাঁরাও সেরূপ মানুষ বরং আমরা জীবিত, তারা মৃত এসব ইবলীসী কথা ও ধ্যান ধ্যারণা । -সুত্রঃ জা’আল হক ১ম খন্ড-

রাসুল (দঃ) কে ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ’ বলে আহবান করা জায়েয

হুযুর (আলাইহিস সালাম) কে দূর বা কাছ থেকে আহবান করা বৈধ- তাঁর পবিত্র ইহ-লৌকিক জীবনে ও তাঁর ওফাতের পরেও। তাই একজন ইয়া রাসুলাল্লাহ’ বলে আহবান করুক, কিংবা এক দলের সবাই মিলে সমবেত কন্ঠে ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ’ বলে শ্লোগান দিক এ উভয় ক্ষেত্রে এ আহবান বৈধ।
হুযুর (আলাইহিস সালাম) কে আহবান করার স্বপক্ষে প্রমাণাদি কুরআন করীম, ফিরিশতা ও সাহাবীদের কর্মকাণ্ড ও উম্মতের বিবিধ কার্যাবলীতে সুস্পষ্টরুপে বিদ্যমান রয়েছে। কুরআন করীমে অনেক জায়গা আছে।

يَااَيُّهَا النَّبِىُّ يَااَ يُّهَا الرَّسُوْلُ يَا اَيَّهَا الْمُزَمِّلُ يَا اَيُّهَا الْمُدَثِّرُ

হে নবী, হে রাসূল, ওহে কম্বলাবৃত বন্ধু, ওহে চাদরাবৃত বন্ধু ইত্যাদি বলে। দেখা যায়, উল্লেখিত আয়াতে সমূহে তাকে আহবান করা হয়েছে। অন্যান্য নবীদেরকে অবশ্য তাদের নাম ধরেই সম্বোধন করেছে কুরআন করীম । যেমন

يَايَحْيى يَااِبْرَ اهِيْمَ يَااَدم يَامُوْسى يَاعِيْسى

হে মুছা, হে ঈসা, হে ইয়াহয়া, হে ইব্রাহীম, হে আদম ইত্যাদি (আলাইহিমুস সালাম)। কিন্তু মাহবুব (আলাইহিস সালাম) কে আহবান করেছে প্রিয় উপাধিসমূহে ভূষিত করে। কবির ভাষায়ঃ-

ياادم است باپدر انبياء خطاب
يا ايها النبي خطاب محمد است

নবীগণের জনক হযরত আদম (আঃ) কে ডাকা হয়েছে ইয়া আদামু বলে, আর মুহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাহে ওয়াসাল্লাম) কে ডাকা হয়েছে ওহে নবী উপাধিতে ।
কুরআন করীম বরঞ্চ সাধারণ মুসলমানদেরকেও এভাবে আহবান করেছে- يَااَيُّهَاالَّذِيْنَ اَمَنُوْا (হে ঈমানদারগণ।) আর তাঁদেরকে নির্দেশ দিয়েছে- মাহবুব আলাইহিস সালামকে আহবান করো সম্মানসূচক উপাধিসমূহের মাধ্যমে। কুরআন ইরশাদ করছে-

لَاتَجْعَلُوْا دُعَاءَالرَّسُوْلِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضُكُمْ بَعْضًا

তোমরা রাসুলকে এমনভাবে ডেকো না, যেভাবে তোমরা একে অপরকে ডাক। এখানে তাঁকে ডাকতে নিষেধ করা হয়নি । বরং অন্যান্যদেরকে ডাকার মত না ডাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কুরআন অন্যত্র ইরশাদ করেছে-
اُدْعُوْ هُمْ لِابَاءِهِمْ ‌‌ তাদেরকে তাদের পিতার সাথে সম্পর্ক যুক্ত করে ডাকা)। এ আয়াতে এ কথাটির অনুমতি দেয়া হয়েছে যে, যায়েদ ইবনে হরিছা (রাঃ) কে ইবনে হারিছা অর্থাৎ হারিছা এর পুত্র বলে ডাক, কিন্তু তাঁকে ইবনে রাসুলাল্লাহ বা রাসুলুল্লাহর পুত্র বলে ডেকো না। এরূপ কাফিরদেরকেও অনুমতি দেয়া হয়েছে তাদের সাহায্যার্থে তাদের সাহায্যকারীদেরকে ডাকার-

وَادْعُوْاشُهَدَاءَ كُمْ مِنْ دُوْنِ اللهِ اِنْ كُنْتُمْ صدِقِيْنَ

অর্থাৎ তোমরা যদি নিজের দাবীর ব্যাপারে সত্যবাদী হও, তা’হলে আল্লাহর সাথে সম্পর্কহীন তোমাদের অন্যান্য সাহায্যকারীদেরকে ডেকো ।
‘মিশকাত’ শরীফের প্রথম হাদীছে আছে, হযরত জিব্রাইল (আঃ) আরয করছিলেনঃ  يَامُحَمَّدُ اَخْبِرْنِىْ عَنِ الْاِسْلَامِ
‘হে মুহাম্মদ, আমাকে ইসলাম সম্পর্কে অবহিত করুন । এখানে আহবান করার বিধান পাওয়া গেল। সে একই মিশকাত শরীফের ‘ওফাতুন্নবী’ শীর্ষক অধ্যায়ে আছে, হুযুর (আলাইহিস সালাম) এর ওফাতের সময় মলকুল মউত আরয করছিলেনঃ

يَامُحَمَّدُ اِنَّ اللهَ اَرْسَلَنِىْ اِلَيْكَ

হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম), আল্লাহ  তা’আলা আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছ্নে। দেখুন, এখানেও ইয়া মুহাম্মদ বলে আহবান করা হয়েছে। ইবনে মাজা শরীফের সালাতুল ‘হাজত’ শীর্ষক অধ্যায়ে হযরত উছমান ইবনে হানীফ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, এক অন্ধ ব্যক্তি হুযুর (আলাইহিস সালাম) এর মহান দরবারে উপস্থিত হয়ে অন্ধত্ব দূরীকরণার্থে দোয়া প্রার্থী হয়েছিলেন, হুযুর (আলাইহিস সালাম) তাকে শিখিয়ে দিলেন এ দু’আটিঃ

اَلَّهُمَّاِنِّىْ اَسْئَلُكَ وَاَتَوَ جَّهُ اِلَيْكَ بِمُحَمَّدٍ نَّبِىِّ الرَّحْمَةِ يَا مُحَمَّدُ اِنِّىْ قَدْتَوَجَّهْتُ بِكَ اِلَى رَبِّىْ فِيْ حَاجَتِىْ هذِه لِتَقْضِىَ اَللَّهُمَّ فَشَفِّعْهُ فِىَّ قَالُ اَبُوْا اِسْحقَ هذَا حَدِيْثٌ صَحِيْحٌ

(হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি রহমতের নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) মারফত তোমার দিকে মনোনিবেশ করছি। হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়ামাল্লাম) আমি আপনার মাধ্যমে আপন প্রতিপালকের দিকে আমার এ উদ্দেশ্য (অন্ধত্ব মোচন) পূরণ করার নিমিত্তে মনোনিবেশ করলাম যাতে আপনি আমার এ উদ্দেশ্য পূরণ করে দিন। হে আল্লাহ, আমার অনুকূলে হুযুর (আলাইহিস সালাম) এর সুপারিশ কবুল করুন।) এ হাদীছটির বিশুদ্ধতা প্রসঙ্গে হযরত আবু ইসহাক (রহঃ) বলেছেন এ হাদীছটি বিশুদ্ধ (সহীহ)।
লক্ষ করুন দু’আটি কিয়ামত পর্যন্ত ধরাপৃষ্ঠে আগমনকারী মুসলমানদের জন্য শিক্ষার বিষয় বস্তুতে পরিণত হল। এখানে হুযুর (আলাইহিস সালাম) কে আহবান করা হয়েছে এবং তার সাহায্য ও প্রার্থনা করা হয়েছে।
ফতওয়ায়ে আলমগীর ১ম খণ্ডের কিতাবুল হজ্জ্ব এর আদাবু যিয়ারতে কবরিন্নবী আলাইহিস সালাম শীর্ষক বর্ণনায় উল্লেখিত আছেঃ-

ثُمَّ يَقُوْلُ اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ يَا نَبِىَّ اللهِ اَشْهَدُاَنَّكَ رَسُوْلُ اللهِ

অতঃপর নবীর রওযা যিয়ারতকারী ব্যক্তি বলবে-হে নবী, আপনার প্রতি আমার সালাম, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসুল।
এর পর লিখা হয়েছেঃ

وَيَقُوْلُ اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ يَاخَلِيْفَةَ رَسُوْلِ اللهِ اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ يَا صَاحِبَ رَسُوْلِ اللهِ فِى الْغَارِ

যিয়ারতকারী এর পর বলবে ওহে রাসুলাল্লাহর সত্যিকার প্রতিনিধি, আপনার প্রতি সালাম ওহে রাসুলের গুহার সাথী (ছউর নামক পাহাড়ের গুহায় সহাবস্থানকারী) আপনার প্রতি আমার সালাম এর পর আরও লিখা হয়েছেঃ

فَيْقُرْدُاَسَّلَامُ عَلَيْكَ يَا اَمِيْرَ الْمُؤْمِنِيْنَ اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ يَا مُظْهِرَ الْاِسْلَامِ اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ يَامُكَسِّرَ الْاَصَنَامِ

যিয়ারতকারী তারপর বলবে ওহে মুসলমানদের আমীর আপনার প্রতি সালাম ওহে মূর্তি নিধনকারী আপনার প্রতি সালাম,(রাদিয়াল্লাহু আনহুম।)। এখানে দেখুন হুযুর (আলাইহিস সালাম) কে ডাকা হয়েছে এবং তারই পার্শ্বদেশে শায়িত হযরত সিদ্দীকি ও ফারুক (রাঃ) কেও ডাকার বিধান রাখা হয়েছে। এ উম্মতের শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় আসীন ব্যক্তিবর্গ আওলিয়ায়ে মিল্লাত মশায়েখ ও বুযুর্গানে দ্বীন ও তাদের দুআ ও নির্ধারিত পাঠ্য ওয়াযীফাসমূহেও ইয়া রাসুলাল্লাহ বলে আহবান করে থাকেন। যেমন কসীদায়ে বোর্দা শরীফে আছেঃ-

يَااَكْرَمَ الْخَلْقِ مَالِىْ مَنْ اَلُوْذُبِه
سِوَاكَ عِنْدَ حُلُوْلِ الْحَادِثِ الْعَمُم

হে সৃষ্ট জীবের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত সত্ত্বা আপনি ছাড়া আমার এমন কেউ নেই যার কাছে ব্যাপক বিপদাপদের সময় আশ্রয় নিতে পারি।
হযরত ইমাম যয়নুল আবেদীন (রহঃ) স্বীয় কসীদায় নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) কে আহবান করেছেন এভাবেঃ- হে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রহমতের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) সেই যয়নুল আবেদীনের সাহায্যে এগিয়ে আসুন যে, জালিমদের ভিড়ের মধ্যে তাদের হাতে বন্দী হয়ে কাল যাপন করছে।
স্বনামধন্য আল্লামা জামী (রহঃ) বলেছেন- আপনার বিরহ বেদনায় সৃষ্টি জগতের প্রাণে ওষ্ঠাগত। হে আল্লাহর নবী আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন দয়ার ভান্ডার খুলে দিন। কেন, আপনি সারা বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ নন কি? আমাদের কত বঞ্চিত ও পাপীদের প্রতি এত বিমুখ হয়ে রয়েছেন কেন?
হযরত ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) স্বীয় কসীদায়ে নু’মানে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) কে আহবান করেছেন এভাবে-

يَاسَيِّدَ السَّادَاتِ جِئْتُكَ قَاصِدًا
اَرْجُوْرِ ضَاكَ وَاَحْتَمِىْ بِحِمَاكَ

ওহে সর্দারদের সর্দার অন্তরে দৃঢ় আশা নিয়ে আপনার কাছে এসেছি আপনার সন্তুষ্টির প্রত্যাশী হয়েছি এবং নিজে আপনার আশ্রয়ে সমর্পণ করছি।
এসব কবিতার স্তবকসমূহ হুযুর (আলাইহিস সালাম) কে আহবান করা হয়েছে তার সাহায্য কামনা করা হয়েছে। এ আহবান করা হয়েছে দূর থেকে তাঁর ওফতের পর। সকল মুসলমান নামাযে বলেনঃ اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ اَيُّهَا النَّبِىُّ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرْكَاتُهُ  ওহে নবী! আপনার প্রতি সালাম আল্লাহর রহমত ও বরকতসমূহ আপনার উপর বর্ষিত হোক! নামাযে তাঁকে এভাবে আহবান করা ওয়াজিব বা আবশ্যিক কর্তব্য। এ আততাহিয়াতু প্রসঙ্গে হাযির-নাযির এ আলোচনায় সুবিখ্যাত ফতওয়ায়ে শামী ও আশআতুল লমআত গ্রন্থদ্বয়ের উদ্ধৃতি সমূহ আগেই পেশ করেছি।
এতক্ষণ পর্যন্ত পর্যালোচনা করা হল এককভাবে ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ’ বলা প্রসঙ্গে। যদি অনেক লোক একত্রে সমবেত হয়ে সমবেত কণ্ঠে ‘নারায়ে-রিসালাত’ ধ্বনি তোলে, তা’হলে তা’ও জায়েয। কারণ, যখন এককভাবে ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ’ বলা জায়েয, তখন এক সাথে সবাই মিলে বলাও জায়েয হবে বৈকি। কয়কটি ‘মুবাহ’ (যে সব কাজ করলে কোন ছওয়াব নেই, না করলেও কোন পাপ নেই, সে সব কাজ মুবাহ ।) কাজকে একত্রিত করলে সমষ্টিও মুবাহ বলে গণ্য হবে । যেমন-বিরানী হালাল । কেননা তা হচ্ছে কয়কটি হালাল দ্রব্যাদির সমষ্টি মাত্র।
অধিকন্তু, সবাই মিলে সমকেত কন্ঠে নবী  (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম ) কে আহবান করার স্বপক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণও রয়েছে।
মুসলিম শরীফ দ্বিতীয় খণ্ডের শেষে ‘হাদীছুল হিজরত’ শিরোনামের অধ্যায়ে হযরত বরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, হুযুর (আলাইহিস সালাম) যখন মক্কা ত্যাগ করে মদীনা শরীফের প্রান্ত সীমায় প্রবেশ করলেন, তখন তাঁকে কিরুপে স্বাগত জানানো হয়েছিল তার বিবরণ হাদীছের ভাষায় শুনুনঃ

فَصَعَدَ الرِّجَالُ وَالنِّسَاءُ فَوْقَ الْبُيُوْتِ وَتَفَرَّقَ الْغِلْمَانُ وَالْخَدمُ فِى الصُّرُقِ يُنَادُوْنَ يَامُحَمَّدُ يَارَسُوْلَ اللهِ يَامُحَمَّدُ يَارَسُوْلَ اللهِ

তখন মদীনার নারী পুরুষ ঘরের ছাদসমূহের উপর আরোহণ করেন, ছোট ছোট ছেলে ও ক্রীতদাসগণ মদীনার অলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়েন, সবাই ‘ইয়া মুহাম্মদ’ ইয়া রাসুলাল্লাহ ’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলেন। মুসলিম শরীফের এ হাদীছে নারায়ে রিসালাত ধ্বনি তোলার সুস্পষ্ট প্রমাণ বিধৃত। জানা গেল যে, সমস্ত সাহাবায়ে কিরাম নারায়ে রিসালতের ধ্বনি তুলতেন। এ হাদীছে হিজরতে একথাও আছে যে, সাহাবায়ে কেরাম জুলুসও বের করেছেন। হুযুর (আলাইহিস সালাম) যখনই কোন সফর থেকে মদীনা শরীফে ফিরে আসতেন তখন মদীনা বাসীগণ তাকে প্রাণঢালা সম্বর্ধনা জানাতেন এবং তাঁর সম্মানার্থে ‘জুলুস’ বের করতেন।  (মিশকাত ও বুখারী প্রভৃতি হাদীছগ্রন্থ দ্রষ্টব্য)। উল্লেখ্য যে, আরবী ‘জুলসা’ শব্দের অর্থ  হল ‘বৈঠক বা উপবেশন’। এ শব্দটির বহুবচন হচ্ছে ‘জুলুস’ যেমন জলদাহ শব্দের বহুবচন হচ্ছে ‘জুলুদ’ অর্থ হচ্ছে বেত্রাঘাত তখন দুররা নামে অভিহিত হত।
নামায ও আল্লাহর যিকরের  জলসা-একই জায়গায় বসে সম্পন্ন করা হয়। আর হজ্জ্ব হচ্ছে যিকরের ‘জুলুস’- এক বৈঠকে সম্পন্ন করা যায় না বরং বিভীন্ন জায়গায় ঘুরে ফিরে সম্পন্ন করতে হয়। কুরআন থেকে প্রমান পাওয়া যায় যে, তাবুতে ছকীনা (বনী  ইস্রাঈলের অতি বরকতমন্ডিত ‘সমশাদ’ বৃক্ষ নির্মিত একটি  বাক্স  যেখানে হযরত মুসা ও হারুন আলাইহিস সালাম এর লাঠি, পাগড়ী, পাদুকা, কোপড়-চোপড় রক্ষিত ছিল)। ফিরিশতাগণ ‘জুলুস’ সহকারে নিয়ে এসেছিলেন। হুযুর আলাইহিস সালাম এর শুভ জন্মক্ষণেও মিরাজের রাতে ফিরিশতাগণ তার সম্মানার্থে ‘জুলুস’ বের করেছিলেন। সৎ ও পুতঃ মাখলুকের অনুকরণ করাও পুণ্য কাজ। সুতরাং বর্তমানে জুলুসের যে প্রচলন আছে, তা পূর্বসুরীদের অনুকরণ, বিধায় একটি পূণ্য কাজ। -সুত্রঃ জা’আল হক ১ম খন্ড-

তাকলীদের অর্থ ও প্রকারভেদ

তাকলীদের দুটো অর্থ আছে একটি আভিধানিক, অপরটি পারিভাষিক বা শরীয়তে ব্যবহৃত। তাকলীদের আভিধানিক অর্থ হলো গলায় বেষ্টনী বা হার লাগানো। শরীয়তের পরিভাষায় তাকলীদ হলো কারো উক্তি বা কর্মকে নিজের জন্য শরীয়তের জরুরী বিধান হিসেবে গ্রহণ করা কেননা তার উক্তি বা কর্ম আমাদের জন্য দলীলরূপে পরিগণিত। কারণ উহা শরীয়তে গবেষণা প্রসূত। যেমন আমরা ইমাম আজম সাহেব (রহমতুল্লাহে আলাইহে) এর উক্তি ও কর্মকে শরীয়তের মাসআলার দলীলরূপে গণ্য করি এবং সংশ্লিষ্ট শরীয়তের দলীলাদি দেখার প্রয়োজন বোধ করি না।
হুসসামীর টীকায় রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর অনুসরণ অধ্যায়ের ৮৬ পৃষ্ঠায় ‘শরহে মুখতাসারুল মানার’ হতে উদ্ধৃত করা হয়েছে-

التَّقْلِيْدُ اِتبَاعُ الرَّجْلِ غَيْرَهُ فِيْمَا سَمِعَه يَقُوْلُ اَوْفِىْ فِعْلِه عَلى زَعْمِ اَنَّهُ مُحَقِّقٌ بِلَا نَظَرٍ فِى الدَّلِيْلِ

অর্থাৎ-তাকলীদ হলো কোন দলীল প্রমাণের প্রতি দৃষ্টিপাত না করে কোন গবেষকের উক্তি বা কৃত কর্ম শুনে তাঁর অনুসরণ করা।
‘নূরুল আনওয়ার’ গ্রন্থে তাকলীদের বর্ণনায় একই কথা বর্ণিত হয়েছে।
ইমাম গাযযালী (রাহমতুল্লাহে আলাইহে) ও কিতাবুল মুস্তাফা এর ২য় খণ্ডের ৩৮৭ পৃষ্ঠায় বলেছেন-

اَتَّقْلِيْدُ هُوَ قَبُوْلُ قَوْلٍ بِلَا حُجَّةٍ

অর্থাৎ তাকলীদ হলো কারো উক্তিকে বিনা দলীলে গ্রহণ করা।
মুসাল্লামুসছবুত গ্রন্থে বলা হয়েছে

اَلتَّقْلِيْدُ اَلْعَمْلُ بِقَوْلِ الْغَيْرِ مِنْ غَيْرِ حُجَّةٍ

(অর্থাৎ-তাকলীদ হলো কোন দলীল প্রমাণ ব্যতিরেকে অন্যের কথানুযায়ী আমল করা।)
উপরোক্ত সংজ্ঞা থেকে বোঝা গেল যে হুযুর আলাইহিস সালামের অনুসরণকে তাকলীদ বলা যাবে না। কেননা তার প্রত্যেকটি উক্তি ও কর্ম শরীয়তের দলীল। আর তাকলীদের ক্ষেত্রে শরীয়তের দলীলের প্রতি দৃষ্টিপাত করা হয় না। সুতরাং আমাদেরকে হুযুর আলাইহিস সালামের উম্মত হিসেবে অভিহিত করা হবে তার মুকাল্লিদ বা অনুসরণকারী হিসেবে গণ্য করা যাবে না। অনুরূপভাবে সাহাবায়ে কিরাম ও দ্বীনের ইমামগণও হুযুর আলাইহিস সালামের উম্মত মুকাল্লিদ নন। এরূপ সাধারণ মুসলমানগণ যে কোন আলিমেদ্বীনের অনুসরণ করে থাকেন, এটাকেও তাকলীদ বলা যাবে না। কেননা কেউ আলিমদের কথা বা কর্মকে নিজের জন্য দলীল রূপে গ্রহণ করে না। আলিমরা কিতাব দেখে কথা বলেন এ কথা উপলদ্ধি করে তাঁদেরকে মান্য করা হয়। যদি তাদের  ফতওয়া ভূল কিংবা কিতাবের বিপরীত প্রমাণিত হয় তখন কেউ তা গ্রহণ করবে না। পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানীফা (রাহমতুল্লাহে আলাইহে) যদি কুরআন বা হাদীছ বা উম্মতের সর্বসম্মত অভিমত দেখে কোন মাসআলা ব্যক্ত করেন তাও যেমনি গ্রহণযোগ্য আবার নিজস্ব কিয়াস বা যুক্তিগ্রাহ্য কোন মত প্রকাশ করলে তাও গ্রহণীয় হবে। এ পার্থক্যটা স্মরণ রাখা একান্ত দরকার।
তাকলীদ দুই রকমের আছে তাকলীদে শারঈ ও তাকলীদে গায়র শারঈ। শরীয়তের বিধান সম্পর্কিত ব্যাপারে কারো অনুসরণ করাকে তাকলীদে শারঈ বলা হয়। যেমন রোযা, নামায, যাকাত ইত্যাদি মাসাইলে ধর্মীয় ইমামদের অনুসরণ করা হয়। আর দুনিয়াবী বিষয়াদিতে কারো অনুসরণ করাকে তাকলীদে গায়র শারঈ বলা হয়। যেমন চিকিৎসকগণ চিকিৎসা শাস্ত্রে বু’আলী সীনাকে, কবিগণ দাগ, আমীর বা মির্যা গালিবকে এবং আরবী ভাষার দ্বিবিধ ব্যাকরণ নাহব ও ছরফের পণ্ডিতগণ সীবওয়াই ও খলীলকে অনুসরণ করে থাকেন। এ রকম প্রত্যেক পেশার লোকেরা তাদের নিজ নিজ পেশার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অনুসরণ করে থাকে। এ গুলো হলো দুনিয়াবী তাকলীদ।
আবার সুফীয়ানে কিরাম তাদের ওয়াজীফা ও আমলের ব্যাপারে নিজ নিজ মাশায়িখের উক্তি ও কর্মের অনূসরণ করে থাকেন। এটা অবশ্য দ্বীনী তাকলীদ কিন্তু শারঈ তাকলীদ নয়। বরং একে তাকলীদ ফিত তারীকত বলা হয়। কেননা এখানে শরীয়তের মাসাইলের হালাল হারামের ব্যাপারে অনুসরণ করা হয় না। হ্যাঁ যে কর্ম পদ্ধতির অনুসরণ করা হয় উহাও ধর্মীয় কাজ বৈকি।
তাকলীদে গায়র শারঈ কোন ক্ষেত্রে যদি শরীয়তের পরিপন্থী হয় তাহলে সে তাকলীদ হারাম। যদি ইসলাম বিরোধী না হয় তাহলে জায়েয। বৃদ্ধা মহিলারা আনন্দ বিষাদের সময় বাপ-দাদাদের উদ্ভাবিত কতগুলো শারীয়ত বিরোধী প্রথার অনুসরণ করে, ইহা হারাম। চিকিৎসকগণ চিকিৎসা শাস্ত্রের ব্যাপারে বু’আলী সীনা প্রমুখের অনুসরণ করে থাকেন, ইহা ইসলাম বিরোধী না হলে জায়েয। প্রথম প্রকারের হারাম তাকলীদকে কুরআন শরীফের বিভিন্ন আয়াতে নিষেধ করা হয়েছে এবং এ ধরনের তাকলীদকারীদের নিন্দা করা হয়েছে। এ সম্পর্কে নিম্নে কয়েকটি আয়াতের উল্লেখ করা হলো-

وَلَا تُطِعْ مَنْ اَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَنْ ذِكْرِنَا وَاتبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ اَمْرُه فُرُطًا

(তার কথা শুনবেন না, যার দিলকে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ করেছি যে নিজ প্রবৃত্তির বশীভূত ও যার কাজ সীমা লঙ্ঘন করেছে)

وَ اِنْ جَاهَدَ اكَ  عَلى اَنْ تُشْرِكَ بِى مَالَيْسَ لَكَ بِه عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا

এবং যদি তারা (পিতা-মাতা) তোমাকে এমন কোন বস্তুকে আমার অংশীদাররূপে স্বীকার করানোর চেষ্টা করে যার সম্পর্কে তোমার সম্যক ধারণা নেই তবে তাদের কথা শুনিও না।)

وَ اِذَا قِيْلَ لَهُمْ تَعَالَوْا اِلى مَا اَنْزل اللهُ وَاِلى الرَّسُوْلِ قَالُوْا حَسْبُنَا مَا وَجَدْ نَا عَلَيْهِ اَبَاءَنَا وَلَوْ كَانَ اَبَاءُهُمْ لَايَعْلَمُوْنَ شَيْأً وَّيَهْتَدُوْنَ

(এবং যখন তাদেরকে (কাফিরদেরকে) বলা হয় আল্লাহ তা’আলা যা অবতীর্ণ করেছেন, সে দিকে এবং রসূলের দিকে আগমন কর, তখন তারা বলতো ওই কর্মপন্থাই আমাদের জন্য যথেষ্ট যা আমাদের বাপ-দাদাদের মধ্যে অনুসৃত হয়ে আসছে। যদিও তাদের বাপ-দাদাগণ না কিছুই জানতো না সৎ পথে ছিল।

وَ اِذَا قِيْلَ لَهُمُ اتَّبِعُوْا مَااَنْزَلَ اللهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا اَلْفَيْنَا عَلَيْهِ ابَاءنَا (ط)

(যখন তাদেরকে বলা হতো আল্লাহর অবতীর্ণ প্রত্যাদেশ অনুযায়ী চলো, তখন তারা বলতো আমরা আমাদের বাপ-দাদাগণকে যে পথে পেয়েছি সে পথেই চলবো।
উল্লেখিত আয়াত ও এ ধরনের অন্যান্য আরও আয়াতে শরীয়তের মুকাবিলায় মূর্খ বাপ-দাদাগণের হারাম ও গর্হিত কার্যাবলীর অনুসরণ করার নিন্দা করা হয়েছে। তারা বলতো আমাদের বাপ-দাদাগণ যেরূপ করতেন আমরাও সেরূপ করবো সে কাজ জায়েয হোক বা না জায়েয। উল্লেখ্য যে উল্লেখিত আয়াতের সঙ্গে শারঈ তাকলীদ এবং ধর্মীয় ইমামগণের অনুসরণের কোন সম্পর্ক নেই। অতএব ঐ সমস্ত আয়াতের ভিত্তিতে ইমামগণের তাকলীদকে শিরক কিংবা হারামরূপে গণ্য করা ধর্মহীনতার নামান্তর। এ কথাটুকু স্মরণ রাখা দরকার। -সুত্রঃ জা’আল হক ১ম খন্ড-

যুক্তিও বলে যে নবীগণ কুফরী ও পাপ থেকে সদা পবিত্র।

(১) কুফরী, হয়তো আকায়েদ সম্পর্কে অজ্ঞতা, কিংবা আত্মার অবাধ্যতা অথবা শয়তানের কুমন্ত্রণায় প্রকাশ পায়। কিন্তু আমি প্রথম অধ্যায়ে প্রমাণ করেছি যে, নবীগণ আল্লাহ ওয়ালা হয়েই জন্ম গ্রহণ করেন, অধিকন্তু তাদের আত্মাসমূহ পাক এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে নিরাপদ। যখন এ তিনটি কারণ অনুপস্থিত, তখন তাদের থেকে কুফরী ও পাপ কিভাবে প্রকাশ পেতে পারে?

(২) পাপ নফসে আম্মারা ও শয়তানের প্রভাবে হয়ে থাকে। কিন্তু তারা এ দু’টো থেকে নিরাপদ।
(৩) ফাসিকের বিরোধিতা করা প্রয়োজন, নবীর অনুসরণ করা ফরয। যে কোন অবস্থায় নবীদেরকে মান্য করতে হবে। যদি নবীও ফাসিক হয়, তাহলে অনুসরণও প্রয়োজন আবার ফাসিক হেতু বিরোধিতাও প্রয়োজন এবং এটা দু’টি বিপরীতধর্মী বস্তুকে একত্রিকরণের মত।
(৪) ফাসিকের কথা যাচাই না করে গ্রহণ করতে নেই। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ ফরমান- اِنْ جَاءَكُمْ فَاسِق بِنَبَافَتَبَيَّنُوْا ফাসিক কোন সংবাদ আনলে তা যাচাই করে দেখবে। কিন্তু নবীদের প্রত্যেক কথা বিনাবাক্যে গ্রহণ করা ফরয। যেমন- আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ ফরমান-

مَاكَانَ الِمُؤْمِنٍ وَّ لَامُؤْمِنَةٍ اِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُوْلُهُ اَمْرً ااَنْ يَّكُوْنَ لَهُمُ اَلخِيْرَةُ مِنْ اَمْرِهِمْ

(আল্লাহ ও তার রসুল কোন বিষয়ে নির্দেশ দিলে, কোন মুমিন পুরুষ বা নারীর সে বিষয়ে ভিন্নমত পোষণের অধিকার নেই।) নবী যদি ফাসিকও হয়ে থাকে, তাহলে বিনা বাক্যে তাঁদের নির্দেশ মান্য করাও প্রয়োজন, আবার মান্য না করাও প্রয়োজন। এতে দুটি বিপরীত বস্তু একত্রিকরণ।
(৫) গুনাহগারের প্রতি শয়তান রাজি, তাই সে শয়তানের দলের অন্তভূক্ত এবং নেক্কারের প্রতি আল্লাহ রাজি, তাই সে আল্লাহর দলভূক্ত। যদি কোন নবী এক মুহূর্তের জন্যেও গুনাহগার হয়, তাহলে মায়াজাল্লা, তিনি শয়তানের দলভুক্ত হয়ে যান। কিন্তু তা কখনও সম্ভব নয়।
(৬) ফাসিক থেকে মুত্তাকী আফযল। আল্লাহতা’আলা ইরশাদ ফরমান- اَمْ نَجْعَلُ الْمُتَّقِيْنَ كَالْفُجَّارِ যদি নবী কোন সময় গুনাহে লিপ্ত হন আর সে সময় যদি তার কোন উম্মত নেকীর কাজ করতে থাকে, তাহলে সেই সময়ের জন্য উম্মতকে নবী থেকে আফযল বলতে হয়। কিন্তু তা অসম্ভব। কেননা কোন অবস্থাতেই উম্মত নবীর বরাবর হতে পরে না।
(৭) বদ আকীদা পোষণকারীর তাযীম হারাম। হাদীছ শরীফে বর্ণিত আছে-

 مَنْ وَقَّرَ صَاحِبَ بِدْعَةٍ فَقَدْ اَهانَ عَلى هَدَمِ الْاِسْلَامِ

যে ব্যক্তি বদ আকীদা পোষণকারীর সম্মান করলো, সে ইসলামকে ধ্বংস করতে সাহায্য করলো। আর নবীর প্রতি সম্মান করা হচ্ছে ওয়াজিব। যেমন আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ ফরমান- وَتُعَزِّرُوْهُ وَتُوَقِّرُوْهُ যদি কোন নবী এক মুহূর্তের জন্য ধর্মদ্রোহী হয়ে যায়, তখন তার তাযীমও ওয়াজিব আবার হারামও। এ রকম কি কখনও হতে পারে?
(৮) গুনাহগারদের ক্ষমা হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ওসীলায় হবে, যেমন আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ ফরমান-

وَلَوْ انَّهُمْ اِذْ ظَلَمُوْا اَنْفُسَهُمْ جَاءُوْكَ الاية

এ আয়াতে সাধারণ গুনাহগারদেরকে হুযূর পাকের সমীপে হাজির হয়ে তাঁর ওসীলায় ক্ষমা প্রার্থনা করার আহবান জানানো হয়েছে। যদি তিনি গুনাহে লিপ্ত হন, তার ওসীলা কে হবে? এবং কার বদৌলতে তাকে ক্ষমা করা হবে? যিনি সমস্ত গুনাহগারের মাগফিরাতের ওসীলা হবেন, তিনি স্বয়ং গুনাহ থেকে পাক হওয়াই চাই। যদি তিনিও গুনাহগার হন, তাহলে বিনা কারণে অগ্রাধিকারের প্রশ্ন আসবে।
(৯) মূল্যবান জিনিস মূল্যবান পাত্রে রাখা হয়। মুক্তা যেমন মূল্যবান, তেমন বাক্সও মূল্যবান হয়ে থাকে। স্বর্ণ অলংকারের বাক্সও মূল্যবান হয়ে থাকে। দুধের পাত্র দুর্গন্ধ ও টক থেকে হিফাজত রাখতে হয়, নতুবা দুধ নষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহর কুদরতী কারখানার মধ্যে নবুয়াত হচ্ছে অসাধারণ ও অনন্য নিয়ামত। তাই এর পাত্র অর্থাৎ নবীগণের আত্মা কুফরী, পাপ এবং সব রকমের নাপাকী থেকে পূতঃপবিত্র হওয়া চাই। এ জন্য আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ ফরমান- ওসব আত্মা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা অবগত, যেগুলো রিসালতের উপযোগী।
(১০) ফাসিক-ফাজিরের খবর সাক্ষ্য ছাড়া গ্রহণযোগ্য নয়। যদি নবীগণ ফাসিক হতেন, তাহলে তাদের প্রত্যেক সংবাদের জন্য সাক্ষীর প্রয়োজন হতো। অথচ নবীদের প্রত্যেক বাণী শত শত সাক্ষ্য থেকেও উত্তম। হযরত আবু খজিমা আনসারী (রাঃ) উট সম্পর্কে এটাইতো বলেছিলেন যে, হে আল্লাহর হাবীব, উটের ব্যবসা বেহেশত-দোযখ ও হাশর-নশর থেকে বড় নয়। যখন আমরা আপনার থেকে এসব শুনে ঈমান এনেছি, তাই সে পবিত্র মুখ থেকে এটা শুনে কেন বিশ্বাস করবো না? বাস্তবিকই আপনি উট ক্রয় করেছেন। এর পুরস্কার স্বরূপ তার এক জনের সাক্ষ্য দু’জনের সাক্ষ্যের সমতুল্য করে দিয়েছেন। -সুত্রঃ জা’আল হক ২য় খন্ড-

নবীগণ নিষ্পাপ (উলামায়ে উম্মতের উক্তিসমূহ)

নবীগণ যে নিষ্পাপ, এ ব্যাপারে সবসময় উম্মতে মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে ঐক্যমত রয়েছে। শয়তানী দল ছাড়া কেউ এটা অস্বীকার করে না। যেমন শরহে আকায়েদে নসফী, শরহে ফিকহ আকবর, তফ্সীরাতে আহমদীয়া, তফসীরে রূহুল বয়ান, মদারেজুন নাবুয়াত, মওয়াহেবে লাদুনিয়া, শিফা শরীফ, নছিমে রেয়াজ ইত্যাদি কিতাবে এর বিবরণ রয়েছে। তফ্সীরে রূহুল বয়ানে- مَاكُنْتَ تَدْرِىْ مَا الْكِنَب الااية আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখিত আছে-

এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, নবীগণ ওহী প্রাপ্তির আগে মুমিন ছিলেন এবং গুনাহ কবীরা, এমনকি জিল্লতীপূর্ণ সগীরা গুনাহ থেকেও পবিত্র ছিলেন। নবুয়াতের পরেও পবিত্রছিলেন। তফ্সীরাতে আহমদীয়াতে বর্ণিত আছে-

اِنَّهُمْ مَعْصُوْمُوْنَ عَنِ الْكُفْرِ قَبْلَ الْوَحِىْ وَبَعْدَهُ بِالْاِجْمَاعِ وَكَذَا عَنْ تَعَمُّدِ الْكَبَائِرِ عِنْدَالْجَمْهُوْرِ

নবীগণ ওহী প্রাপ্তির আগে এবং পরে সর্বসম্মতিক্রমে কুফরী থেকে নিষ্পাপ ছিলেন। অধিকাংশ আলিমদের মতে গুনাহে সগীরা থেকেও পবিত্র ছিলেন। মোট কথা হলো পরলোকগত উম্মতের সর্বসম্মত অভিমতে নবীগণ নিষ্পাপ এবং এটা এত সুস্পষ্ট অভিমত যে এর জন্য অন্যান্য ইবারত উদ্ধৃত করার আদৌ প্রয়োজন নেই।

নবীগণ নিষ্পাপ (হাদীছসমূহ দ্বারা প্রমান)

(১) মিশকাত শরীফের الوسوسة অধ্যায়ে বর্ণিত আছে যে, প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে একজন শয়তান অবস্থান করে, যাকে ‘করীন’ বলা হয়। কিন্তু আমার (হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) করীন মুসলমান হয়ে গেছে। সে আমাকে সুপরামর্শই দিয়ে থাকে।

(২) একই অধ্যায়ে, আরও বর্ণিত আছে যে, প্রত্যেক শিশুকে জন্মের সময় শয়তান মারে। কিন্তু হযরত ঈসা (আঃ) এর জন্মের সময় শয়তান ছুঁতেও পারেনি। এ হাদীছদ্বয় থেকে জানা গেল যে উল্লেখিত নবীদ্বয় শয়তানের প্ররোচনা থেকে মুক্ত।
(৩) মিশকাত শরীফের কিতাবুল গোসল থেকে জানা যায় যে, নবীদের স্বপ্নদোষ হয় না। কেননা এতে শয়তানী প্রভাব রয়েছে। এমনকি তাদের স্ত্রীগণও স্বপ্নদোষ থেকে পরিত্রাণ প্রাপ্ত।
(৪) নবীগণের হাই আসে না। এতেও শয়তানী প্রভাব রয়েছে। এ জন্য তখন ‘লা হওলা’ বলা হয়।
(৫) মিশকাত শরীফের ‘আলামাতে নবুয়াত’ শীর্ষক অধ্যায়ে বর্ণিত আছে- (হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বক্ষ বিদীর্ণ করে এক টুকরা মাংশ বের করে ফেলে দেয়া হয় এবং বলা হয় যে, সেটা শয়তানী অংশ। অতঃপর তা যম্ যম্ কুপের পানি দিয়ে ধুয়ে দেয়া হয়। এতে বোঝা গেল (হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর আত্মা শয়তানী প্রভাব থেকে পবিত্র।
(৬) মিশকাত শরীফের مناقب عمر শীর্ষক অধ্যায়ে বর্ণিত আছে- হযরত উমর (রাঃ) যে রাস্তা দিয়ে গমন করেন, তথা হতে শয়তান পালিয়ে যায়। এতে বোঝা গেল, যাঁর প্রতি নবীদের সুদৃষ্টি রয়েছে, তিনিও শয়তান থেকে নিরাপদ থাকেন। তাই নবীদের প্রশ্নই আসে না। -সুত্রঃ জা’আল হক ২য় খন্ড-

নবীগণ নিষ্পাপ (কুরআনী আয়াতসমূহ দ্বারা প্রমান)

নবীগণ যে নিষ্পাপ, তা কুরআনের বিভিন্ন আয়াত, বিশুদ্ধ হাদীছসমূহ, উম্মতের ঐক্যমত ও আকলী দলীলসমূহ দ্বারা প্রমাণিত আছে। একমাত্র সে অস্বীকার করতে পারে, যে মন মানসিকতার দিক দিয়ে অন্ধ।

কুরআনী আয়াতসমূহ :
(১) আল্লাহতা’আলা শয়তানকে বলেছেন-   اِنَّ عِبَادِىْ لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطنٌ (ওহে) ইবলীস, আমার বিশিষ্ট বান্দাদের উপর তোমার কোন কর্তৃত্ব নেই।)
(২) শয়তান নিজেই স্বীকার করেছিল- وَلَاُغْوِيَنهُمْ اَجْمَعِيْنَ اِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلِصِيْنَ (হে মওলা, তোমার বিশিষ্ট বান্দাগণ ব্যতীত বাকী সবাইকে বিপথগামী করবো।) এতে বোঝা গেল যে নবীগণ পর্যন্ত শয়তান যেতে পারে না। তাই সে তাঁদেরকে না পারে বিপথগামী করতে, না পারে কুপথে পরিচালনা করতে। তাহলে তাঁদের থেকে গুনাহ কিভাবে প্রকাশ পেতে পারে? আশ্চর্যের বিষয় নবীদেরকে মাসুম স্বীকার করে শয়তান তাদেরকে বিপথগামী করার থেকে নিজের অপারগতা স্বীকার করছে। অথচ এ যুগের ধর্মদ্রোহীরা তাদেরকে গুনাহগার মনে করছে। বাস্তবিকই এরা শয়তান থেকেও নিকৃষ্ট।
(৩) হযরত ইউসুফ (আঃ) বলেছিলেন- مَاكَانَ لَنَا اَنْ نشْرِكَ بِاللهِ  مِنْ شَيْئِ আমরা নবী সম্প্রদায়ের পক্ষে খোদার সাথে শিরক করাটা অশোভনীয়।)
(৪) হযরতশুয়াইব (আঃ) স্বীয় কউমকে বলেছিলেন- مَااُرِيْدَ اَنْ اَخَالِفَكُمْ اِلى مَا اَنْهَا كُمْ (যেটা তোমাদের নিষেধ করি, সেটা নিজে করবো, এ ধরনের ধারণা আমি করি না।) বোঝা গেল যে নবীগণ শিরক ও গুনাহ করার ধারণাও কখনো করেন না। এটাই হচ্ছে নিষ্কলুষতার হাকীকাত।
(৫) হযরতইউসুফ (আঃ) বলেছেন-

وَمَا اُبرى نَفْسِىْ اِنَّ النَّفْسَ لَاَمَّرَهٌ بِاالسُّوْءِ اِلَّا مَارَحِم رَبِّىْ

(আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না। মানুষের মন অবশ্যই মন্দকর্ম প্রবণ। তবে যার প্রতি আল্লাহর দয়া হয়েছে।) এখানে এ রকম বলা হয়নি যে, আমার আত্মা মন্দকর্মপ্রবণ, বরং বলেছেন- সাধারণ আত্মা জনসাধারণকে মন্দকর্মে অনুপ্রাণিত করে। কেবল ওসব আত্মাকে বিপথগামী করতে পারে না, যে গুলোর প্রতি খোদার বিশেষ রহমত রয়েছে। এ গুলো হচ্ছে নবীগণের আত্মা। তাঁদের আত্মা তাঁদেরকে ধোঁকা দিতে পারে না।
(৬) আল্লাহতা’আলা ইরশাদ ফরমান-

اِنَّ اللهُ اَصْطَفَى اَدَمَ وَنُوْحا وال اِبْرَاهِيْمَ وَالَ عِمْرَانَ عَلَى الْعلَمِيْنَ

(আদমকে, নুহকে, ইব্রাহীমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরকে আল্লাহ তা’আলা বিশ্বজগতে প্রাধান্য দিয়েছেন।) এতে বোঝা গেল সমস্ত জগতের মধ্যে নবীগণ শ্রেষ্ঠ। জগতের মধ্যে নিষ্পাপ ফিরিশতাগণও রয়েছেন। আর ফিরিশতাদের বৈশিষ্ট হচ্ছে- لَا يَعْصُوْنَ اللهَ مَااَمَرَ هُمْ তাঁরা কখনও নাফরমানী করেন না। যদি নবীগণ গুণাহগার হন, তাহলে ফিরিশতাগণ নিশ্চয়ই নবীদের উর্ধে স্থান পেতেন।
(৭) আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ ফরমান- لَايَنَالُ عَهْدِى الظّلِمِيْنَ আমার প্রতিশ্রুতি নবুয়তের সিলসিলা জালিমদের অর্থাৎ ফাসিকদের সাথে সংমিশ্রিত হবে না। এতে বোঝা গেল অনাচার ও নবুয়াত একত্রিত হতে পারে না। কুরআনকরীম নবীদের উক্তি উদ্ধৃত করে ইরশাদ করেছেন-

يَاقَوْمُ لَيْسَ بِىْ ضَلَالَةٌ وَّلكِنِّىْ رَسُوْلٌ مِّنْ رَّبِّ الْعلَمِيْنَ

(হে আমার কউম, আমার কাছে গুমরাহী বলতে কিছু নেই, আমি আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ।) এ আয়াতে لكنى শব্দ থেকে বোঝা গেল যে, গুমরাহী ও নবুয়াত একত্রিত করা যায় না। কেননা নবুয়াত হচ্ছে নূর আলো আর গুমরাহী হচ্ছে অন্ধকার। আলো-অন্ধকার একত্রিকরণ অসম্ভভ। -সুত্রঃ জা’আল হক ২য় খন্ড-

আঙ্গুলী চুম্বনের প্রমাণ

মুয়ায্যিন আযান দেয়ার সময় যখন ‘আশহাদুআন্না মুহাম্মদার রাসুলুল্লাহ’  اَشْهَدُ اَنَّ مُحَمَّدًا رَّسُوْلُ اللهِ  উচ্চারণ করে, তখন নিজের বৃদ্ধাঙ্গুরীদ্বয় বা শাহাদতের আঙ্গুল চুম্বন করে চুক্ষদ্বয়ে লাগানো মুস্তাহাব এবং এতে দীন-দুনিয়া উভয় জাহানের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে অনেক হাদীছ বর্ণিত আছে। সাহাবায়ে কিরাম থেকে এটা প্রমাণিত আছে এবং অধিকাংশ মুসলমান একে মুস্তাহাব মনে করে পালন করেন। ‘প্রসিদ্ধ সালাতে মস্উদী’ কিতাবের দ্বিতীয় খন্ড نماز শীর্ষক অধ্যায়ে উল্লেখিত আছে- “হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত আছে- যে ব্যক্তি আযানে আমার নাম শুনে স্বীয় বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চোখের উপর রাখে, আমি ওকে কিয়ামতের কাতার সমূহে খোঁজ করবো এবং নিজের পিছে পিছে বেহেশতে নিয়ে যাব।)”

তাফসীরে রূহুল বয়ানে ষষ্ঠ পারার সূরা মায়েদার আয়াত وَاِذَا نَادَيْتُمْ اِلَى الصَّلوةِ الاية এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে উল্লেখিত আছে-
“মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ’ বলার সময় নিজের শাহাদাতের আঙ্গুল সহ বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখে চুমু দেয়ার বিধানটা জঈফ রেওয়াতের সম্মত। কেননা এ বিধানটা মরফু হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়। কিন্তু মুহাদ্দিছীন কিরাম এ ব্যাপারে একমত যে আকর্ষণ সৃষ্টি ও ভীতি সঞ্চারের বেলায় জঈফ হাদীছ অনুযায়ী আমল করা জায়েয।)
ফাত্ওয়ায়ে শামীর প্রথম খন্ড الاذان শীর্ষক অধ্যায়ে বর্ণিত আছে-
আযানের প্রথম শাহাদত বলার সময়- صَلَّى اللهُ عَلَيْكَ يَارَسُوْلَ اللهِ (সাল্লাল্লাহু আলাইকা ইয়া রাসুলাল্লাহ) বলা মুস্তাহাব এবং দ্বিতীয় শাহাদত বলার সময়- قُرةُ عَيْنِىْ بِكَ يَارَسُوْلَ اللهِ  (কুর্রাতু আইনী বেকা ইয়া রাসুলাল্লাহ) বলবেন। অতঃপর নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখ স্বীয় চোখদ্বয়ের উপর রাখবেন এবং বলবেন- الَلهُمَّ مَتِّعْنِىْ بِالسَّمْعِ وَالْبَصَرِ (আল্লাহুম্মা মত্তায়েনী বিসসময়ে ওয়াল বসরে) এর ফলে হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওকে নিজের পিছনে পিছনে বেহেশতে নিয়ে যাবেন। অনুরূপ কনযুল ইবাদ ও কুহস্থানী গ্রন্থে বর্ণিত আছে। ফাত্ওয়ায়ে সূফিয়াতেও তদ্রুপ উল্লেখিত আছে। কিতাবুল ফিরদাউসে বর্ণিত আছে- যে ব্যক্তি আযানে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মদার রাসুলুল্লাহ‘ শুনে স্বীয় বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখ চুম্বন করে, আমি ওকে আমার পিছনে বেহেশতে নিয়ে যাব এবং ওকে বেহেশতের কাতারে অন্তর্ভূক্ত করবো। এর পরিপূর্ণ আলোচনা ‘বাহারুর রায়েক’ এর টীকায় বর্ণিত আছে।
উপরোক্ত ইবারতে ছয়টি কিতাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন- শামী, কনযুল ইবাদ, ফাত্ওয়ায়ে সূফিয়া, কিতাবুল ফিরদাউস, কুহস্থানী এবং ‘বাহারুর রায়েক’ এর টীকা। ওই সব কিতাবে একে মুস্তাহাব বলা হয়েছে। مقاصد حسنه فى الاحاديث الدئره على السنة  নামক  গ্রন্থে ইমাম সাখাবী (রহঃ) বর্ণনা করেছেন- ইমাম দায়লমী (রহঃ) ‘ফিরদাউস’ কিতাবে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে মুয়াযযিনের কন্ঠ থেকে যখন ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মদার রসুলুল্লাহ‘ শোনা গেল, তখন তিনি (রাঃ) তাই বললেন এবং স্বীয় শাহাদতের আঙ্গুলদ্বয়ের ভিতরের ভাগ চুমু দিলেন এবং চক্ষুদ্বয়ে লাগালেন।  তা’দেখে হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ ফরমান যে ব্যক্তি আমার এই প্রিয়জনের মত করবে, তাঁর জন্য আমার সুপারিশ অপরিহার্য।” এ হাদীছটি অবশ্য বিশুদ্ধ হাদীছের পর্যায়ভুক্ত নয়।
উক্ত মাকাসেদে হাসনা গ্রন্থে আবুল আব্বাসের (রহঃ) রচিত মুজেযাত গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে-
হযরত খিযির (আঃ) থেকে বর্ণিত আছে- যে ব্যক্তি মুয়াযযিনের কণ্ঠে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মদার রাসুলুল্লাহ’ শোনে যদি বলে-

مَرْحَيًابِحَبِيْبِىْ وَقُرَّةِ عَيْنِىْ مُحَمَّدِ ابْنِ عَبْدِ اللهِ

(মারাহাবা বে হাবীবী ওয়া কুররাতে আইনী মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ) অতঃপর স্বীয় বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুম্বন করে চোখে লাগাবে, তাহলে ওর চোখ কখনও পীড়িত হবে না।) উক্ত গ্রন্থে আরোও বর্ণনা করা হয়েছে- হযরত মুহাম্মদ ইবনে বাবা নিজের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে এক সময় জোরে বাতাস প্রবাহিত হয়েছিল। তখন তাঁর চোখে একটি পাথরের কনা পড়েছিল যা বের করতে পারেনি এবং খুবই ব্যথা অনুভব হচ্ছিল। 
যখন তিনি মুয়াযযিনের কণ্ঠে আশহাদু আন্না মুহাম্মদার রসুলুল্লাহ শুনলেন, তখন তিনি উপরোক্ত দুআটি পাঠ করলেন এবং অনায়াসে চোখ থেকে পাথর বের হয়ে গেল। একই ‘মকাসেদে হাসনা’ গ্রন্থে হযরত শামস মুহাম্মদ ইবনে সালেহ মদনী থেকে বর্ণিত আছে যে তিনি ইমাম আমজদ (মিসরের অধিবাসী পূর্ববর্তী উলামায়ে কিরামের অন্তর্ভূক্ত) কে বলতে শুনেছেন- যে ব্যক্তি আযানে হুযূর (সাল্লাল্লহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর নাম মুবারক শোনে স্বীয় শাহাদাত ও বৃদ্ধাঙ্গুলী একত্রিত করে-

وَقَبَّلَهُمَا وَمَسَحَ بِهِمَا عَيْنَيْهِ لَمْ يَرْ مُدْ اَبَدًا

উভয় আঙ্গুলকে চুম্বন করে চোখে লাগাবে, কখনও তার চক্ষু পীড়িত হবে না। ইরাক- আযমের কতেক মাশায়েখ বলেছেন যে, যিনি এ আমল করবেন, তাঁর চোখ রোগাক্রান্ত হবে না।

وَقَالَ لِىْ كُلّ مِنْهُمَا مُنذُ فَعَلْتُهُ لَمْ تَرْمُدْ عَيْنِىْ

কিতাব রচয়িতা বলেছেন- যখন থেকে আমি এ আমল করেছি আমার চক্ষু পীড়িত হয়নি।
কিছু অগ্রসর হয়ে উক্ত‘মকাসেদে হাসনা’গ্রন্থে আরও বর্ণিত হয়েছে-

وَقَالَ ابْنِ صَالِحٍ وَاَنَا مُنْذُ سَمِعْتُهُ اِسْتَعْمَلْتَهُ فَلَا تَرْمُدْ عَيْنِىْ وَاَرْجُوْا اَنَّ عَافِيَتَهُمَا تَدُوْمُ وَاِنِّىْ اَسْلَمُ مِنَ الْعَمى اِنْشَاءَ اللهُ

হযরত ইবনে সালেহ বলেছেন- যখন আমি এ ব্যাপারে জানলাম, তখন এর উপর আমল করলাম। এরপর থেকে আমার চোখে পীড়িত হয়নি। আমি আশা করি, ইনশাআল্লাহ এ আরাম সব সময় থাকবে এবং অন্ধত্ব মুক্ত থাকবো। উক্ত কিতাবে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে ইমাম হাসন (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মদার রাসুলুল্লাহ‘ শোনে যদি বলে  এবং

مَرْحَبًا بِحَبِيْبِىْ وَقُرَّةُ عَيْنِىْ مُحَمَّدِ ابْنِ عَبْدِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুম্বন করে চোখে লাগাবে এবং বলবে-  لَمْ يَعْمَ وَلَمْ يَرْمَدْ তাহলে কখনও সে অন্ধ হবে না এবং কখনও তার চক্ষু পীড়িত হবে না। মোট কথা হলো ‘মাকাসেদে হাসনা’ গ্রন্থে অনেক ইমাম থেকে এ আমল প্রমাণিত করা হয়েছে। শরহে নেকায়ায় বর্ণিত আছে-
জানা দরকার যে মুস্তাহাব হচ্ছে যিনি দ্বিতীয় শাহাদতের প্রথম শব্দ শোনে বলবেন; صَلَّى اللهُ عَلَيْكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ (সাল্লাল্লাহু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ) এবং দ্বিতীয় শব্দ শোনে বলবেন- قُرَّةُ عَيْنِىْ    بِكَ يَارَسُوْلَ اللهِ  (কুর্রাতু আইনি বেকা ইয়া রাসুলাল্লাহ) এবং নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখ চুক্ষদ্বয়ে রাখবেন, ওকে হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের পিছনে পিছনে বেহেশতে নিয়ে যাবেন। অনুরূপ কনযুল ইবাদেও বর্ণিত আছে। মাওলানা জামাল ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উমর মক্কী (কুঃ) স্বীয় ফাত্ওয়ার কিতাবে উল্লেখ করেছেন-

تَقْبِيْلُ الْاِبهَامَيْنِ وَوَضْعُ هُمَا عَلَى الْعَيْنَيْنِ عِنْدَ ذِكْرِ اسْمِه عَلَيهِ السَّلَامُ فِى الْاَذَانِ جَائِر بَلْ مُسْتَحَب صَرَّحَ بِه مَشَائِخِنَا

আযানে হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর পবিত্র নাম শুনে বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুমু দেয়া এবং চোখে লাগানো জায়েয বরং মুস্তাহাব। আমাদের মাশায়েখে কিরাম এ ব্যাপারে বিশদ বর্ণনা করেছেন।
আল্লামা মুহাম্মদ তাহির (রাঃ) تكملة مجمع بخار الانوار  গ্রন্থে উপরোক্ত হাদীছকে ‘বিশুদ্ধ নয়’ মন্তব্য করে বলেন-

وَرُوِىَ تَجرِبَة ذَالِكَ عَنْ كَثِيْرِيْنَ

“(কিন্তু এ হাদীছ অনুযায়ী আমলের বর্ণনা অনেক পাওয়া যায়।)”
আরও অনেক ইবারত উদ্ধৃত করা যায়। কিন্তু সংক্ষেপ করার উদ্দেশ্যে এটুকুই যথেষ্ট মনে করলাম। হযরত সদরুল আফাযেল আমার মুর্শিদ ও উস্তাদ আলহাজ্ব মাওলানা সৈয়দ নঈম উদ্দীন সাহেব কিবলা মুরাদাবাদী বলেছেন, লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘ইনজিল’ গ্রন্থের একটি অনেক পুরানো কপি পাওয়া গেছে, যেটার নাম ‘ইনজিল বারনাবাস’। ইদানীং এটা ব্যাপকভাবে প্রকাশিত এবং প্রত্যেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এর  অধিকাংশ বিধানাবলীর সাথে ইসলামের বিধানাবলীর মিল রয়েছে। এ গ্রন্থের এক জায়গায় লিখা হয়েছে যে হযরত আদম (আঃ) যখন রূহুল কুদ্দুস (নুরে মুস্তাফা) কে দেখার জন্য আরজু করলেন, তখন সেই নুর তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলের নখে চমকানো হলো। তিনি মহব্বতের জোশে উক্ত নখদ্বয়ে চুমু দিলেন এবং চোখে লাগালেন। (রূহুল কুদ্দুসের অর্থ নুরে মুস্তফা কেন করা হল; এর ব্যাখ্যা আমার কিতাব ‘শানে হাবিবুর রহমানে’দেখুন। ওখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে ঈসা (আঃ) এর যুগে রূহুল কুদ্দুস নামেই হুযুর (সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মশহুর ছিলেন। হানাফী আলিমগণ ছাড়াও শাফেঈ ও মালেকী মাযহাবের আলিমগণও বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুম্বন মুস্তাহাব হওয়া সম্পর্কে একমত। যেমন শাফেঈ মযহাবের প্রসিদ্ধ কিতাব – اعانة الطالبين على حل الفاظ فتح الممعين  এর ২৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখিত আছে-

ثُمَّ يُقَبِّلَ اِبْهَا مَيْهِ وَيَجْعَلُ هُمَا عَلى عَلْنَيْهِ لَمْ يَعْمِ وَلَمْ يَرْمُدْ اَبَدًا

“(অতঃপর নিজের বৃন্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুমু দিয়ে চোখে লাগালে, কখনও অন্ধ হবে না এবং কখনও চক্ষু পীড়া হবে না।)”মালেকী মযহাবের প্রসিদ্ধ কিতাব-

كفاية الطالب الربانى لرسالة ابن ابى زيد القيردانى

এর প্রথম খন্ডের ১৬৯ পৃষ্ঠায় এ প্রসঙ্গে অনেক কিছু বলার পর লিখেছেন-

ثُمَّ يُقَبِّلُ اِبْهَامَيْهِ وَيَجْعَلُ هُمَا عَلى عَيْنَيْهِ لَمْ يَعمِ وَلَمْ يَرْمُدْ اَبَدًا

“(অতঃপর বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুমু দেবে এবং চোখে লাগাবে, তাহলে কখনও অন্ধ হবে না এবং কখনও চক্ষু পীড়া হবে না। এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আল্লামা শেখ আলী সাঈদী عدوى  নামক কিতাবের ১৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন-

গ্রন্থকার বৃদ্ধাঙ্গুলী চুম্বনের সময়ের কথা উল্লেখ করেনি। অবশ্য শেখ আল্লামা মুফাসসির নুরুদ্দীন খুরাসানী থেকে বর্ণিত আছে, তিনি কতেক লোককে আযানের সময় লক্ষ্য করেছেন যে যখন তারা মুয়ায্যিনের মুখে আশহাদু আন্না মুহাম্মদার রাসুলুল্লাহ শুনলেন, তখন নিজেদের বৃদ্ধাঙ্গুলে চুমু দিলেন এবং নখদ্বয়কে চোখের পলকে এবং চোখের কোণায় লাগালেন এবং কান পর্যন্ত বুলিয়ে নিলেন। পত্যেক শাহাদাতের সময় এ রকম একবার একবার করলেন। আমি ওদের একজনকে এ প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বললেন আমি বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুমু দিতাম কিন্তু মাঝখানে ছেড়ে  দিয়েছিলাম। তখন আমার চক্ষু রোগ হয়। এর মধ্যে এক রাতে আমি হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) কে স্বপ্নে দেখলাম। তিনি (দঃ) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন- ‘আযানের সময় বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চোখে লাগানো কেন ছেড়ে দিয়েছ? যদি তুমি চাও, তোমার চোখ পুনরায় ভাল হোক, তাহলে তুমি পুনরায় বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চোখে লাগানো আরম্ভ কর’। ঘুম ভাঙ্গার পর আমি পুনরায় এ আমল শুরু করে দিলাম এবং আরোগ্য লাভ করলাম। আজ পর্যন্ত সেই রোগে আর আক্রান্ত হইনি। উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতিভাত হলো যে, আযান ইত্যাদিতে বৃদ্ধাঙ্গুলী চুম্বন ও চোখে লাগানো মুস্তাহাব, হযরত আদম (আঃ) সিদ্দিকে আকবর (রাঃ) ও ইমাম হাসন (রাঃ) এর সুন্নাত। ফকীহ, মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণ এটা মুস্তাহাব হওয়া সস্পর্কে একমত। শাফীঈ ও মালেকী মযহাবের ইমামগণ এটা মুস্তাহাব হওয়া সস্পর্কে রায় দিয়েছেন। প্রত্যেক যুগে এবং প্রত্যেক মুসলমান একে মুস্তাহাব মনে করেছেন এবং করছেন। এ আমল নিম্নবর্ণিত ফায়দা গুলো রয়েছেঃ
আমলকারীর চোখ রোগ থেকে মুক্ত থাকবে এবং ইনশাআল্লাহ কখনও অন্ধ হবে না, যে কোন চক্ষু রোগীর জন্য বৃদ্ধাঙ্গুলী চুম্বনের আমলটি হচ্ছে উৎকৃষ্ট চিকিৎসা। এটা অনেকবার পরীক্ষিত হয়েছে। এর আমলকারী হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর শাফায়াত লাভ করবে এবং ওকে  কিয়ামতের কাতার থেকে খুঁজে বের করে তাঁর (দঃ) পিছনে বেহেশ্তে প্রবেশ করাবেন।
একে হারাম বলা মূর্খতার পরিচায়ক। যতক্ষণ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার সুস্পষ্ট  দলীল পাওয়া যাবে না, ততক্ষণ একে নিষেধ করা যাবে না। মুস্তাহাব  প্রমাণের জন্য মুসলমানগণ মুস্তাহাব মনে করাটা যথেষ্ট। কিন্তু হারাম বা মকরূহ প্রমাণের জন্য নির্দিষ্ট দলীলের প্রয়োজন যেমন আমি বিদ্আতের আলোচনা উল্লেখ করেছি।
বিঃ দ্রঃ- আযান সস্পর্কেতো সুস্পষ্ট এবং বিস্তারিত রিওয়ায়েত ও হাদীছ সমূহ মওজুদ আছে, যা ইতিপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। তকবীর ও আযানের মত। হাদীছসমূহে তকবীরকে আযান বলা হয়েছে-দু’ আযানের মাঝখানে নামায আছে অর্থাৎ আযান ও তকবীরের মধ্যবর্তী। সুতরাং তকবীরে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মদার রাসুলুল্লাহ’ বলার সময়ও বৃদ্ধাঙ্গুলী চুম্বন করা ফলপ্রসূ ও বরকতময়। আযান ও তকবীর ব্যতীতও যদি কেউ হুযূর  (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর পবিত্র নাম শুনে বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুমু দেয়, তাতে কোন ক্ষতি নেই বরং সদুদ্দেশ্যে হলে তাতে ছওয়াব রয়েছে।  বিনা দলীলে কোন কিছু নিষেধ করা যায় না। যেভাবেই হুযূর সাল্লাল্লাহু আল্লাইহে ওয়া সাল্লামের তাযীম করা হবে, ছওয়াব রয়েছে। -সুত্রঃ জা’আল হক ২য় খন্ড-

মীলাদ শরীফে কিয়ামের প্রমাণ ১

কিয়াম অর্থাৎ দন্ডায়মান হওয়া ছয় প্রকার- জায়েয, ফরয, সুন্নাত, মুস্তাহাব, মাকরূহ ও হারাম। প্রত্যেক প্রকারের কিয়ামকে সনাক্ত করার নিয়ম আমি বাতলে দিচ্ছি, যার ফলে সহজেই বোঝা যাবে এ কিয়াম কি ধরণের।

(১) পার্থিব প্রয়োজনে দাঁড়ানো জায়েয। এর হাজার হাজার উদাহরণ রয়েছে। যেমন :- দাঁড়িয়ে দালান তৈরী করা এবং   অন্যান্য দুনিয়াবী কাজকর্ম ইত্যাদি করা। কুরআন মাজীদে উল্লেখিত আছে-

فَاِذَا قَصِيتِ الصَّلوةُ فَانْتَشِرُوْا فِى الْاَرْضِ

(যখন জুমআর নামায হয়ে যাবে, তখন তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়) না দাঁড়িয়ে ছড়িয়ে পড়া কখনও সম্ভব নয়। 
(২) পাঁচ ওয়াক্তিয়া ও ওয়াজিব নামাযে দাঁড়ানো ফরয। যেমন-  وَقُوْموْا لِلهِ قنِتِيْنَ আল্লাহর সামনে আনুগত্য প্রকাশ করত: দন্ডয়মান হও। অর্থাৎ যদি কোন লোক সামর্থ থাকা সত্তেও বসে আদায় করে, তাহলে নামায হবে না।
(৩) নফল নামাযে দন্ডায়মান হওয়া মুস্তাহাব। অবশ্য বসেও জায়েয। তবে দাঁড়িয়ে পড়াতে ছওয়াব বেশী।
(৪) কয়েকটি বিশেষ সময় দাঁড়ানো সুন্নাত

প্রথমতঃ ধর্মীয় মর্যাদাশীল জিনিসের সম্মানার্থে দাঁড়ানো। এ জন্য যমযমের পানি ও ওযুর অবশিষ্ট পানি  দাঁড়িয়ে পান করা সুন্নাত। হুযুর আলাইহিস সালামের রওযা পাকে উপস্থিত হওয়া যদি আল্লাহ নসীব করেন, তখন নামাযের মত হাত বেঁধে দাড়ানো সুন্নাত। ফাতওয়ায়ে আলমগীরীর প্রথম খন্ডে কিতাবুল হজ্জের শেষে-  زيارت قبر النبى عليه السلام শীর্ষক অধ্যায়ে উল্লেখ আছে-

وَيَقِفُ كَمَا يَقِفُ فِى الصَّلوةِ وَيُمَثِّلُ صُوْرَتَهُ الْكَرِيْمَةَ كَاَنَّهُ نَائِم فِىْ لَحْدِه عَالِم بِه يَسْمَعُ كَلَامَهُ

পবিত্র রওযা শরীফের সামনে এমনভাবে দাড়াবে যেভাবে নামাযে দাঁড়ানো হয় এবং সেই পবিত্র চিত্র মনের মধ্যে এমনভাবে স্থাপন করবে, যাতে মনে হয় হুযুর আলাইহিস সালাম রওযা পাকে আরাম ফরমাচ্ছেন, তাকে চিনছেন ও তার কথা শুনতেছেন।
অনুরূপ মুমিনের কবরে ফাতিহা পাঠ করার সময় কেবলার দিকে পিঠ এবং কবরের দিকে মুখ করে দাঁড়ানো সুন্নাত। আলমগীরী কিতাবুল কারাহিয়ার  زيارت القبور  অধ্যায়ে আছে-

يَخْلَعُ نَعْلَيْهِ ثُمَّ يَقِفُ مُسْتدبِرَ القِدْلَة مَستَقبِلًا لِوَجْه الْمَيَّتِ

প্রথমে জুতা খুলে ফেলুন। অত:পর কাবার দিকে পিঠ করে এবং কবরবাসির দিকে মুখ করে দাঁড়ান। রওযা পাক, যমযম ও ওযুর পানি, মুমিনের কবর সবই পবিত্র জিনিস। কিয়ামের দ্বারা এগুলোর তাযীম করানো হয়েছে।
দ্বিতীয়তঃ যখন কোন ধর্মীয় নেতা আসেন, তাঁর সম্মানে দাঁড়িয়ে যাওয়া সুন্নাত। অনরূপ কোন  ধর্মীয় নেতা সামনে দাঁড়ালে তার জন্য দাড়িয়ে থাকা সুন্নাত। কিন্তু বসে থাকা বেআদবী। মিশকাত শরীফের প্রথম খন্ডে কিতাবুল জিহাদে –  القيام ও حكم الاسر اء শীর্ষক অধ্যায়ে উল্লেখিত আছে যে- যখন হযরত সাআদ ইবনে মুআয (রা:) মসজিদে নববীতে উপস্থিত হন, তখন হুযুর আলাইহিস সালাম আনসারদেরকে হুকুম দিলেন- قُوْمُوْا اِلى سَيِّدِكم আপনাদের নেতার জন্য দাঁড়িয়ে যান। এ দাড়ানো ছিল সম্মানবোধক। তাদেরকে বাধ্য করে দাঁড় করানো হয়নি। অধিকন্তু ঘোড়া থেকে নামানোর জন্য ২/১ জন্যই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু সবাইকে কেন বললেন যে দাঁড়িয়ে যাও। আর ঘোড়া থেকে নামানোর জন্য মজলিসে আগতদের মধ্যে থেকে কাউকে ডাকা যেত। কিন্তু নির্দিষ্ট করে আনসারদেরকে কেন হুকুম করলেন? স্বীকার করতেই হবে যে, এ কিয়ামটা ছিল সম্মান বোধক। হযরত সাআদ আনসারদের নেতা ছিলেন। তাই তাদের দ্বারা তাযীম করানো হয়েছে। যাঁরা উপরোক্ত বাক্য ব্যবহৃত  الىশব্দ দ্বারা ধোঁকা দিয়ে বলেন যে এ দাঁড়ানোটা ছিল রোগীর সাহায্যার্থে, তারা তাহলে এ আয়াতে কি বলনে- اِذَاقُمْتُمْ اِلى الصَّلوةِ (যখন আপনারা নামাযের জন্য দাঁড়াবেন।)
নামাযও কি তাহলে রোগী যে এর সাহায্যার্থে দাঁড়াতে হয়?
আশআতুল লুমআত গ্রন্থে উপরোক্ত হাদীছ প্রসংগে বর্ণিত আছে-
এখানে হযরত সাআদের প্রতি তাযীম করানোর রহস্য হচ্ছে যে তাঁকে বনি কুরায়জার উপর শাসন করার জন্য ডাকা হয়েছিল। তাই এ জায়গায় তার শান-মান প্রকাশের সঠিক সময় ও প্রয়োজন ছিল। মিশকাত শরীফের القيام  অধ্যায়ে হযরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত আছে-

فَاِذَاقامَ قُمنَا قِيَامًا حَتّى نَرَاه قدْ دَخَلَ بَعْضَ بُيُوْتِ اَزْوَاجِه

যখন হুযুর আলাইহিস সালাম বৈঠক থেকে উঠতেন, তখন আমরা দাড়িয়ে যেতাম এবং এতটুকু পর্যন্ত দেখতাম যে তিনি তাঁর কোন পবিত্র বিবির ঘরে প্রবেশ করছেন। আশআতুল লুমআত কিতাবুল আদাবের কিয়াম শীর্ষক অধ্যায়ে- قوْمُوْا اِلى سَيِّدِ كُمْ এর ব্যাখ্যা প্রসংগে উল্লেখিত আছে-
 হাদীছের পরিপ্রেক্ষিতে অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম পুণ্যাত্মা উলামায়ে কিরামের তাযীম করার ব্যাপারে ঐক্যমত পোষন করেন। ইমাম নববী বলেন যে বুযুর্গানে কিরামের তাশরীফ আনয়নের সময় দাঁড়ানো মুস্তাহাব। এর সমর্থনে অনেক হাদীছ রয়েছে কিন্তু এর নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে সুষ্পষ্ট কোন হাদীছ নেই। ‘কীনা’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত হয়েছে যে আগমনকারী কারো সম্মানার্থে বসে থাকা লোকের দাঁড়িয়ে যাওয়া মাকরূহ নয়। ফতওয়ায়ে আলমগীরী কিতাবুল কারাহিয়ার ملاقات الملوك  শীর্ষক অধ্যায়ে বর্ণিত আছে-

تُجُوْزُ الْخِدْمَةُ بِغَيْرِ اللهِ تَعَالى بِالْقِيَامِ وَاَخَذِ الْيَدَيْنِ وَالْاِنْحِنَاءِ

খোদা ভিন্ন অন্য কাউকে দাড়িয়ে, করমর্দন করে বা নত হয়ে সম্মান করা জায়েয
এখানে নত হওয়া বলতে রুকু থেকে কম নত হওয়াকে বুঝানো হয়েছে। কেননা রুকু পর্যন্ত নত হওয়াতো নাজায়েয। এ প্রসংগে আমি ভূমিকায় আলোকপাত করেছি। দুররূল মুখতার গ্রন্থের প্রঞ্চম খন্ড কিতাবুল কারাহিয়ার   الاستبراء  অধ্যায়ের শেষে বর্ণিত আছ-

يَجُوْزَ بَلْ يُنْدَبُ الْقِيَامُ تَعْظِيْمًالِلْقَادِمِ يَجُوْزُ الْقِيَامُ وَلَوْلِلْقَارِىْ بَيْنَ يَدَىِ الْعَالِمِ

আগমনকারী কারো সম্মানার্থে দাড়াঁনো জায়েয বরং মুস্তাহাব যেমন আলিমের সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়া কুরআন তিলওয়াতকারীর জন্য জায়েয। 
এ থেকে বোঝা গেল যে, কারো কুরআন তিলাওয়াতরত অবস্থায় কোন ধর্মীয় আলিম আসলে তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যাওয়া মুস্তাহাব। এ প্রসংগে ফতওয়ায়ে শামীতে বলা হয়েছে- 

وَقِيَامُ قَارِىُ الْقُرْانِ لِمَنْ يَجْى تَعْظِيْمًا لَا يَكْرَهُ اِذْ كَانَ مِمَّنْ يَسْتَحِقَّ التعْظِيْمَ

কুরআন তিলাওয়াত অবস্থায় আগমকারী কারো সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যাওয়া মকরূহ নয়, যদি তিনি সম্মান পাওয়ার উপযোগী হন।
ফতওয়ায়ে শামী প্রথম খন্ড  ا لامامت  শীর্ষক অধ্যায়ে বর্ণিত আছে যে, যদি কেউ মসজিদের প্রথম কাতারে জামাতের অপেক্ষায় বসে আছেন। ইত্যবসরে কোন আলিম আসলে তাকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে নিজে পিছনে চলে যাওয়া মুস্তাহাব। বরং এর জন্য প্রথম কাতারে নামায পড়া থেকে এটা আফযল। এটাতো উলামায়ে উম্মতের তাযীমের জন্য, কিন্তু হযরত সিদ্দীক আকবর (রা:) তো নামায পড়ানো অবস্থায় হুযুর আলাইহিস সালামকে তাশরীফ আনতে দেখে নিজে মুক্তাদী হয়ে গেলেন এবং নামাযের মাঝামাঝি হুযুর আলাইহিস সালাম ইমাম হলেন। (মিশকাত শরীফের  مرض النبىঅধ্যায় দ্রষ্টব্য) উপরোক্ত বিবরণ থেকে বোঝা যায় যে ইবাদতরত অবস্থায়ও বুযুর্গানে দ্বীনের তাযীম করা যায়েয, মুসলিম শরীফের দ্বিতীয় খন্ডে  حديث توبه ابن مالك অধ্যায়ে উল্লেখিত আছে-

فَقَامَ طَلْحَةُ اِبْنِ عُبَيْدِاللهِ بُهَرْولُ حَتّى صَافَحَنِىْ وَهَنَّانِىْ

অতঃপর তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ দাঁড়িয়ে গেলেন এবং দৌড়ে এসে আমার সাথে মুসাফাহা করলেন এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন।
এর প্রেক্ষাপটে নববীতে উল্লেখিত আছে-

فِيْهِ اِسْتِحْبَابُ مَصَافَحَةِ الْقَادِمِ وَالْقِيْامِ لَهُ اِكْرَامًا وَالْهَرْوَ لَةِ اِلَى لِقَاءِ

এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে আগমনকারীর সাথে সুসাফাহা করা, এর সম্মানে দাঁড়িয়ে যাওয়া এবং দৌড়ে এর কাছে আসা মুস্তাহাব।
তৃতীয়তঃ যখন নিজের কোন প্রিয়জন আসে, তখন এর আগমনের আনন্দে দাঁড়িয়ে যাওয়া, হাত পা ইত্যাদি চুমু দেয়া সুন্নাত। মিশকাত শরীফের কিতাবুল আদব المصافحة  শীর্ষক অধ্যায়ে বর্ণিত আছে যে হযরত যায়েদ ইবনে হারেছা (রা:) মুস্তাফা আলাইহিস সালামের পবিত্র দরজার সামনে আসলেন এবং দরজার কড়া নাড়লেন।

فَقَامَ اِلَيْهِ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَرْيَانًا فَاَعْتَنَقَهُ وَقَبَّلهُ

হুযুর আলাইহিস সালাম চাদর বিহীন অবস্থায় তাঁর প্রতি দাঁড়িয়ে গেলেন। অত:পর কোলাকুলি করলেন এবং চুমু খেলেন।
একই অধ্যায়ে আরও বর্ণিত আছে যে যখনই হযরত খাতুনে জান্নাত ফাতিমা যুহরা (রা:) হুযুর আলাইহিস সালামের সমীপে হাযির হতেন-

قَام اِلَيْهَا فَاَخَذَ بِيَدِهَا فَقَبَّلَها وَاَجْلَسَهَا فِىْ مَجْلِسِه

তখন তাঁর জন্য দাঁড়িয়ে যেতেন, হাত ধরে হাত চুমু খেতেন এবং নিজের জায়গায় তাঁকে বসাতেন। অনুরূপ হুযুর আলাইহিস সালাম যখন হযরত ফাতিমা যুহরা (রা:) এর কাছে তশরীফ নিয়ে যেতেন, তখন তিনি (ফাতিমা) ও দাঁড়িয়ে যেতেন, দস্ত মুবারকে চুমু খেতেন এবং স্বীয় জায়গায় হুযুর আলাইহিস সালামকে বসাতেন। মিরকাতالمشئ بالجنازة   অধায়ের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে আছে-

وَفِيْهِ اِيْمَاءٌ اِلَى نُدُبِ الْقِيَامِ لِتَعْظِيْمِ الْفُضَلَاءِ وَالْكُبَرَاءِ

জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের সম্মানে দাঁড়ানো জায়েয।
চতুর্থত: যখন কোন প্রিয়জনের কথা শুনে বা অন্য কোন শুভ সংবাদ পায়, তখন সে সময় দাঁড়িয়ে যাওয়া মুস্তাহাব এবং সাহাবা ও পূর্ববর্তীগণের সুন্নাত। মিশকাত শরীফের কিতাবুল ঈমানের তৃতীয় পরিচ্ছেদে হযরত উছমান (রা:) থেকে বর্ণিত আছে, আমাকে হযরত সিদ্দিক আকবর (রা:) যখন একটি শুভ সংবাদ শোনলেন-

فَقمْتُ اِلَيْهِ وَقُلْتُ بِاَبِىْ اَنْتَ وَاُمِّىْ اَنْتَ اَحَق بِهَا

তখন আমি দাঁড়িয়ে গেলাম এবং বললাম আপনার প্রতি আমার মা-বাপ কুরবান, আপনিই এর উপযোগী।
তাফসীরে রুহুল বয়ানে ২২ পারায় সূরা ফাতহের আয়াত  محمد رسول الله এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে উল্লেখিত আছে যে, ইমাম তকিউদ্দিন সুবকী (র:) এর দরবারে উলামায়ে কিরামের একটি দল উপস্থিত ছিলেন। একজন না’ত আবৃত্তিকারী দুটি না’ত পাঠ করলেন-

فَعِنْدَ ذَالِكَ قَامَ الْاِمَامُ السُّبْكِىُّ وَجَمِيْعُ مَنْ فِىْ الْمَجْلِسِ فَحصَلَ اَنْس عَظِيْمٌ بِذَالِكَ الْمَجْلِسِ

তখন সাথে সাথে ঈমাম সুবকী ও মজলিসে আগত সবাই দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তাতে বেশ আনন্দ পাওয়া গেল।
পঞ্চমত: কোন কাফির যিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের নেতা, যদি ইসলাম ধর্ম গ্রহণের প্রতি আগ্রান্বিত হন, তাহলে তাঁর আগমনে তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়ানো সুন্নাত । যেমন হযরত উমর (রা:) যখন ইসলাম গ্রহন করার জন্য হুযুরের খিদমতে হাযির হলেন, তখন হুযুর আলাইহিস সালাম তাঁকে নিজের পবিত্র বুকের সাথে লাগালেন (ইতিহাস গ্রন্থ দ্রষ্টব্য) ।
ফতওয়ায়ে আলমগীরীর কিতাবুল কারাহিয়া শীর্ষক اهل الذمة  অধ্যায়ে উল্লেখিত আছে-

اِذَدَخَلَ ذِمِّى عَلى مُسْلِمِ فَقَامَ لَه طمعًا فِىْ اِسْلَامِه فَلَا بَأَسَ

কোন যিম্মি কাফির মুসলমানের কাছে আসলো, মুসলমান তার ইসলাম গ্রহণের আশায় তার সম্মানে দাঁড়িয়ে গেলেন, এটা জায়েয।
(৫) কয়েক জায়গায় দাঁড়ানো মাকরূহ :-
প্রথমত: যমযম ও ওযুর পানি ব্যাতীত অন্যান্য পানি পান করার সময় বিনা কারণে দাঁড়ানো মাকরূহ,
দ্বিতীয়ত : পার্থিব লালসায় বিনা কারণে দুনিয়াবী লোকের সম্মানে দাঁড়ানো মাকরূহ।
তৃতীয়ত: ধন-দৌলতের কারণে কাফিরের সম্মানার্থে দাঁড়ানো মাকরূহ।
ফতওয়ায়ে আলমগীরীর কিতাবুল কারাহিয়া শীর্ষক اهل الذمة   অধ্যায়ে বর্ণিত আছে-

وَاِنْ قَامَ لَهُ مِنْ غَيْرِ اَنْ يَّنْوِىَ شَيْئًا مِمَّا ذَكَرْنا اوْ قَامَ طَمْعًا لِغِنَاهُ كُرِهَ لَهَ ذَالِكَ

যদি কারো জন্য উল্লেখিত অবস্থাদি ব্যতিত দাঁড়ানো হয় বা সম্পদের লালসায় দাঁড়ানো হয়, তাহলে তা মাকরূহ হবে।
চতুর্থত: যে ব্যক্তি নিজের তাযীমের জন্য লালায়িত, তার সম্মানার্থে দাঁড়ানো নিষেধ।
পঞ্চমত: যদি কোন বড় লোক মাঝখানে বসা অবস্থায় আছে এবং তার চারদিকে বিনীতভাবে মানুষ দাঁড়িয়ে রইল। এ ধরনের দাঁড়ানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিজের জন্য কারো দাঁড়িয়ে থাকা পছন্দ করাটাও নিষেধ। দ্বিতীয় অধ্যায়ে এর প্রমাণ দেয়া হবে ইনশাআল্লাহ । এ প্রকারভেদটা যেন স্মরণ থাকে।

উপরোক্ত বিশ্লেষন থেকে এটা নি:সন্দেহে জানা গেল যে মীলাদ শরীফে পবিত্র বেলাদতের আলোচনা করার সময় কিয়াম করাটা সাহাবায়ে কিরাম ও পূর্ববর্তী নেককার বান্দাদের থেকে প্রমাণিত রয়েছে। আমি সুন্নাত কিয়ামের বর্ণনায় চতুর্থ পর্যায়ে সে ধরণের কিয়ামের কথা উল্লেখ করেছি, যা কোন খুশির সংবাদ পেয়ে বা কোন প্রিয়জনের আলোচনার সময় করা হয় এবং প্রথম পর্যায়ে ওই ধরনের কিয়ামের কথা উল্লেখ করেছি, যা ধর্মীয় মর্যাদাশীল কোন জিনিসের সম্মানে করা হয়। সুতরাং, মীলাদ শরীফে কিয়াম কয়েক কারণে সুন্নাত। প্রথমত: এটা পবিত্র বেলাদাতের আলোচনার সম্মানে করা হয়। দ্বিতীয়তঃ এ জন্য যে, মুসলমানদের জন্য যিকরে বিলাদতের চেয়ে বড় খুশির বিষয় আর কি হতে পারে আর খুশির সংবাদে দাঁড়ানো সুন্নাত। তৃতীয়ত: মুসলমানের কাছে নবী করীম (দ:) থেকে বেশী প্রিয় আর কে আছে? মা-বাপ,ধন-সম্পদ ইত্যাদি সব কিছু থেকে বেশি প্রিয়ভাজন হচ্ছেন হুযুর আলাইহিস সালাম । তাঁর যিকরের সময় দাঁড়ানো পূর্বসূরী নেকবান্দাদের সুন্নাত।
চতুর্থত: পবিত্র বেলাদতের সময় ফিরিশতাগণ দুয়ারে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এজন্য পবিত্র বেলাদতের আলোচনার সময় দাঁড়ানো ফিরিশতাদের কাজের সাথে মিল রয়েছে।
পঞ্চমত: আমি মীলাদ শরীফের আলোচনায় হাদীছ দ্বারা প্রমান করেছি যে, হুযুর আলাইহিস সালাম স্বীয় গুনাবলী ও বংশ পরিচয় মিম্বরে দাঁড়িয়ে বর্ণনা করেছেন। এতে কিয়ামের মুল বৈশিষ্ট পাওয়া যায়।
যষ্ঠত: শরীয়ত একে নিষেধ করেনি এবং প্রত্যেক দেশে সাধারণ মুসলমানগণ একে ছওয়াবের কাজ মনে করে পালন করে। যে কাজটা মুসলমানগণ ভাল মনে করে, সে কাজ আল্লাহর কাছেও ভাল বলে গণ্য। আমি এর বিশ্লেষণ মীলাদ ও বিদআতের আলোচনায় করেছি। অধিকন্তু প্রথমেই আরয করেছি যে মুসলমান যে কাজটাকে মুস্তাহাব হিসেবে জানে, শরীয়তেও তা মুস্তাহাব হিসেবে গণ্য। ফতওয়ায়ে শামীর তৃতীয় খন্ড কিতাবুল ওয়াকফের  وقف منقولات শীর্ষক আলোচনায় বর্ণিত আছে- 

لِاَنَّ التُّعَامَلَ يُتْرَكُ بِه الْقِيَاسُ لِحَدِيْثِ مَارَأَه الْمُؤْمِنُوْنَ حَسَنًا فَهُوَ عِنْدَ اللهِ حَسَن

ডেকসি, জানাযার খাটিয়া ইত্যাদির ওয়াকফ ধারণামত নাজায়েয হওয়ার কথা। কিন্তু যেহেতু সাধারণ মুসলমানগণ এর অনুসারী, সেহেতু কিয়াসকে বাদ দেয়া হয়েছে এবং ওটাকে জায়েয বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। দেখুন, সাধারণ মুসলমানগণ যে কাজটা ভাল মনে করে এবং এর হারাম হওয়া সম্পর্কে সুস্পষ্ট দলীল না থাকে, তখন কিয়াসকে বাদ দেয়া প্রয়োজন।
দুররূল মুখতারের পঞ্চম খন্ড কিতাবুল ইজারাতের  اجارة الفاسده অধ্যায়ে উল্লেখিত আছে-
স্নানাগার ভাড়া দেয়া জায়েয, কেননা হুযুর আলাইহিস সালাম হাজফা শহরের স্নানাগারে তশরীফ নিয়ে গিয়েছিলেন এবং এজন্য এটা প্রচলন হয়ে গেছে। হুযুর আলাইহিস সালাম ফরমান, যেটা মুসলমানগণ ভাল মনে করেন, সেটা আল্লাহর কাছেও ভাল।
এর প্রেক্ষাপটে ফতওয়ায়ে শামীতে উল্লেখিত আছে যে হুযুর আলাইহিস সালামের হাজফা শহরের স্নানাগারে প্রবেশ করার বর্ণনাটি খুবই দুর্বল। কেউ কেউ একে মওজু বা বানাওট হাদীছ বলেছেন। সুতরাং, স্নানাগার জায়েয হওয়ার একটি মাত্র দলীল অবশিষ্ট রইল অর্থাৎ সাধারণভাবে প্রচলনটাতো প্রমাণিত হলো। মুসলমানগণ যে কাজটা সাধারণভাবে বৈধ মনে করে, তা জায়েয। একই জায়গায় শামীতে আরও উল্লেখ আছে-

لِاَنَّ النَّاسَ فِىْ سَائِرِ الْاَمْصَارِ يَدْفَعُوْنَ اُجْرَةَ الْحَمَّامِ فَدَلَّ اِجْمَاعُهُمْ عَلى جَوازِ ذَالِكَ وَاِنْ كَانَ الْقِيَاسُ يَابَاهُ

কেননা সব শহরগুলোতে মুসলমানগণ স্নানাগারের ফি দিয়ে থাকেন। সুতরাং তাদের ঐক্যমতের কারণে জায়েয হওয়াটা বোঝা গেল, যদিওবা এটা কিয়াসের বিপরীত। কিয়াস অনুসারে স্নানাগারের ফি নাজায়েয হওয়াটাই বাঞ্চনীয়। কেননা কতটুকু পানি ব্যবহার হবে তা জানা যায় না। অথচ ভাড়ার ব্যাপারে লাভ ক্ষতি সম্পর্কে জানাটা প্রয়োজন। কিন্তু যেহেতু মুসলমানগণ সাধারণভাবে একে জায়েয মনে করে, সেহেতু এটা জায়েয। মীলাদ শরীফে কিয়াম করাটা সর্বসাধারণ মুসলমানগণ মুস্তাহাব মনে করেন। সুতরাং এটা মুস্তাহাব।

সপ্তমত: এ জন্য যে, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ ফরমান – وَتُعَزِّرُوْاهُ وَتَوقِّرُوْاهُ “(হে মুসলমানগণ আমার নবীকে সাহায্য কর ও তাঁকে সম্মান কর)”
তাযীমের বেলায় কোন বাঁধা ধরা নিয়ম নেই, বরং যে যুগে বা যে জায়গায় তাযীমের যে রীতি প্রচলিত, সেভাবে তাযীম করুন, যদি শরীয়ত একে হারাম না করে থাকে। যেমন তাযীমী সিজদা ও রুকু করা হারাম । আমাদের যুগে রাজকীয় হুকুমাদিও দাঁড়িয়ে পাঠ করা হয়। সুতরাং হুযুর আলাইহিস সালামের যিকরও দাঁড়িয়ে করা চাই। দেখুন- كُلُوْا وَاشْرَبُوْا (খান ও পান করুন) বাক্যে শর্তহীনভাবে খানা পিনার অনুমতি রয়েছে অর্থাৎ প্রত্যেক হালাল আহার্য গ্রহন করুন। তাই বিরানী, জরদা, কোরমা ইত্যাদি সবই কুরূনে ছালাছায় থাকুক বা না থাকুক হালাল। এ রকম توقرواه   শব্দেও শর্তহীন নির্দেশ রয়েছে যে প্রত্যেক প্রকারের বৈধ তাযীম করুন কুরূনে ছালাছা থেকে এটা প্রমাণিত হোক বা না হোক।
অষ্টমত: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ ফরমান-

وَمَنْ يُعَظِّمُ شَعَائِرَ اللهِ فَاِنهَا مِنْ تَقْوَى الْقُلُوْبِ

“যে ব্যক্তি আল্লাহর নিশানা সমূহের সম্মান করে, তা হবে আত্মার সংযমশীলতার বহি:প্রকাশ”
তাফসীরে রূহুল বয়ানে আয়াত- 

وَتَعَاوَنُوْا عَلَى البِّرِّ وَالتَّقْوى وَلَا تَعَاوَنُوْا عَلَى الْاِثْمِ وَالْعُدْوَانِ

এর ব্যাখ্যায় লিখা হয়েছে যে, যে জিনিসটা ধর্মীয় মর্যাদা লাভ করেছে, তা আল্লাহর নিশানা সমূহের অন্তর্ভূক্ত, সে সবের সম্মান করা প্রয়োজন। যেমন, বিশেষ মাস, কোন বিশেষ দিন বা স্থান সমূহ, কোন বিশেষ নিদৃষ্ট সময় ইত্যাদি। এ জন্যই সাফা-মারওয়া, কাবা মুয়াজ্জমা, মাহে রমজান, শবে কদরের তাযীম করা হয়। যিকরে বিলাদতও আল্লাহর নিশানাসমূহের অন্তর্ভুক্ত। অতএব এর তাযীমও করনীয়, যা কিয়ামের মাধ্যমে আদায় হয়।
আমি আটটি দলিলের সাহায্যে কিয়াম মুস্তাহাব হওয়াটা প্রমাণ করলাম। কিন্তু বিরোধিতাকারীদের কাছে খোদার রহমতে হারাম প্রমাণ করার একটি ধলীলও নেই। কেবল স্বীয় মনগড়া অভিমত দ্বারাই হারাম বলেন। -সুত্রঃ জা’আল হক ২য় খন্ড-

বিদআত ২ (প্রকারভেদ)

ইতিপূর্বে জানা গেছে যে, বিদআত দু’রকম- বিদআতে হাসানা ও বিদআতে সাইয়া। এখন স্মরণ রাখতে হবে যে, বিদআতে হাসানা তিন প্রকার- জায়েয, মুস্তাহাব ও ওয়াজিব এবং বিদআতে সাইয়া দু’রকম- মাকরূহ  হারাম। এ প্রকারভেদের প্রমাণ দেখুন । মিরকাত গ্রন্থ الاعتصام بالكتات والسنة  অধ্যায়ে আছে।

বিদআত হয়তো ওয়াজিব, যেমন:- আরবী ব্যাকরণ শিখা এবং ফিকহ শাস্ত্রের মূলনীতিসমূহকে একত্রিত করা; অথবা হারাম, যেমন জবরীয়া  সম্প্রদায় বা মুস্তাহাব, যেমন:- মুসাফিরখানা ও মাদরাসা সমূহ তৈরী করা এবং প্রত্যেক ভাল কাজ, যা আগের যুগে ছিল না, যেমন:- জামাআত সহকারে তারাবীর নামায পড়া অথবা মাকরূহ, যেমন :- মসজিদসমূহে গৌরব বোধক কারুকার্জ করা, অথবা জায়েয, যেমন:- ফজরের নামাযের পর মুসাফাহা করা ও ভাল খানাপিনার ব্যাপারে উদারতা দেখানো।
ফতওয়ায়ে শামীর প্রথম খন্ড কিতাবুস সালাতের    الامامت অধ্যায়ে উল্লেখিত আছে।
হারাম বিদআতীর পিছনে নামায পড়া মাকরূহ। অন্যথায় কোন কোন বিদআত ওয়াজিবে পরিণত হয়, যেমন:- প্রমানাদি উত্থাপন, ইলমে নাহু (আরবী ব্যাকরণ) শিখা, কোন কোন সময় মুস্তাহাব, যথা :- মুসাফিরখানা, মাদরাসা এবং সে সব ভাল কাজ, যা আগের যুগে ছিল না, প্রচলন করা, আবার কোন সময় মাকরূহ, যেমন:- মসজিদ সমূহে গৌরববোধক কারুকার্য করা এবং কোন সময় মুবাহ, যেমন:- ভাল খানা-পিনা ও পোশাক পরিচ্ছদের ব্যাপারে উদারতা প্রদর্শন করা। ‘জামেসগীর’ গ্রন্থের ব্যাখ্যায়ও অনুরূপ উল্লেখিত আছে”।
উপরোক্ত ভাষ্য থেকে সুস্পষ্টভাবে পাঁচ প্রকার বিদআতের পরিচয় পাওয়া গেল। সুতরাং, বোঝা গেল যে, প্রত্যেক বিদআত হারাম নয় বরং কতেক বিদআত অত্যাবশ্যকও হয়ে থাকে, যেমন:- ফিকহ, উসূলে ফিকহ, কুরআন কারীমকে একত্রিত করা বা কুরআনে এরাব (যবর, যের, পেশ ইত্যাদি) দেয়া, আধুনিক পদ্ধতিতে কুরআন ছাপানো এবং মাদরাসায় শিক্ষা দেয়ার জন্য পাঠ্যপুস্তক ইত্যাদি প্রণয়ন। -সুত্রঃ জা’আল হক ২য় খন্ড-