সফরে কাসর ওয়াজিব

শরীআতের মাসআলা হলো, মুসাফিরের উপর চার রাকআত বিশিষ্ট ফরয নামাযে, কাসর ফরয। মুসাফির উক্ত নামায সম্পূর্ণ পড়তে পারবে না। যদি ভুলে দু,রাকআতের পরিবর্তে চার রাকআত পড়ে নেয় তার হুকুম হবে ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে ফজরের ফরয চার রাকআত পড়েছে। অর্থাৎ যদি সে প্রথম তাশাহহুদ পাঠ করে তৃতীয় রাকাআতে দাড়িয়ে যায়, তা হলে সে সাহু সিজদা দিবে। নচেৎ নামায পুনরায় আদায় করবে। কিন্তু যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে দু,রাকাআতের স্থলে চার রাকআত পড়ে তাহলে নামায আদায় হবে না।

আর লা-মাযহাবী ওহাবীদের কথা হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে মুসাফিরের স্বাধীনতা রয়েছে সে চাইলে, কাসর’ পড়বে অথবা সম্পূর্ণ পড়বে। মুসাফির কোনটার জন্য বাধ্য নয়।
সফরে কাসর আবশ্যক
সফরে কাসর আবশ্যক হওয়ার পক্ষে হানাফীদের নিকট অনেকগুলো দলীল রয়েছে। কিছু দলীল এখানে উপস্থাপন করা হচ্ছে-
হাদীস নং ১-৪: বুখারী, মুসলিম, মুআত্তা ইমাম মুহাম্মদ ও মুআত্তা ইমাম মালিকে হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রাদ্বি:) থেকে কিছুটা শাব্দিক ভিন্নতার সাথে বর্ণিত (নিম্নোক্ত শব্দাবলী বুখারী ও মুসলিমের )-

قَالَتْ فُرِضَتِ الصَّلَوَةُ رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ هَاجَرَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَفُرِضَتْ اَرْبَعًا وَتُرِكَتْ صَلوَةُ السَّفَرِ عَلَى الْفَرِيْضَةِ الْاُوْلَى

হযরত আয়িশা (রাদ্বি:) বলেন, প্রথমে নামায দুই রাকআত করে ফরয হয়েছিল। এরপর হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হিজরত করলেন তখন নামায চার রাকআত হিসাবে ফরয করা হলো এবং সফরের নামায পূর্বের মতই (দু’রাকআত) বহাল থাকলো।”
এ হাদীস দ্বারা বুঝা গেলো যে, হিজরতের পূর্বে প্রত্যেক নামায দুরাকআতই ছিলো। হিজরতের পরে কিছু নামাযকে চার রাকআত করা হয়েছে। কিন্তু সফরের নামায হিজরতের পূর্বের মতই বহাল থাকলো‌। যদি তখন কেউ চার রাকআত পড়ে নিত, তাহলে তার নামায হতো না। তদ্রূপ বর্তমানেও যে মুসাফির সফরে চার রাকাআত ফরয পড়বে, তার নামায শুদ্ধ হবে না। فرض ও فريضة শব্দটি দু’টি গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করুন।
মুআত্তা ইমাম মুহাম্মদ ও ইমাম মালিকের রিওয়ায়াতের শব্দাবলী এরূপ-

فُرِضَتِ الصَّلوَةُ رَكْعَتَيْنِ رَكْعَتَيْنِ فِى الْحَضَرِ وَالسَّفَرِ فَاُقِرَّتْ صَلَاةُ السَّفَرِ وَزِيْدَ فِى صَلَوَةِ الْحَضَرِ

“শুরুতে সফর ও স্থায়ী অবস্থান কালে উভয় অবস্থাতেই নামায দুই রাকআত করে ফরয হয়েছিল পরবর্তী সময়ে সফরের নামায অপরিবর্তিত রইলো এবং ‘স্থায়ী অবস্থানের’ নামাযে বৃদ্ধি করা হলো।”
হাদিছ নং ৫-৭ মুসলিম, নাসাঈ, তাবরানী, প্র্রমুখ হযরত আব্দুল্লাহ  ইবনে আব্বাস (রাদ্বি.) থেকে বর্ণনা করেন-

قَالَ فَرَضَ اللهُ الصَّلَوَةَ عَلَى لِسَانِ بَنِيِّكُمْ فِى الْحَضَرِ اَرْبَعًا وَفِى السَّفَرِ رَكْعَتَيْنِ وَفِى الْخَوْفِ رَكْعَةً

“তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদের নবীর ভাষায় নিজ বাসস্থানে চার রাকআত, সফরে দু’রাকআত এবং ভয়ের সময় এক রাকআত (অর্থাৎ জামাআতের সাথে এক রাকআত) নামায  ফরয করেছেন।
এতে সুষ্পষ্ট ভাবে জানা গেলো যে, সফরে নিজ এলাকার ফজরের নামাযের মত সফরে দু’রাকআতই ফরয।
হাদিছ নং ৮-১৩: মুসলিম, বুখারী, আবু দাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ হযরত আনাস (রাদ্বি:) থেকে রিওয়ায়াত করেন-

قَالَ خَرَجْنَا مَعَ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الْمَدِيْنَةِ اِلَى مَكَّةَ فَكَانَ يُصَلِّى رَكْعَتَيْنِ

হযরত আনাস (রাদি:) বলেন, আমরা হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর সাথে মদীনা মুনাওয়ারা থেকে মক্কা মুআযযামার দিকে গিয়েছি। তখন হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) প্র্রতেক ফরয নামায দু’রাকআত করে পড়তেন।
হাদীস নং ১৪-১৬: বুখারী, মুসলিম ও নাসাঈ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে রিওয়ায়াত করেন-

قَالَ صَلَّيْتُ مَعَ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمنَىِ رَكْعَتَيْنِ وَاَبِىْ بَكْرٍ وَعُمَرَ وَمَعَ عُثْمَانَ صَدْرًا مِنْ اِمَارَتِهِ ثُمَّ اَتَمَّهَا

“তিনি বলেন, আমি মিনায় নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আবু বকর ও উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমার) পিছে প্রত্যেক ফরয নামায দুই রাকআত করে পড়েছি। হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর খিলাফাতের প্রাথমিক সময়েও অনুরূপ পড়েছি। পরবর্তী সময়ে  হযরত উসমান (রাদিঃ) সম্পূর্ণ পড়া শুরু করেছেন।
হাদিছ নং১৭: তাবরানী হযরত ইবনে আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) থেকে রিওয়ায়াত করেন-

قَالَ اِفْتَرَضَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَكْعَتَيْنِ فِى السَّفَرِ كَمَا اِفْتَرَضَ فِى الْحَضَرِ اَرْبَعَا

“তিনি বলেন- রাসুলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম সফরে দু’রাকআতই ফরয করেছেন, যেমন নিজ বাসস্থানে চার রাকআত ফরয করেছেন।”
হাদিছ নং-১৮ নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, ইবনে হাব্বান, হযরত উমর (রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) থেকে রিওয়ায়াত করেন-
তিনি বলেন, সফরের নামায দু’রাকআত, চাশতের নামায দু’রাকআত, ঈদুল ফিতরের নামায দু’রাকআত, জুমুআর নামায দু’রাকআত। এ দু’রাকআত হলো পরিপূর্ণ অসম্পূর্ণ নয়। আর তা হুযুর মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর মাতৃভাষাতেই।
এ থেকে সুস্পষ্ট ভাবে জানা গেল যে, সফরের নামায দু’রাকআত পড়া এমনই জরুরী যেমন জুমুআ ও দু’ঈদের নামায দু’রাকআত পড়া আবশ্যক।
হাদীস নং ২১: ইমাম মুসলিম হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিঃ) থেকে কিছুটা দীর্ঘ একটি উদ্ধৃত করেছেন, যার শেষের পবিত্র শব্দাবলী এরূপ-

فَسَأَلْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ صَدَقَةٌ تَصَدَّقَ اللهُ بِهِ فَاقْبَلُوْا صَدَقَتَهُ

আমি হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর কাছে কাসর নামায প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলাম। হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বললেন, এটি একটি ‘সাদক্বাহ’ যা আল্লাহ তা’আলা দান করেছেন। তোমরা এ ‘সাদক্বাহ’ গ্রহন করো।
এ হাদিসে فَاقْبَلُوْا শব্দটি ‘আমর’ আর ‘আমর’ আসে আবশ্যকতা বুঝানোর জন্য। বুঝা গেলো যে ব্যক্তি সফরে চার রাকআত (ফরয) পড়ে, সে আল্লাহ তা’আলার ‘সাদক্বাহ’ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আল্লাহ তাআলার ‘সাদক্বাহ’ কবূল করা এবং সফরে কাসর করা ফরয।
হাদীস নং-২২: তাবরানী ‘মুজামে সাগীর’ গ্রন্থে সাইয়িদুনা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদ্বি.) থেকে রিওয়ায়াত করেন-
ইবনে মাসউদ (রাদ্বি.) বলেন, আমি সফরে হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর পিছে দু’রাকআত নামায পড়েছি এবং হযরত আবূ বকর সিদ্দীক ও উমর ফারুক (রাদ্বি.) এর পিছেও দু’রাকআত পড়েছি। পরবর্তীতে বিভিন্ন পন্থা তোমাদেরকে পৃথক করে দিয়েছে। আল্লাহর কসম! আমার আশা হলো চার রাকআতের পরিবর্তে কবূলকৃত দু’রাকআত পাওয়া।
আমরা উদাহরণস্বরূপ মাত্র বাইশটি হাদীস পেশ করেছি। নচেৎ এ সম্পর্কে আসংখ্য হাদীস রয়েছে। উক্ত রিওয়ায়াতগুলো থেকে বুঝা যায় সফরে কাসরই ফরয। হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এবং খোলাফা-ই-রাশিদীন কাসরই পড়েছেন, সাহাবায়ে কিরাম চার রাকআত পড়তে নিষেধ করেছেন কিংবা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
বিবেকের চাওয়াও এটা যে সফরে কাসর ফরয। মুসাফিরকে কাসর ও সম্পূর্ণকরণ উভয়ের স্বধীনতা দেয়া শরয়ী জ্ঞানের সম্পূর্ণ বিরোধী। কারণ সফরে প্রত্যেক চার রাকআত বিশিষ্ট নামাযে প্রথম দু’রাকআত সকলের ঐক্যমতে ফরয। এখন শেষ দু’রাকআত সম্পর্কে প্রশ্ন হলো তাও মুসাফিরের উপর ফরয কি না? যদি ফরয হয় তাহলে তা না পড়ার সুযোগ কি ভাবে থাকবে? ফরযের ক্ষেত্রে কোন স্বাধীনতা নেই। ফরয ও ইচ্ছাধীনতা একত্রিত হতে পারে না।
আর যদি ফরয না হয়ে নফল হয়, তাহলে একই তাকবীরে তাহরীমায় ফরয ও নফল নামায আদায় শরীআতের নিয়মবিরূদ্ধ, যার উদাহরণ কোথাও পাওয়া যাবে না। ফরয ও নফলের তাকবীরে তাহরীমা ভিন্ন ভিন্ন। একটি তাকবীরে তাহরীমায় এক ধরণের নামাযই হতে পারে দু’রকম নয়।
যে ভাবেই হোক, দু’রাকআত কিংবা চার রাকআত পড়ার স্বাধীনতা শরয়ী জ্ঞানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। মোট কথা যে ভাবে নিজ বাসস্থানে চার রাকআতই ফরয, হ্রাস-বৃদ্ধির স্বাধীনতা নেই তদ্রুপ সফরে কেবল মাত্র দু’রাকআতই পড়া আবশ্যক কোন রূপ এখতিয়ার ছাড়াই। -সুত্রঃ জা’আল হক ৩য় খন্ড-