হজ্বের সংজ্ঞা

পবিত্র ক্বোরআনে কারীম এবং হাদীসে নবভী শরীফে হজ্জ শব্দটি ‘হা’ তে যবর ও যের সহকারে অর্থাৎ حَج এবং حِج উভয়রূপে উল্লিখিত হয়েছে। কেউ কেউ বলেন হজ্জ শব্দটি যবর যোগে ‘মাসদার’ (ক্রিয়ামূল) আর যের সহকারে ‘ইসম’ বা বিশেষ্য। আবার কোন কোন মুহাক্বক্বিক্ব বলেন, যবর সহকারে হজ্জ শব্দটি ‘ইসম’ বা বিশেষ্য এবং যের সহকারে হজ্ব শব্দটি ‘মাসদার’ বা ক্রিয়ামূল। হজ্জ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো قَصْدُ الشَّىْءِ الْعَظِيْمِ الْفَخِيْمِ  অর্থাৎ আযীমুশ্বান কোন বিষয় বা বস্তু অর্জনের সংকল্প করা, ইচ্ছা করা। আর ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় হজ্বের মাসসমূহে ইহরাম পরিধান করে ৯ জিলহজ্জ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা এবং বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করার সংকল্প করাকে হজ্জ বলা হয়। -সুত্রঃ গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব-

হজ্জে বায়তুল্লাহ

হজ্জ ইসলামের অন্যতম বুনিয়াদী ইবাদতআল্লাহ-প্রেমের পরম নিদর্শন এবং এক ব্যতিক্রমর্ধমী ইবাদতহজ্জ। ইসলামের সকল ইবাদত নামায, রোয, যাকাত, জিহাদ, সদক্বাহ-খয়রাত, যিকর-আযকার এবং তরীক্বতের সবক্ব পালন ইত্যাদি সর্বত্র আদায়যোগ্য। কিন্তু হজ্জ ব্যতিক্রম। এটা একমাত্র নির্দিষ্ট মওসুমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মেহমানরূপে মর্যাদাবান হয়ে খানায়ে কা’বা বায়তুল্লাহ শরীফ উপস্থিত হয়েই শ্তধু আদায় করা যায়।
কোন কোন ইবাদত দৈহিক; যেমন নামায, রোযা, যিকর- আযকার’ আর কোন কোন ইবাদত মালী বা আর্থিক; যেমন যাকাত-ফিতরা, সাদক্বাহ-খায়রাত ইত্যাদি। কিন্তু হজ্জ এমন একটি ইবাদত যা শারীরিক শ্রম-সাধনা এবং আর্থিক ক্বোরবানী উভয়ের সমন্বয়ে আদায় করতে হয়। অন্যান্য সকল ইবাদত রিয়াযতে আনুগত্যের প্রাধান্যই পরিদৃষ্ট হয় আর হজ্জে বায়তুল্লাহর বিধি-বিধান পালনকালে আল্লাহর প্রেমের প্রধান্যই পরিলক্ষিত হয়। তাই হজ্জে মাক্ববূলের প্রতিদান হলো জান্নাত।
হজ্জ এমন একটি আমল যার বদৌলতে আন্তর্জাতিক ইসলামী ভ্রাতৃত্ব বন্ধুত্ব এবং সংহতিও সূচিত হয় বিশ্ব মুসলিমের মধ্যে। কেননা, প্রতি বছর নির্দিষ্ট তারিখে নির্দিষ্ট সময়ে লক্ষ-লক্ষ মু’মিন নর-নারী আরাফাত, মিনা-মুয্দালিফায় সমবেত হয়ে এক আল্লাহর মহত্ব-বড়ত্ব ও গুণগানে মত্ত হয়ে উঠে। ভাষা, বর্ণ, বাসভূমি ইত্যাদি কারণে বিক্ষিপ্ত ‍মুসলিম মিল্লাত হজ্জের বরকতে ও বদৌলতে আরাফাতের ময়দানে একক মুসলিম জাতি সত্তায় পরিণত হয়। এভাবেই বিশ্ব মুসলিম ঐক্যের ভিত সুদৃঢ় ও সুসংহত হয়। হজ্জ এমন একটি গুরুত্ববহ রিয়াযত যার বরকতে মানব হৃদয়ে বিনয় নম্রতা ও কোমলতা আর চরিত্রে পবিত্রতা পরিশুদ্ধি অর্জিত হয়। যা হজ্জে মাকবূলেরই নমুনা ও নিদর্শন। এহেন অপরিসীম পার্থিব ও পারলৌকিক কল্যাণ, মঙ্গল ও উপকার নিহিত রয়েছে পবিত্র হজ্জে বায়তুল্লাহর মধ্যে। এজন্য ক্বোরআনে কারীমের অনেক আয়াতে এবং হাদীসে নবভী শরীফের অনেক রেওয়ায়ত বারংবার তাগিদ দেয়া হয়েছে সামর্থ্যবান মু’মিন নর-নারীর প্রতি হজ্জ সম্পন্ন করার বিষয়ে। -সুত্রঃ গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব-

হজ্জ কখন ফরয হয়

হজ্জ কখন ফরয হয় এ বিষয়ে মুহাদ্দিসীন মুফাসসিরীন এবং ফক্বীহগণের মধ্যে মাতানৈক্য রয়েছে। মুহাক্বক্বেক্বীন ওলামাই কেরামের মধ্যে কেউ কেউ বলেন হজ্জ হিজরী তৃতীয় সালে ফরয হয় যে বছর ওহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। [তাফসীরে ইবনে কাসীর]
আবার কোন কোন মুহাক্বক্বিক্ব বলেন, হজ্জ হিজরী ষষ্ঠ সালে ফরয হয়। তবে অধিকাংশ মুহাদ্দিসীন এবং ফক্বীহর মতে হজ্জ হিজরী নবম সনে ফরয হয়। [আলমগীরী ও দুররে মুখতার]
দলে দলে লোকজনের ইসলাম গ্রহণ এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি দলের আগমনের কারণে আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যস্ত থাকায় ওই বছর হজ্বে যাননি; বরং সাইয়্যেদুনা আবূ বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে ‘আমীরুল হুজ্জাজ’ মানোনীত করে মক্কা শরীফে প্রেরণ করেন হজ্জ আদায়ের লক্ষে। হুযুর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরবর্তী বছর ১০ম হিজরীতে হজ্জ সম্পন্ন করেন, যা ঐতিহাসিক ‘বিদায় হজ্জ’ হিসেবে প্রসিদ্ধ। -সুত্রঃ গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব-

হজ্জের প্রকারভেদ

১. হজ্জে আসগরঃ ওমরাহকে হজ্জে আসগর বা ছোটতর হজ্জ বলা হয়। বছরে যতবার যখনই ইচ্ছা ওমরাহ পালন করা যায়।
২. হজ্জে ইফরাদঃ শুধু হজ্জের নিয়্যতে ইহরাম বাঁধা। এ হজ্জে ওমরাহ নেই।
৩. হজ্জে তামাত্তুঃ পৃথক পৃথক ইহরাম দ্বারা হজ্জের মাসে ওমরাহ ও হজ্জ সম্পন্ন করা। এ হজ্জ আফাক্বী অর্থাৎ মীক্বাতের বাইরে অবস্থানকারীদের জন্য।
৪. হজ্জে ক্বিরানঃ অর্থাৎ হজ্জের মাসে ওমরাহ ও হজ্জ একই ইহরামে একত্রিত করা। এটাও কেবল আফাক্বীদের জন্য।

হজ্জের ফযীলত সমূহ

পবিত্র ক্বোরআনে কারীম এবং হাদীসে নবভী শরীফে বায়তুল্লাহর গুরুত্ব-তাৎপর্য, ফযীলত-বরকত, মরতবা-মহিমা অপরিসীম। নিম্নে তার কিছুটা বিবৃত হলো-
ক্বোরআন কারীমে আল্লাহ পাক এরশাদ করেছেন-وَاَتِمُّوْا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلهِ অর্থাৎ (হে মুমিনগণ!) আর তোমরা একমাত্র আল্লাহর জন্য হজ্জ ও ওমরাহ পরিপূর্ণ করো।
অন্য আয়াতে এরশাদ হয়েছে-وَلِلهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ اِلَيْهِ سَبِيْلًاً অর্থাৎ মানুষের জন্য একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই ঘরের হজ্জ করা তার জন্য ফরয যার সেখানে পৌঁছার সামর্থ আছে।
উপরোক্ত আয়াতাংশের আলোকে প্রতীয়মান হয় ঈমানদারের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিশ্চিত মাধ্যম হলো আল্লাহর ঘরের হজ্জ
হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে-

عَنْ اَبِى هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ تَعَالى عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ حَجَّ لِلّهِ فَلَمْ يَرْفَث وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمٍ وَلَدَتْهُ اُمُّه‘ (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)

অর্থাৎ (সার্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী) সাইয়্যেদুনা হযরত আবূ হুরায়রাহ রাদ্বিয়াল্লাহ তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে কারীম রঊফুর রহীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কোনরূপ অশ্লীল কর্মকান্ড কিংবা পাপাচারে লিপ্ত হওয়া ব্যতিরেকে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে হজ্জ পালন করবে সে মাতৃগর্ভে হতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিনের ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে প্রত্যাবর্তন করবে।

وَعَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اَلْعُمْرَةُ اِلَى الْعُمْرَةِ كَفَّارَةٌ لِّمَا بَيْنَهُمَا وَالْحَجُّ الْمَبْرُوْرُ لَيْسَ لَه‘ جَزَ آءٌ اِلَّا الْجَنَّةُ (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)

অর্থাৎ (নবী প্রেমে নিবেদিত প্রাণ সাহাবী) সাইয়েদুনা হযরতে আবূ হুরায়রাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূলে পাক সাহেবে লাওলাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন- একটি ওমরাহ কাফফারা হয়ে যায় (অর্থাৎ আমলনামা থেকে গুনাহসমূহ মোচন করে দেয়) আরেকটি ওমরাহ পালন করা পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ে সংঘটিত গুনাহসমূহের। আর হজ্জে মাবরূরের প্রতিদান জান্নাতই।
উল্লেখ্য যে হজ্জে মাবরূর বলা হয় ওই হজ্জকে যার সাথে কোন রুপ পাপাচার লৌকিকতা লোকদেখানো ইত্যাদি যুক্ত হয় নি। ‍

وَ عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِنَّهُ قَالَ اَلْحُجَّاجُ وَالْعُمَّارُ وَفْدُ اللهِ اِنْ دَعَوْهُ اَجَابَهُمْ وَاِنِ اسْتَغْفَرُوْهُ غَفَرَلَهُمْ(رواه ابن ماجة)

অর্থাৎ (প্রসিদ্ধ হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী সাইয়েদুনা) হযরত আবূ হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূলে আকরাম নূরে মুজাসসাম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন- আল্লাহর ঘরের হজ্জ এবং ওমরা পালনকারীরা আল্লাহর প্রতিনিধি স্বরূপ। তারা যদি আল্লাহর নিকট দোয়া-ফরিয়াদ করে আল্লাহ পাক তা কবূল করেন এবং তারা আল্লাহর নিকট মাগফিরাত চাইলে আল্লাহ পাক তাদের (গুনাহসমূহ) মার্জনা করেন। [ইবনে মাজাহ শরীফ]

وَعَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ تَعَالى عَنْهُ فَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ وَفْدُ اللهِ ثَلثَةٌ اَلْغَازِىْ وَالْحَاجُّ وَالْمُعْتَمِرُ (رواه النسائى والبيهقى فى شعب الايمان)

অর্থাৎ সাইয়্যেদুনা হযরত আবূ হুরায়রাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলে খোদা হাবীবে কিবরিয়া সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এরশাদ করতে শুনেছি- আল্লাহর প্রতিনিধি তিনজন যথা-
১। আল্লাহর পথে জিহাদকারী
২। আল্লাহর ঘরের হজ্জ আদায়কারী এবং
৩। ওমরাহ পালনকারী।
[নাসাঈ শরীফ ও বায়হাক্বী শুআবুল ঈমান]

وَعَنْ اِبْنِ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُمَا قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِذَا لَقِيْتَ الْحَاجَّ فَسَلِّمْ عَلَيْهِ وَصَافِحْهُ وَمُرْهُ اَنْ يَسْتَغْفِرَ لَكَ قَبْلَ اَنْ يَدْخُلَ بَيْتَه‘ فَاِنَّه‘ مَغْفُوْرٌ(رواه احمد)

অর্থাৎ প্রখ্যাত সাহাবী-ই রাসূল সাইয়্যেদুনা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে আকরাম হাবীবে রহমান সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- যখন তুমি কোন হাজীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তখন তাকে সালাম করবে, তার সঙ্গে করমর্দন করবে এবং তাকে বলবে যেন তার ঘরে প্রবেশ করার পূর্বেই তোমার জন্য মাগফিরাত কামনা করে। কেননা, হাজীর মাগফিরাত হয়ে গেছে। [মুসনাদে আহমদ]

وَعَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ تَعَالى عَنْهُ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ خَرَجَ حَاجًّا اَوْ مُعْتَمِرًا اَوْ غَزِيًا ثُمَّ مَاتَ فِىْ طَرِيْقِه كَتَبَ اللهُ لَه‘ اَجْرَ الْحَاجِّ اَوِ الْغَازِىِّ اَوِ الْمُعْتَمِرِ (رواه البيهقى  فى شعب الايمان)

অর্থাৎ সাইয়্যেদুনা হযরত আবূ হুরায়রাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে খোদা হাবীবে কিবরিয়া সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ঘরের হজ্জ কিংবা ওমরাহ পালন করার উদ্দেশ্যে অথবা আল্লাহর পথে জেহাদ করার সংকল্পে ঘর হতে বের হয়ে পথিমধ্যে ইন্তেকাল করলো, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার আমলনামায় আল্লাহর ঘরের হজ্জ কিংবা ওমরাহ আদায়কারীর অথবা জেহাদকারীর সাওয়াব লিপিবদ্ধ করে দেবেন। [বায়হাক্বী শুআবুল ঈমান]

وَعَنْ اِبْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالى عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ اَرَادَ الْحَجَّ فَلْيَتَعَجَّلْ (رواه ابو دؤد والدارمى)

অর্থাৎ মুফাসসিরকুল সরদার সাহাবী-ই রাসূল সাইয়্যেদুনা আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে আকরাম রহমতে আলম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি হজ্জ করার ইচ্ছে করে সে যেন তাড়াতাড়ি আদায় করে নেয়। [আবূ দাউদ শরীফ ও দারেমী শরীফ।]

قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حُجُّوا فَاِنَّ الْحَجَّ يَغْسِلُ الذُّنُوْبَ كَمَا يَغْسِلُ الْمَاءُ الدَّرَنَ

অর্থাৎ রাসূলে খোদা আশরাফে আম্বিয়া সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা হজ্জ পালন করো। কেননা হজ্জ গুনাহসমূহকে এমনভাবে ধৌত করে ফেলে যেভাবে পানি ময়লা ধৌত করে (পরিচ্ছন্ন করে)।
উপরোক্ত রেওয়ায়কতসমূহের আলোকে প্রমাণিত হয় যে হজ্জ ও ওমরাহ এমন তাৎপর্যবহ ও মহিমান্বিত ইবাদত, যার বদৌলতে বান্দা আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়ার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়, হজ্জ ও ওমরাহ আদায়কারীর সমুদয় গুনাহ মাফ হয়ে যায়, ইহকালীন জীবন পূত-পবিত্র ও পরিশুদ্ধি হয়ে যায় এবং পরকালীন জীবনে বেহেশতী ও দীদারে ইলাহীর উপযোগী হয়। -সুত্রঃ গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব-

হজ্জ আদায় না করা কিংবা হজ্জ আদায়ে গাফলতি করার ভয়ঙ্কর পরিণাম

আমীরুল মুমিনীন সাইয়্যেদুনা মাওলা আলী শেরে খোদা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে পাক সাহেবে লাওলাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি (হজ্জ আদায় করার) সম্বল এবং এমন আরোহীর মালিক হবে, যা বায়তুল্লাহ শরীফ পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম অথচ হজ্জ আদায় করলো না সে ইহুদী হয়ে মৃত্যুবরণ করল অথবা নাসারা হয়ে মৃত্যুবরণ করল তাতে কোন তারহতম্য নেই। কেননা আল্লাহ পাক বলেন সামর্থ্যবান মানুষের উপর আল্লাহর ঘরের হজ্জ আদায় করা অপরিহার্য।  [তিরমিযী শরীফ]

وَعَنْ اَبِىْ اُمَامَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ لَّمْ يَمْنَعْهُ مِنَ الْحَجٍّ حَاجَةٌ ظَاهِرَةٌ اَوْ سُلْطَانٌ جَآئِرٌ اَوْ مَرَضٌ حَابِسٌ فَمَاتَ وَلَمْ يَحُجَّ فَلْيَمُتْ اِنْ شَآءَ يَهُوْدِيًا وَاِنْ شَآءَ نَصْرَ انِيًا (رواه الدارمى)

অর্থাৎ (প্রখ্যাত সাহাবী-ই রাসূল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাইয়্যেদুনা) হযরত আবূ উমামা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে করীম রঊফুর রহীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, প্রকাশ্য অভাব-অনটন কিংবা যালিম বাদশাহ অথবা দুরারোগ্য ব্যাধি যাকে হজ্জ পালনের বাধা প্রদান করলো না আর সে হজ্জ আদায় না করে মৃত্যু বরণ করলো-চাই সে ইহুদী হয়ে মৃত্যুবরণ করুক অথবা নাসারা হয়ে মৃত্যুবরণ করুক (তাতে কোন ব্যবধান নেই। (দারেমী শরীফ)

قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ اَيْسَرَ وَلَمْ يَحُجًّ وَمَاتَ عَلى ذَلِكَ فَهُوَ فِى النَّارِ ذَاتِ الْوَحْشَةِ وَالظَّلاَمِ

অর্থাৎ রাসূলে খোদা আশরাফে আম্বিয়া সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, সামর্থবান হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যক্তি হজ্জ আদায় না করে মৃত্যুবরন করলো সে যেন ভয়ানক অন্ধকারাচ্ছন্ন জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হলো। উপরোক্ত বর্ণনাসমূহের আলোকে প্রতীয়মান হয় যে সামর্থবান হওয়া সত্ত্বেও হজ্জ আদায় না করেন মৃত্যুবরণকারীর মৃত্যু ঈমানের সাথে হলো কিনা তাতে সমূহ সন্দেহ রয়েছে। (নাঊযুবিল্লাহ) কেননা হজ্জ আদায় না করার মধ্যে দিয়ে যেন হজ্জ ফরয হওয়াকে অস্বীকার করা হলো। এজন্য মৃত্যুর পর সে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে।

وَعَنْ اِبْنِ مَسْعُوْدٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَابِعُوْا بَيْنَ الْحَجِّ وَالْعُمْرَةِ فَاِنَّهُمَا يَنْفِيَانِ الْفَقْرَوَالذُّنُوْبَ كَمَا يَنْفِى الْكِيْرُ خُبْثَ الْحَدِيْدِ وَالذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَلَيْسَ لِلْحَجَّةِ الْمَبْرُوْرَةِ ثَوَابٌ اِلَّا الْجَنَّةُ (رواه التر مذى والنسائى)

অর্থাৎ (প্রখ্যাত সাহাবী সাইয়্যেদুনা) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে পাক সাহেবে লাওলাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা হজ্জ্ ও ওমরা একসঙ্গে আদায় করো। কেননা এ দুটি অভাব-অনটন এবং পাপসমূহকে তেমনভাবে দূরীভূত করে যেভাবে ভাট্টি স্বর্ণে-রৌপ্য ও লোহার মরিচাকে দূরীভূত করে দেয়। আর হজ্জে মাবরূরের প্রতিদান একমাত্র জান্নাতই । [তিরমিযী ও নাসায়ী শরীফ]
প্রখ্যাত সাহাবী-ই রাসূল সাইয়্যেদুনা হযরত আবূ মুসা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আল্লাহর ঘরের হজ্ব আদায়কারী হাজী স্বীয় পরিবারের চারশত ব্যক্তির (নাজাতের) জন্য (আল্লাহর নিকট) শাফাআত করবেন এবং তারা গুনাহসমূহ থেকে মাতৃগর্ভে হতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিনের ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে যাবে। [মুসনাদে বাযযার]
প্রসিদ্ধ সাহাবী-ই রাসূল সাইয়্যেদুনা হযরত জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে পাক সাহেবে লাওলাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, এ ঘর (অর্থাৎ বায়তুল্লাহ শরীফ) ইসলামের স্তম্ভসমূহের অন্যতম একটি স্তম্ভ। অতঃপর যারা এ ঘরের হজ্জ কিংবা ওমরাহ করবে সে আল্লাহ পাকের যিম্মায় আশ্রয়পাপ্ত হবে। যদি মৃত্যুবরণ করে আল্লাহ পাক তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাবেন। আর যদি ঘরে ফিরে যায় তবে সাওয়াব এবং গণীমত সহকারে আল্লাহ পাক তাকে ঘরে পৌঁছাবেন।
এছাড়াও অসংখ্য রেওয়ায়ত রয়েছে, যেগুলো দ্বারা প্রমাণিত হয় ও হজ্জের ফযীলত, বরকত, মরতবা-মহিমা অপরিসীম, হজ্জের বরকতে মুমিনের দৈহিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধি অর্জিত হয় যা ইহকালীন ও পরকালীন চুড়ান্ত সাফল্যের নিশ্চিত সাহায়ক হয়।  -সুত্রঃ গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব-

হজ্জের শর্তাবলী

 হজ্জের শর্তসমূহ চার ভাগে বিভক্ত

১. شرائط وجوب বা হজ্জ ওয়াজিব বা ফরয হওয়ার শর্তাবলী।
২. হজ্জ আদায় করা ওয়াজিব বা ফরয হওয়ার শর্তসমূহ।
৩. হজ্জ পালন বিশুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলী।
৪. হজ্জ আদায়ের পর দায়িত্বমুক্ত হওয়ার শর্তাবলী।
১. হজ্জ ওয়াজিব বা ফরয হওয়ার শর্তসমূহ
যে সকল শর্তাবলী বিদ্যমান থাকলে মানুষের উপর হজ্জ সম্পাদন ফরয হয় এর একটি অনুপস্থিত হলেও হজ্জ ফরয হয় না। এ প্রকারের সাতটি শর্ত রয়েছে-
ক. মুসলমান হওয়া।
খ. হজ্জ ফরয হওয়া সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া
গ. বালেগ হওয়া।
ঘ. বিবেকসম্পন্ন হওয়া।
ঙ. স্বাধীন হওয়া।
চ. হজ্জ সম্পাদনের সামর্থ্য থাকা।
ছ. হজ্জের সময় হওয়া।
অতএব কাফির যত বড় ধনবানই হোক না কেন তার উপর হজ্জ ফরয নয়। এমনকি কোন ধনাঢ্য কাফির দারিদ্র হয়ে ‍যাওয়ার পর ঈমান আনলো, তার জন্যও হজ্জ ফরয হবে না। কেউ কাফির অবস্থায় নিজে হজ্জ করলো কিংবা অন্য কোন মুসলমান দ্বারা হজ্ব করালো, পরে মুসলমান হলো তার পূর্বের হজ্জ দ্বারা ফরয আদায় হবে না।
২. হজ্জ আদায় করা ওয়াজিব হওয়ার শর্তাবলীঃ-
অর্থাৎ এমন কিছু শর্তাবলী যেগুলোর উপর হজ্জ ওয়াজিব বা ফরয হওয়া নির্ভরশীল নয় তবে এগুলো বিদ্যমান থাকলে হজ্জ সম্পাদন করা ওয়াজিব বা ফরয হয়ে যায়। যদি ১নং ও ২নং শর্ত দু’টি কারো মধ্যে একত্রে পাওয়া যায়, তখন নিজে হজ্জ সম্পাদন করতে হয়। আর কেবল ১নং শর্তগুলো কারো মধ্যে বিদ্যমান থাকলেও যদি ২নং শর্তাবলী একটিও অনুপস্থিত হয় তখন নিজে হজ্জ সম্পাদন করতে হয় না এবং তাৎক্ষণিকভাবে অথবা পরবর্তী সময়ে অন্য কারো দ্বারা হজ্জ করার ব্যবস্থা করবে। এ প্রকারের পাঁচটি শর্ত রয়েছে-
১. সুস্থ বা রোগ মুক্ত হওয়া।
২. বন্দী বা সরকার আইনে বাধাগ্রস্থ না হওয়া।
৩. রাস্তা নিরাপদ হওয়া।
৪. মহিলা হলে তার সাথে মুহরিম থাকা।
৫. স্ত্রী লোকের হায়েয-নিফাস ইত্যাদি ইদ্দত থেকে মুক্ত থাকা। (অবশ্য হায়য সম্পন্না নারী হায়য চলাকালে মসজিদে হারামে প্রবেশ করা ব্যতীত অন্যান্য বিধান পালন করতে পারবে। তারপর সুস্থ হলে তাওয়াফ ইত্যাদি করে নেবে।)
প্রথমোক্ত তিনটি শর্ত নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য আর শেষোক্ত দুটি শর্ত কেবল মহিলাদের জন্য। কেউ সুস্থাবস্থায় হজ্জ ফরয হওয়ার সত্ত্বেও হজ্জ আদায় করেনি পরে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লে তার ওযর গ্রহণযোগ্য হবে না। সে অন্য দ্বারা হজ্জ করাবে অথবা হজ্জের অসীয়ত করে যাবে, হজ্জের উপর সামর্থবান এক ব্যক্তি কারো পাওনা আদায়ের ব্যাপারে গ্রেফতার হয়ে পড়লো এবং তার কাছে এই পাওনা পরিশোধের ক্ষমতাও আছে, তবে ওই বন্দি অবস্থায় অপরাগতা বলে গণ্য হবে না। তাকে হজ্জে বদলের আদেশ অথবা অসীয়ত করে যেতে হবে।
৩. হজ্জ আদায় বিশুদ্ধ হবার শর্তাবলীঃ-
অর্থাৎ এমন কিছু শর্ত যেগুলো ব্যতীত হজ্জ পালন শুদ্ধ হবে না-
১. মুসলমান হওয়া।
২. ইহরাম পরিধান করা। ইহরাম ব্যতীত কেউ হজ্জে সমাধা করলেও তা শুদ্ধ হবে  না।
৩. হজ্জের নির্ধারিত সময়ে হজ্জ সম্পাদন করা।
৪. প্রত্যেকটা কাজ সংশ্লিষ্ট স্থানে যথা নিয়মে আদায় করা।
৫. বিবেকবান ও চেতনা সম্পন্ন হওয়া।
৬. হজ্জের কার্যাবলী নিজেই আদায় করা।
৭. বালেগ হওয়া।
৮. ইহরাম অবস্থায় স্ত্রী সহবাসসহ যাবতীয় নিষিদ্ধ কার্য থেকে বিরত থাকা।
৯. যে বৎসর ইহরাম পরিধান করেছে সে বৎসরই হজ্জ পালন  করা।
৪. হজ্জ আদায়ের পর দায়িত্বমুক্ত হওয়ার শর্তাবলীঃ-
শরা-ইত্বে রুকন- ফরয বা ওই সমস্ত শর্তাবলী যেগুলো পূরণ হলে হজ্জ আদায় করে দায়িত্বমুক্ত হওয়া যায়। এমন শর্তাবলী নিম্নরূপ-
১. হজ্বের সময় মুসলমান হওয়া।
২. মুসলমান হিসাবে জীবনের শেষমূহুর্ত পর্যন্ত অবিচল থাকা। আল্লাহ না করুন, কোন মুসলমান যদি হজ্জ আদায় করার পর কাফির হয়ে যায়ও তার হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে। পরবর্তীতে সে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করলে এবং সামর্থ্যবান হলে পুনরায় তার উপর হজ্জ ফরয হবে।
৩. স্বাধীন হওয়া।
৪. বালেগ হওয়া। নাবালেগ অবস্থায় হজ্জ করলে তা নফল হিসেবে গন্য হবে। বালেগ হওয়ার পর সামর্থ্যবান হলে তাকে অবশ্যই পুনরায় হজ্জ পালন করতে হবে।
৫. বিবেকবান হওয়া।
৬. শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান ব্যক্তি নিজেই হজ্বের কার্যাদি সম্পাদন করা
৭. স্ত্রী সহবাস বা নিষিদ্ধ কার্য দ্বারা হজ্বকে নষ্ট না করা
৮. অন্য কারো পক্ষ থেকে হজ্জের নিয়্যত না করা।
৯. নফলের নিয়্যত না করা।

হজ্জের ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাতসমূহ

হজ্জের ফরযসমূহঃ

হজ্জের ফরয তিনটি
১. (নিষ্ঠার সাথে নিয়্যত করে) ইহরাম পরিধান করা।
২. আরাফাতে অবস্থান করা।
অর্থাৎ ৯ই জিলহজ্জ সূর্য পশ্চিম দিকে হেলার পর থেকে ১০  জিলহজ্জের সুবহে সাদিক্বের পূর্বাক্ষণ পর্যন্ত কিছুক্ষণের জন্য আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা।
৩. (আরাফাতে অবস্থানের পর) ‘তাওয়াফে যিয়ারত’ করা। এটা ১০ জিলহজ্জ থেকে ১২ জিলহজ্জ সূর্যাস্তের পর্ব পর্যন্ত করা যায়। তবে ১০ জিলহজ্জ ফরয তাওয়াফ করাই উত্তম। এই তিনটা তারতীব অনুযায়ী যথাস্থানে আদায় করা কর্তব্য। এর একটিও বাদ পড়লে হজ্জ আদায় হবে না এবং দম বা ক্বোরবানীও এ জন্য যথেষ্ট হবে না।

হজ্জের ওয়াজিবসমূহঃ

১. আরাফাত থেকে ফেরার পথে মুযদালিফায় অবস্থান করা এবং সেখানে মাগরিব ও এশার নামায এক সাথে আদায় করা।
২. সাফা ও মারওয়ার মধ্যখানে সা’ঈ করা।
৩. ‘রামীয়ে জেমার’ বা জামরাহগুলোতে কংকর নিক্ষেপ করা।
৪. ক্বিরান ও তামাত্তু কারী হাজীদের ক্বোরবানী করা। এর অপর নাম দমে শোকরিয়া, দমে মাতাত্তু ও দমে ক্বিরান।
৫. মাথা মুন্ডানো কিংবা চুল ছাঁটানো।
৬. আ-ফাক্বী অর্থাৎ মীক্বাতের বাইরে থেকে আগত হাজীদের জন্য ‘তাওয়াফে বিদা’ (বিদায়ী তাওয়াফ) করা।
‘ওয়াজিবাত’ এর ব্যাপারে শরীয়তের হুকুম হচ্ছে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়  কোন ওয়াজিব বাদ পড়লে হজ্জ তো হবে; কিন্তু দম দিতে হবে, অবশ্যই কোন গ্রহণযোগ্য ওযর বশতঃ হজ্বের ওয়াজিব বাদ পড়ে থাকলে দম দিতে হবে না।

হজ্বের সুন্নাতসমূহঃ-

১. ক্বিরান ও ইফরাদকারী এবং আ-ফাক্বী হাজীদের জন্য তাওয়াফে ক্বুদূম করা ।
২. তাওয়াফে ক্বুদূমে রামাল করা । যদি এতে রামাল করা না হয়, তবে অন্ততঃ তাওয়াফে যিয়ারত বা তাওয়াফে বিদায়ে তা করে নেবে।
৩. তিনটি স্থানে অর্থাৎ ৭ জিলহজ্জ মক্কা মুকাররমায়, ৯ জিলহজ্জ মসজিদে নামরায় নামাযের পূর্বে ও ১১ জিলহজ্জ মিনায় ইমাম কর্তৃক খুতবা প্রদান করা ও হাজীদের তা শ্রবণ করা।
৪. ৮ জিলহজ্জ দিবাগত রাতে মিনায় অবস্থান করা।
৫. ৯ জিলহজ্জ সূর্য উদয়ের পরই আরাফাতের দিকে রওয়ানা হওয়া।
৬. ইমামের পরে আরফাতের ময়দান থেকে প্রত্যাবর্তন করা।
৭. আরাফাত থেকে পত্যাবর্তনের পর রাতে ফজর হওয়া পর্যন্ত মুযদালিফায় অবস্থান করা।
৮. আরাফাতে গোসল করা।
৯. মিনায় অবস্থানকালে সেখানে রাত্রিযাপন করা।

ওমরাহ

ওমরাহঃ ওমরাহকে ‘হজ্জে আসগর’ বলে। হজ্জ নির্দিষ্ট দিনগুলোতেই করতে হয়, কিন্তু ওমরাহ বছরের যে কোন সময়ই করা যায়।
ওমরার ওয়াজিবসমূহ
মাথার মুন্ডানো অথবা মাথার চুল ছাঁটানো। অপরাপর নিয়মাবলী হজ্বের মতই।
ওমরাহ করার নিয়ম:-
মীক্বাত থেকে হজ্জের ইহরামের মতই ওমরার নিয়্যতে ইহরাম বেঁধে নেবে। অতঃপর তালবিয়্যাহ পড়তে পড়তে হজ্জের নিয়মানুযায়ী মক্কা শরীফের দিকে অগ্রসর হবে। ‘বাবুস সালাম’ গিয়ে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে। এরপর রামার ও ইদ্বতিবা (এর নিয়ম তাওয়াফের বর্ণনায় আসছে) সহকারে তাওয়াফ করবে। তাওয়াফের পর মক্বামে ইব্রাহীমে দু’রাকাত নামায পড়বে। অতঃপর হাজরে আসওয়াদ-এ চুম্বন বা ইসতিলাম করে ‘বাবুস সাফা’ অতিক্রম করে সাফা ও মারওয়ার সা’ঈ করবে। অতঃপর মাথা মুন্ডাবে কিংবা ছাঁটাবে। এরপর দু’রাকআত নামায আদায় করবে। এভাবে ওমরার কাজ সুসম্পন্ন হবে।

হজ্ব ও ওমরার মধ্যে পার্থক্য

১. আফাক্বী কিংবা হেরমবাসী সকলের জন্য ওমরার ইহরাম হিল (হেরমের বাইরে) থেকে বাঁধতে হয়। কিন্তু মক্কাবাসী হজ্জের ইহরাম হেরম থেকে পরিধান করবে। অবশ্যই আফাক্বীদের সংশ্লিষ্ট মীক্বাত থেকে ইহরাম পরিধান করতে হয়।
২. হজ্জ ফরয। ওমরাহ হজ্জ নয়।
৩. হজ্জ এক নির্দিষ্ট সময়ে করতে হয় কিন্তু ওমরাহ বৎসরে যে কোন সময়ই করা যায়। তবে ৯ জিলহজ্ব থেকে ১৩ জিলহজ্ব পর্যন্ত ওমরাহ করা মাকরূহ।
৪. ওমরার মধ্যে আরাফাত ও মুযদালিফায় অবস্থান, দু’নামায এক সাথে আদায় করা ও খুতবার বিধান নেই। তাওয়াফে কুদূম এবং তাওয়াফে বিদা’ও নেই কিন্তু ওই সব কাজ হজ্জের মধ্যে রয়েছে।
৫. ওমরার মধ্যে তাওয়াফ আরম্ভ করার সময় তালবিয়াহ পড়া মওকুফ করা হয়। আর হজ্জের মধ্যে জামরাতুল আক্বাবাহ’তে রামী (কংকর  নিক্ষেপ) করার সময় মওকূফ করা হয়।
৬. ওমরাহ নষ্ট হলে বা জানাবত (ওই নাপাকী যা দ্বারা গোসল ফরয হয়।) অবস্থায় তাওয়াফ করলে (দম হিসেবে) একটা ছাগল বা মেষ জবেহ করা যথেষ্ট, কিন্তু হজ্জে যথেষ্ট নয় বরং পরবর্তী বছর পুনরায় সম্পন্ন করতে হয়।
হজ্ব ও ওমরার মধ্যে পার্থক্য
১. আফাক্বী কিংবা হেরমবাসী সকলের জন্য ওমরার ইহরাম হিল (হেরমের বাইরে) থেকে বাঁধতে হয়। কিন্তু মক্কাবাসী হজ্জের ইহরাম হেরম থেকে পরিধান করবে। অবশ্যই আফাক্বীদের সংশ্লিষ্ট মীক্বাত থেকে ইহরাম পরিধান করতে হয়।
২. হজ্জ ফরয। ওমরাহ হজ্জ নয়।
৩. হজ্জ এক নির্দিষ্ট সময়ে করতে হয় কিন্তু ওমরাহ বৎসরে যে কোন সময়ই করা যায়। তবে ৯ জিলহজ্ব থেকে ১৩ জিলহজ্ব পর্যন্ত ওমরাহ করা মাকরূহ।
৪. ওমরার মধ্যে আরাফাত ও মুযদালিফায় অবস্থান, দু’নামায এক সাথে আদায় করা ও খুতবার বিধান নেই। তাওয়াফে কুদূম এবং তাওয়াফে বিদা’ও নেই কিন্তু ওই সব কাজ হজ্জের মধ্যে রয়েছে।
৫. ওমরার মধ্যে তাওয়াফ আরম্ভ করার সময় তালবিয়াহ পড়া মওকুফ করা হয়। আর হজ্জের মধ্যে জামরাতুল আক্বাবাহ’তে রামী (কংকর  নিক্ষেপ) করার সময় মওকূফ করা হয়।
৬. ওমরাহ নষ্ট হলে বা জানাবত (ওই নাপাকী যা দ্বারা গোসল ফরয হয়।) অবস্থায় তাওয়াফ করলে (দম হিসেবে) একটা ছাগল বা মেষ জবেহ করা যথেষ্ট, কিন্তু হজ্জে যথেষ্ট নয় বরং পরবর্তী বছর পুনরায় সম্পন্ন করতে হয়।