পবিত্র ক্বোরআন ও হাদীসের আলোকে যাকাত প্রবর্তনের হিকমত ও ফযীলত

মানবতার কল্যাণের ধর্ম ইসলাম। এর প্রতিটি বিধান প্রবর্তনের ক্ষেত্রে রয়েছে অপরিসীম গুরুত্ব ও মহাত্ম্য। যাকাতও ইসলামের অন্যতম বিধান। এর গুরুত্ব ও মহিমাগুলো দেখলে সত্যিই অভিভূত হতে হয়। এ প্রসঙ্গে কিছু আলোচনা করা হচ্ছে-
১. পবিত্র ক্বোরআনে মত্তাক্বীদের বেহেশতের উত্তরাধীকারী বলা হয়েছে আর যাকাত দান করাকে মুত্তাক্বী হওয়ার আলামত বলা হয়েছে যেমন-

ا. تِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِىْ نُوْرِثُ مِنْ عِبَادِنَا مَنْ كَانَ تَقِيَّا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُوْنَ

তরজমাঃ ওই জান্নাত যার আমি আমার বান্দাদের থেকে তাকেই ওয়ারিস (মালিক) করি এবং মুত্তাক্বী যে যারা আমার প্রদত্ত সম্পদ থেকে (আমার পথে) ব্যয় করে।
২. যাকাত প্রদানের মাধ্যমে বান্দা সম্পদে এবং আত্মিকভাবে তথা যাহির ও বাতিনে বিত্রতা অর্জন করতে পারে। যেমন ক্বোরআনের বাণী-

خُذْ مِنْ اَمْوَالِهِمْ صَدَقَةُ تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيْهِمْ بِهَا

তরজমাঃ হে হাবীব! আপনি তাদের থেকে যাকাত ক্ববূল করুন যা দ্বারা তাদেরকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করেন।
৩. যাকাত দ্বারা সম্পদ বৃদ্ধি পায়। আল্লাহপাক ইরশাদ ফরমাচ্ছেন-

وَيُرْبِىْ الصَّدَقَاتِ

তরজমাঃ এবং তিনি সাদক্বাহগুলোকে বর্দ্ধিত করেন।

وَمَا اَنْفَقْتُمْ مِنْ شَىْءٍ فَهُوَ يُخْلِفُه‘

তরজমাঃ তোমরা যা কিছু ব্যয় করো তাকে তিনি বর্দ্ধিত করে অবশিষ্ট রাখেন।
৪. হাদীস পাকে রয়েছে-

مَانَقَصَ مَالٌ مِنْ صَدَقَةٍ

অর্থাৎ যাকাতের কারণে সম্পদ কমে না।
৫. যাকাতের বিধান চালু থাকলে ধনীদের পাশাপাশি গরীবরাও সুখে স্বাচ্ছন্দে বসবাস করতে পারে। কারণ যাকাত আদায়ের ফলে কারো সম্পদ কুক্ষিগত থাকে না। পবিত্র ক্বোরআন বলছে-

كَىْ لايَكُوْنَ دُوْلَةًبَيْنَ الْاَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ

৬. রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমান-

تُوْ خَذُ مِنْ اَغْنِيَآئِهِمْ فَتُرَدُّ عَلى فُقَرَآئِهِمْ

অর্থাৎ তাদের মধ্যে ধনীদের নিকট থেকে গ্রহণ করা হবে অতঃপর তোমাদের গরীবদের মধ্যে ফেরানো হবে।
৭. হাদীসে পাকে আরো এসেছে-

اَلزَّكوةُ قَنْطَرَةُ الْاِسْلَامِ

অর্থাৎ যাকাত ইসলামের সেতু।
৮. যাকাত জনকল্যাণ মূলক কাজের সহায়ক। এতে মানুষের লোভ-লালসা নিবারিত হয়। যাকাত চারিত্রিক সংশোধনে সাহায্য করে। এ বিষয় পবিত্র হাদীস থেকে একটি আকর্ষণীয় ঘটনা দেখুন-
বুযর্গ সাহাবী হযরত সাইয়েদুনা আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু প্রিয়তম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন- পূর্ববর্তী উম্মতের জনৈক খোদাভীরু ব্যক্তি একদিন মনে মনে সংকল্প করলেন রাতের অন্ধকারে অতি সংগোপনে আল্লাহর পথে দান করবেন। তিনি নিশিতে যাকাতের অর্থ নিয়ে কোন উপযুক্ত পাত্রের খোজে বের হয়ে পড়লেন। অনেক ঘোরাঘুরির পর আধাঁরে বসে থাকা এক ব্যক্তিকে দেখতে পেয়ে সঠিক পাত্র মনে করে টাকাগুলো তাকে দিয়ে দ্রুত সরে পড়লেন। ভাগ্যের পরিহাস! লোকটা ছিল একজন চোর। চুরির আশায় সে ওখানে ওৎপেতে বসেছিলো। বিনাশ্রমে এতগুলো টাকা পেয়ে সে সত্যিই আশ্চর্যান্বিত হলো। খুশীতে সে চুরি না করেই চলে গেলো। পরদিন যেকোন ভাবে একটা লোক মুখে রটে গেল যে, গত রাতে এক ব্যক্তি এক চোরের হাতে প্রচুর যাকাতের টাকা দিয়ে চলে গেল। এ রটনা ওই দানশীল ব্যক্তির কানে গেলে এ ভেবে বড়ই অনুতপ্ত হলেন যে, আমার দানগুলো চোরের হাতেই গেল!
পরদিন আবার সংকল্প করে রাতের অন্ধকারে বের হয়ে পড়লেন। অনেক দুর হাঁটতে হাঁটতে খদ্দেরের আশায় অপেক্ষমান এক ব্যভিচারিণী পতিতাকে উপযুক্ত মনে করেই মালগুলো তাকে দিয়ে চলে এলেন। পরদিন বলাবলি শুরু হয়ে গেল একজন ব্যক্তি এক বেশ্যা রমণীর হাতে যাকাতের টাকা দিয়ে গেছে! লোকটা আজও এ ভেবে বড়ই মর্মাহত হলেন- টাকাগুলো দিলাম তো একজন নষ্টা মেয়েকেই দিলাম।
আল্লাহর উপর ভরসা করে গোপনে দান করার আশায় তৃতীয় রজনীতে আবার বের হয়ে পড়লেন। আজ বহু যাচাই-বাছাই করছেন। শেষ পর্যন্ত রাতের শেষ ভাগে এক ব্যক্তিকে যথাযথ পাত্র হিসেবে চিহ্নিত করলেন। অতি সন্তর্পণে তার হাতে টাকাগুলো দিয়ে ফিরে এলেন। লোকটা ছিল এলাকার কৃপণ শ্রেণীর এক ধনাঢ্য ব্যক্তি। পরদিন চতুর্দিকে রটে গেলো, একজন ধনীর হাতে (অর্থাৎ অনুপযুক্ত লোকের হাতেই) যাকাতের টাকা দেয়া হয়েছে।
লোকটা ক্ষোভে-দুঃখে অনুশোচনা করে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন, হে আল্লাহ তোমারই শোকর। তোমার হিকমত বুঝতে পারছিনা। এত যাচাই করার পরও চোর, যেনাকারিণী আর একজন ধনীর হাতেই আমার যাকাতগুলো দিলাম। তিনি এলহাম (স্বর্গীয় প্রেরণা) প্রাপ্ত হলেন, তোমার চিন্তার কোন কারণ নেই। যেহেতু তোমার এ বদান্যতা ও গোপন দান তারা তিনজনেরই জীবন চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে। চোর চুরি বিদ্যা আর ব্যভিচারীনী পতিতাবৃত্তি ছেড়ে সারা জীবনের জন্যে সৎ বনে গেছে এবং কৃপণ ধনী ব্যক্তিটি বুঝতে পেরেছে দানশীলতার মাহাত্ম্য।
৯. মহান আল্লাহর বাণী-

وَفِىْ اَمْوَ الِهِمْ حَقٌّ مَّعْلُوْمٌ لِلسَّآئِلِ وَالْمَحْرُوْمِ

অর্থাৎ ধনীদের সম্পদে দরিদ্র ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে। একমাত্র বাধ্যতামূলক এ যাকাতের বিধান দ্বারাই এটা প্রতিষ্ঠিত হয়।
১০. যাকাত ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়নে সমাজ ও রাষ্ট্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থনীতি গড়ে ওঠার ফলে চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাই, খুন-খারাবী বন্ধ হয়ে যায়। সমাজে যাকাতদাতার একটি সম্মানজনক অবস্থান সৃষ্টি হয়। এক কথায় সুষম অর্থনৈতিক বন্টন, সামাজিক উন্নয়ন, রাষ্ট্রে পারষ্পরিক ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে যাকাতের সুদূর প্রসারী ভূমিকার কথা কে অস্বীকার করতে পারে? -সুত্রঃ গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব-

যাকাত না দেয়ার কুফল

যাকাত না দেয়ার ফলে বৈষয়িকভাবে সমাজে যেসব বিপর্যয়ের সৃষ্টি হতে পারে তাতো দিবাকরের ন্যায় সুষ্পষ্ট। যেমন ধনীদের সম্পদে গরীবের নির্ধারিত যে হক্ব রয়েছে তা প্রতিষ্ঠিত হয় না। ফলে সম্পদ একটা বিশেষ শ্রেণীর হাতেই কুক্ষিগত হয়ে যায় এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থনীতি থাকে না বিধায় একটি নিয়ন্ত্রণহীন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যাতে করে একদিকে ধনাঢ্য সবল শ্রেণীর লোকেরা দরিদ্র-দুর্বল শ্রেণীর মানুষের প্রতি স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে। অন্যদিকে গরীব জনগোষ্ঠি দারিদ্রের নিষ্পেষণে অতীষ্ঠ হয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং চুরি-ডাকাতি রাহাজানি, ছিনতাই, ‍খুন-খারাবীসহ অবর্ণনীয় চারিত্রিক পদস্খলনের শিকার হয়ে নানা ধরনের পাপাচারের দিকে ধাবিত হয়। এভাবে গোটা সমাজটা এক চর্তুমুখী অন্যায় ও অনাচারের আখড়ায় পরিণত হয়ে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়।
এছাড়াও পবিত্র ক্বোরআন ও হাদীসে যাকাত না দেয়ার ফলে ইহকালীন ও পরকালীন যে সব অকল্যাণ ও দুর্বিসহ য্ন্ত্রণার সুবিস্তৃত বর্ণনা এসেছে এর কিঞ্চিত তুলে ধরা হচ্ছে-
১. যাকাত না দেয়ার ফলে আল্লাহ তা’আলা অসন্তুষ্ঠ হন এবং পরকালে তার ঠিকানা হবে জাহান্নামে। এরশাদ হচ্ছে-

اَلَّذِيْنَ يَكْنِزُوْنَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلاَيُنْفِقُوْنَهَا فِىْ سَبِيْلِ اللهِ فَبَشِّرْ هُمْ بَعَذَابٍ اَلِيْمٍ

তরজমাঃ যারা (যাকাত ও ওয়াজিব সাদাক্বাদি আল্লাহর রাস্তায় পরিশোধ না করে অবৈধভাবে) স্বর্ণ ও রৌপ্য সঞ্চিত করে রাখে তাদেরকে বেদনাদায়ক শাস্তির সুসংসবাদ শুনিয়ে দিন। [সূরা তাওবা আয়াত-৩৪]
এ বেদনাদায়ক শাস্তির বর্ণনা সত্যিই ভয়ঙ্কর! নিম্নোল্লিখিত আয়াত এবং হাদীসগুলো গভীর মনযোগ দিয়ে পড়ুন-

يَوْمَ يُحْمى عَلَيْهَا فِى نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوْبُهُمْ وَظُهُوْرُهُمْ – هذَا مَاكَنَزْتُمْ لِاَنْفُسِكُمْ فَذُوْقُوْا مَاكُنْتُمْ تَكْنِزُوْنَ

তরজমাঃ যেদিন তা উত্তপ্ত করা হবে জাহান্নামের আগুনে অতঃপর তা দ্বারা দাগ দেওয়া হবে তাদের ললাটগুলোতে এবং পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশগুলোতে (বলা হবে) এটা হচ্ছে তাই যা তোমরা নিজেদের জন্যে পুঞ্জীভুত করে রেখেছিলে। এখন এ পুঞ্জীভূত করার স্বাদ গ্রহন করো। [সূরা তাওবা, আয়াত-৩৫]
সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী প্রখ্যাত সাহাবী সাইয়েদুনা হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, প্রিয়তম রাসূল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা’আলা যাকে ধনসম্পদ দান করেছেন, কিন্তু সে তার যাকাত আদায় করে নি; ক্বিয়ামত দিবসে  তার সম্পদকে এমন এক বিষধর সাপে রূপান্তর করা হবে, যা অত্যধিক বিষাক্ত হওয়ার কারণে তার মাথার পশম থাকবেনা এবং চোখের উপর দুটি কালো তিলক থাকবে।
ক্বেয়ামতের দিন ওই সাপ তার গলায় হারের ন্যায় পরিয়ে দেয়া হবে। সাপটি তার মুখের উভয় চোয়ালে কামড় দিয়ে ধরবে এবং বলবে, আমিই তোমার ধনসম্পদ ‘আমিই তোমার সঞ্চিত ধন ভান্ডার’। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সমর্থনে পবিত্র ক্বোরআনের এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন-

وَلَايَحْسَبَنَّ الَّذِيْنَ يَبْخَلُوْنَ بِمَآ اتهُمْ اللهُ مِنْ فَضْلِه هُوَ خيرٌ لَّهُمْ- بَلْ هُوَ شَرُّلَّهُمْ سَيُطَوَّقُوْنَ مَ بَخِلُوْ ابِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ- وَلِلهِ مِيْرَاثُ السَّموَاتِ وَالْاَرْضِ وَاللهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ خَبِيْرٌ

অর্থাৎ আর যারা কার্পণ্য  করে (আল্লাহ ও বান্দার হক্ব নিয়ে) ওই জিনিসের মধ্যে, যা আল্লাহ তাদেরকে আপন করুণা থেকে (ধন সম্পদ বা জ্ঞানাকারে) দান করেছেন তারা কখনো যেন ওই কৃপণতাকে নিজেদের জন্য মঙ্গলজনক মনে না করে বরং সেটা তাদের জন্য অকল্যাণকর। তারা যে সব সম্পদের মধ্যে কার্পণ্য করেছিলো অচিরেই ক্বিয়ামতের দিন সেগুলো তাদের গলায় শৃঙ্খল হবে এবং আল্লাহ ত’আলাই নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলের স্বত্ত্বাধিকার। আর আল্লাহ আমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবগত। [সূরা আল-ই ইমরান, আয়াত ১৮০]
হযরত ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম আলায়হিমার রাহমাহ মশহুর সাহাবী হযরত আবূ যার গিফারী রাদ্বিআল্লাহু তা’আলা আনহুর সূত্রে বর্ণনা করছেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন- যে কোন উট, গরু কিংবা ছাগল, ভেড়ার মালিকে নেসাব হওয়া সত্বেও যাকাত আদায় করবে না, ক্বিয়ামতের দিন এইগুলোকে পূর্বের চেয়েও অধিক বিরাট ও মোটা তাজা অবস্থায় উপস্থিত করা হবে। তারা ক্বিয়ামত দিবসের শেষ অবধি একের পর এক দলে দলে মালিককে পায়ের ক্ষুর দ্বারা দলিত-মথিত আর শিঙ্গের আঘাতে জর্জরিত করতে থাকবে।
২. সম্পদের যাকাত আদায় না করলে হারামে-হালালে মিশ্রণ ঘটে যায়। ফলে এ অবৈধ মালের মিশ্রণ বৈধ মালকেও ধ্বংস করে দেয়।
যেমন উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা বলেন- আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে এরশাদ করতে শুনেছি, তিনি প্রায়শ বলতেন, যাকাতের মাল যে সম্পদের সাথে মিশ্রিত হয় (সেটা ফরয যাকাত আদায় না করার কিংবা সামর্থ্যবান ব্যক্তি লোভের বশীভূত হয়ে অহেতুক যাকাত গ্রহণ করার মাধ্যমে) সেটা ওই সম্পদকে ধংস করে দেয়। অর্থাৎ হারামের মিশ্রণ হালালকেও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
৩. সর্বপরি অস্বীকারবশতঃ স্বেচ্ছায় যাকাত না দেওয়া ক্বতলযোগ্য অপরাধ এবং কুফরীর শামিল। ইসলামের প্রথম খলীফা মানবকুলে আম্বিয়ায়ে কেরামের পরে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সাইয়্যেদুনা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক্বে আকবার রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু প্রিয়তম রাসূলের ওফাত শরীফের পর যখন সে খিলাফতের দায়িত্ব নিলেন তখন খাঁটি ও নির্ভেজাল মুমিনদের থেকে পৃথক হয়ে তিনটি দল স্বস্ব চরিত্রে আত্মপ্রকাশ করলো। এক দল সরাসরি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে মুর্তাদ্দ হয়ে গেলো দ্বিতীয় দল মুর্তাদ্দ হল আসওয়াদ আনাসী মুসাইলামা কাযযাব প্রমুখ ভন্ডনবী হয়ে এবং তাদের অনুসারি হয়ে আর তৃতীয় দল মুর্তাদ্দ হল নিজেদেরকে মুসলমান পরিচয় দেয়ার আড়ালে ইসলামের একটি জরুরী বিষয় ‘যাকাত’ অস্বীকার করার মাধ্যমে। খলীফাতুর রাসূল এদের সকলের বিরুদ্ধে সফল জিহাদ করছেন; কিন্তু সবার আগে জিহাদ ঘোষনা করেছেন শোষোক অর্থাৎ যাকাত অস্বীকার কারীদের বিরুদ্ধে। যেহেতু এরা ছিলো ‘ঘরশক্র বিভীষণ’। তাই ইসলাম ও মুসলিম মিল্লাতকে মুক্ত ও সাবধান  করা সত্যিই জরুরী ছিলো। প্রথম প্রথম বাহ্যিকভাবে যাঁরা খলীফার সাথে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন তাঁরাও শেষ পর্যন্ত খলীফার অটল ও নির্ভুল সিদ্ধান্তের দিকে প্রত্যাবর্তন করেন এবং তাঁর প্রশংসা করেছেন। খলীফাতুর রাসূল ঘোষণা করলেন- বিশাল অংকের যাকাত নয় বরং একটি ছাগলের ছোট বাচ্চাও যদি যাকাতের হিসেবে আসে, আর তা পরিশোধ করতে কেউ অস্বীকার করে তাঁর বিরুদ্ধেও আমি জিহাদ ঘোষণা করলাম। কারণ, ‘যাকাত’ও ইসলামের হক্ব। ওই হক্ব কাইকেও ধ্বংস করতে দেয়া হবে না। -সুত্রঃ গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব-

যাকাতের খাতসমূহ

এ বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। প্রিয়তম রাসূল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে কতটা কঠোরতা অবলম্বন করতেন তা একটি হাদীসে পাকের বর্ণনা থেকে সহজেই অনুমান করা যায়।
হযরত যিয়াদ ইবনুল হারেস আসসুদাঈ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বর্ণনা করেন জনৈক সাহাবী রাসূলে পাকের দরবারে এসে যাকাতের জন্য প্রার্থনা করলেন। রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (সুস্থ  সবল  দেহবিশিষ্ট দেখে) বললেন, দেখ যাকাতের খাত নির্ধারণ আল্লাহ তা’আলা কোন নবী কিংবা অন্য কারো হাতে না রেখে নিজেই আটটি ভাগে ভাগ করে দিয়েছেন। তুমি সে আট প্রকারের অন্তর্ভুক্ত থাকলে আমি তোমাকে যাকাতের অংশ দিতে পারি অন্যথায় নয়। [আবু দাউদ ও মিশকাত শরীফ, কিতাবুয যাকাত]
যাকাতের ব্যয়ের খাতসমূহ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা পবিত্র ক্বোরআনে এরশাদ ফরমাচ্ছেন-

اِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَآءِ وَالْمَسَاكِيْنَ وَالْعَامِلِيْنَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوْبُهُمْ وَفِىْ الرِّقَابِ وَالْغَارِ مِيْنَ وَفِىْ سَبِيْلِ اللهِ وَابْنِ السَّبِيْلِ فَرِيْضَةً مِنَ اللهِ وَاللهُ عَلِيْمٌ حَكِيْمٌ

তরজমাঃ যাকাততো এ সব লোকেরই জন্যে যারা অভাবগ্রস্ত, নিতান্ত নিঃস্ব যারা তা সংগ্রহ করে আনে, যাদের অন্তরসমূহকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা হয়, ক্রীতদাস মুক্তির ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্তদের জন্যে, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্যে। এটা আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আর আল্লাহপাক সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। [সূরা তাওবা, আয়াত ৬০]
উদ্ধৃত আয়াতের আলোকে যাকাত বন্টনের আটটি খাত নিম্নরূপ-
১.ফক্বীরঃ অর্থাৎ যার সামান্য সম্পদ আছে কিন্তু তা দ্বারা সারা বৎসরের ব্যয় নির্বাহ হয় না। এক কথায় নেসাব পরিমাণের চেয়ে নিতান্ত কম সম্পদের মালিক যাকাত পাওয়ার উপযুক্ত।
২. মিসকীনঃ যার কিছুই নেই, একেবারে নিঃস্ব, তাকে মিসকীন বলে। এদেরকে যাকাত দেয়া যাবে।
৩. আমিলঃ অর্থাৎ যাকাত সংগ্রহের কার্যে নিয়োজি ব্যক্তি। যাকাত থেকে তাদের বেতন-ভাতা প্রদান কারা যাবে।
৪. মন আকৃষ্টকরণঃ ইসলামের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কোন অমুসলিমকে অথবা দ্বীন ও ইসলামের উপর অটল থাকার জন্যে নও মুসলিমকে যাকাতের অর্থ প্রদান করা যাবে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে এ খাতটি পরিপূর্ণভাবে প্রচলিত থাকলেও পরবর্তীতে ইসলামের ব্যপকতার ফলে কেবল নও মুসলিমদের ক্ষেত্রটি চালু রয়েছে, কিন্তু প্রথমোক্তটি রহিত হয়ে গেছে।
৫. দাস মুক্তিঃ মালিকের সাথে নির্দিষ্ট অংকের টাকার বিনিময়ে নিজেকে মুক্ত করে নেয়ার শর্তে চুক্তিবদ্ধ (পরিভায়ায় ‘মুকাতাব’) দাসকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে যাকাতের  অর্থ ব্যয় করা যাবে।
৬. ঋণ মুক্তিঃ ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে কর্জমুক্ত করতে যাকাতের অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করা যাবে।
৭. আল্লাহর পথেঃ যুদ্ধ সামগ্রী শূণ্য যোদ্ধা যারা সাজ-সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় বাহনের অভাবে জিহাদে অংশ নিতে পারছে না। যাকাত থেকে তাদেরকে সাহায্য করা যাবে।
৮. মুসাফিরঃ নিজ বাসস্থানে ধনী কিন্তু সফরে এসে রিক্তহস্ত হয়ে গেছে। এ ধরনের মুসাফিরকেও যাকাতের অর্থ দেয়া যাবে। -সুত্রঃ গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব-

নেসাব ও তদনুযায়ী যাকাতের পরিমাণ

১. স্বর্ণ ও রৌপ্যের যাকাতের নেসাবঃ-
স্বর্ণ ও রৌপ্য ব্যবসায়িক হোক কিংবা ব্যবহারিক হোক নেসাব পরিমাণ হলে সর্বাবস্থায় যাকাত ওয়াজিব। সর্বসম্মতিক্রমে স্বর্ণের যাকাতের নেসাব ২০ মিসক্বাল বা ৭.৫০ তথা (সাড়ে সাত তোলা) ৮৭.৪৫ গ্রাম। এর কম পরিমান স্বর্ণে (যদি যাকাত যোগ্য অন্য কোন মাল না থাকে) যাকাত নেই। নিসাব পরিমান স্বর্ণ পূর্ণ এক বছর কারো মালিকানায় থাকলে অর্ধ মিসক্বাল অর্থাৎ চল্লিশ ভাগের এক ভাগ স্বর্ণ অথবা তৎপরিমান সম্পদ বা অর্থ যাকাত হিসেবে ওয়াজিব হবে। এটাই স্বর্ণের একক হিসাব।
রৌপ্যঃ সকল ওলামা ও ফোক্বাহার ঐকমত্যে রূপার নেসাব হচ্ছে পাঁচ আওক্বিয়া বা দু’শ দিরহাম অর্থাৎ সাড়ে  ৫২ তোলা তথা ৬১২.২৫ গ্রাম। এর কম পরিমাণে রৌপ্যের যাকাত নেই।  এ পরিমাণ চাঁদিতে ৫ দিরহাম এবং এর চেয়ে বর্ধিত হলে প্রতি চল্লিশ দিরহামে এক দিরহাম করে বৃদ্ধি হবে। স্বর্ণ ও রৌপ্য কোনটা নেসাব পরিমাণ না থাকলে এবং যাকাত যোগ্য কোন প্রকার নগদ অর্থও না থাকলে উভয়ের সংমিশ্রণে অপেক্ষাকৃত কম পরিমাণ অর্থাৎ সাড়ে ৫২ তোলা রৌপ্যের সমান মূল্যমান দাঁড়ালে সেটাই নেসাব হিসেবে সাব্যস্ত হবে। এ ছাড়া সকল নগদ টাকা-পয়সা, রৌপ্যের নেসাবের সমমূল্য হলে তার চল্লিশভাগের একাংশ যাকাত আদায় করতে হবে।
২. গরু এবং ছাগলের বিধানঃ-
যে সব গরুর খাদ্য আর পানীয়ের ব্যয়ভার মালিক বহন করে এবং গৃহস্থালীর কাজে ব্যবহৃত হয়, এমন গরুতে যাকাত নেই। যদিও এর সংখ্যা অনেক হয়।
পক্ষান্তরে যে সব গরু স্বাধীনভাবে চারণভুমিতে বিচরণ করে ঘাস খেয়ে বেড়ায়, মালিকের পক্ষ থেকে ব্যয় নির্বাহ করতে হয় না, এগুলো দিয়ে চাষাবাদও করে না। এমন গরুর সংখ্যা ৩০ টি হলে যাকাত দিতে হয়। প্রতি ৩০ টি গরুর জন্যে একটি ১ বছর বয়সের এবং ৪০ টির জন্যে ২ বছর বয়সের মাদী বাছুর যাকাত দিতে হয়।
ছাগলঃ ছাগল ৪০ টির কম হলে যাকাত নেই। ৪০ থেকে ১২০ টি পর্যন্ত ছাগল থাকলে ১ বছরের একটি ছাগী এর উপরে ২০০ পর্যন্ত সংখ্যার জন্য দুটি ছাগল এবং ২০১ থেকে ৩৯৯ পর্যন্ত সংখ্যা হলে তিনটি আর ৪০০ টি পূর্ণ হলে ৪টি এরপর প্রতি শতানুযায়ী একটি করে ছাগল যাকাত দিতে হবে।
উটঃ কমপক্ষে পাঁচ (৫) টি উট কারো মালিকানায় এক বৎসর যাবৎ থাকলে একটি ছাগল যাকাত হিসেবে দিতে হয়। গরু, ছাগল, উট, ঘোড়া, গাধা ইত্যাদি ব্যবসার মাল হলে যে কোন সংখ্যার জন্য বছরান্তে রৌপ্যের নেসাব অনুযায়ী মূল্যমান হিসেব করে চল্লিশ ভাগের এক অংশ যাকাত আদায় করবে।
৩. ফসল-শস্য ইত্যাদিঃ-
জমিকে সাধারণতঃ দু’ভাগে বিভক্ত করে এর বিধান দেয়া হয়েছে।
১. জমি যদি প্রাকৃতিকভাবেই সিক্ত ও উর্বর হয় তবে তাতে উৎপাদিত ফসলের ১০ ভাগের ১ অংশ অর্থাৎ ওশর ওয়াজিব হয়।
২. যদি চাষীকে নিজেই সেচ দিয়ে সিক্ত করে এবং কৃত্রিম উপায়ে উর্বর বানিয়ে ফসল ফলাতে হয়, তখন উৎপাদিত ফসলেন ২০ ভাগের ১ অংশ দিতে হয়। শস্যদানা সাধারণতঃ ব্যবসার পণ্য হলে বৎসর শেষে পাঁচ ওয়াসাক্ব (যা দেশীয় ওজনে প্রায় ৩৩ মণ এবং প্রচলিত ওজনে ১২৩০ কে.জি) বিদ্যমান থাকলে রৌপ্যের নেসাব অনুযায়ী মুল্য নির্ধারণ করে ৪০ ভাগের ১ অংশ যাকাত হিসেবে আদায় করবে। -সুত্রঃ গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব-

যাকাত সম্পর্কে কিছু জরুরী মাসায়েল

মাসআলাঃ যাকাত ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের একটি। যাকাত ফরয। যাকাত অস্বীকারকারী কাফির। স্বেচ্ছায় আদায় না করা ফাসেক্বী এটা ক্বতলযোগ্য অপরাধ। সময়মত আদায় না করাও গুনাহ। শরীয়তে এমন ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। [বাহারে শরীয়ত, যাকাত অধ্যায় থেকে]
মাসআলাঃ বছর শেষে এ নিয়্যতে মূল সম্পদ থেকে কিছু মাল আলাদা করে রাখলেই যাকাত আদায় হবে না যতক্ষণ ফক্বীর মিসকীনকে মালিক বানানো হবে না। এভাবে ফক্বীরকে যাকাতের নিয়্যতে আহার করালে বা কোন ঘরে বসবাস করতে দিলেও যাকাত আদায় হবে না। যেহেতু প্রদত্ত সম্পদের মালিক বানানো হয়নি। হ্যাঁ, যদি খাদ্যবস্তু দিয়ে দেয়, যা সে ইচ্ছে হলে খাবে কিংবা নিয়ে যাবে এভাবে পরিধানের কাপড় দিলেও যাকাত আদায় হবে। [বাহারে শরীয়ত, যাকাত অধ্যায় থেকে]
মাসআলাঃ যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্যে কিছু পূর্বশর্ত রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে-
১. মুসলমান হওয়া। সুতরাং অমুসলিমের উপর যাকাত ফরয নয়। তেমনি কোন কাফির ইসলাম গ্রহণ করলে তাঁকে কাফির থাকাকালীন সময়ের যাকাত দিতে হবে না।
২. বালেগ হওয়া। অতএব না বালেগের সম্পদের যাকাত নেই।
৩. আক্বল বা জ্ঞান সম্পন্ন হওয়া। অতএব সারা বছর পাগল অবস্থায় থাকা ব্যক্তির উপর ওই বছরের যাকাত ওয়াজিব নয়।
৪. আযাদী বা স্বাধীনতা। তাই দাস-দাসী মা’যূন কিংবা মুকাতাব কারো সম্পদে যাকাত ওয়াজিব নয়।
৫. সম্পদ নিসাব পরিমাণ হওয়া।
৬. নিসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ মালিকানা এবং আয়ত্বে থাকা।
৭. এ নিসাব পরিমাণ অর্থ কর্জের অতিরিক্ত হওয়া।
৮. জীবন ধারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় সম্পদেরও অতিরিক্ত হওয়া।
৯. সম্পদ প্রবৃদ্ধিমূলক হওয়া। যেমন স্বর্ণ-চাঁদি ব্যবসার মাল এবং সা-ইমাহ অর্থাৎ এমন সব গৃহপালিত জন্তু যেগুলো স্বাধীনভাবে চারণভূমিতে বিচরণ করে ঘাস খেয়ে বেড়ায় এবং মালিকের পক্ষ থেকে কোন ব্যয় নির্বাহ করতে হয় না। মালিক সেগুলো দিয়ে চাষাবাদও করেনা।
১০. নিসাব পরিমাণ সম্পদে পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হওয়া। বছরের প্রারম্ভে শেষে নিসাব পরিপূর্ণ হয়েছে; কিন্তু মাঝখানে ঘাটতি হলে তা ধর্তব্য নয়।
মাসআলাঃ যাকাত আদায়কালীন কিংবা যাকাতের মাল পৃথক করার সময় নিয়্যত করা পূর্বশর্ত। কেউ সারা বৎসর নিয়্যতবিহীন দান-খয়রাত করতে থাকলে আর বৎসরান্তে যাকাতের নিয়্যত করলে যাকাত আদায় হবে না। -সুত্রঃ গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব-

যাকাতের বর্ণনা

আল্লাহু তা’আলা এরশাদ ফরমান- ‘তারাই কল্যাণ লাভ করে যারা যাকাত আদায় করে’। আরও এরশাদ ফরমান- “তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে আল্লাহ তা’আলা এর বিনিময়ে আরও দেবেন এবং আল্লাহ তা’আলা উত্তম রুজি প্রদানকারী।” আরও ফরমান- “যে সব লোক কৃপণতা করে তাতে, যা আল্লাহ তা’আলা স্বীয় মেহেরবাণীতে তাদেরকে দিয়েছেন, তারা যেন এটা মনে না করে যে, তা তাদের জন্য ভাল; বরং এটা তাদের জন্য অকল্যাণকর, ক্বিয়ামতের দিন ওই জিনিষের শৃঙ্খল তাদের গলায় পরানো হবে, যেটার সাথে কৃপণতা করেছিলো।” আরও ফরমান- যেসব লোক সোনা-রূপা সঞ্চয় করে এবং ওই গুলো আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে ভয়ানক আযাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দাও। যে দিন জাহান্নামের আগুনে জ্বালানো হবে এবং এগুলো দ্বারা তাদের কপালে দুপার্শ্বদেশে এবং পিঠে দাগানো হবে তাদের বলা হবে, “এটা ওটাই, যা তোমরা নিজেদের জন্য সঞ্চয় করে রেখেছিলে। তাই এখন সঞ্চয় করার স্বাদ গ্রহণ কর।” রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমায়েছেন, “যে সম্পদ বিনষ্ট হয় তা যাকাত না দেয়ার কারণেই নষ্ট হয়ে থাকে।” আরও ফরমান- “যাকাত প্রদান করে নিজেদের সম্পদসমূহকে মজবুত কিল্লাসমূহের অন্তর্ভুক্ত করে নাও। নিজেদের রোগসমূহের চিকিৎসা সাদক্বা দ্বারা কারো এবং বালা মূসীবত নাযিল হলে প্রার্থনা ও কান্নাকাটি করে সাহায্য কামনা করো” আরও ফরমায়েছেন, “আল্লাহ তা’আলা চারটি জিনিস ফরয করেছেন। সেগুলো হচ্ছে- নামায, যাকাত, রোযা ও হজ্জ। আরও ফরমায়েছেন “যে যাকাত দেয় না তার নামায কবূর হয় না।” [তাবরানী- আওসাত, আবু দাউদ, ইমাম আহমদ, কবীর]
মাসআলাঃ যাকাতের পরিমাণ হচ্ছে যাকাতের উপযোগী সম্পদের এক চল্লিশাংশ।
মাসআলাঃ যাকাত ফরয। এর অস্বীকারকারী কাফির এবং যে তা ফরয জেনেও আদায় করে না সে ফাসিক্ব। আর আদায় করার বেলায় বিলম্বকারী গুনাহগার ও সাক্ষ্য প্রদানের অনুপযোগী।[আলমগীরী ও বাহার]
শরীয়তের পরিভাষায় যাকাত বলা হয় আল্লাহর ওয়াস্তে কোন মুসলমান ফক্বীরকে সম্পদের শরীয়ত নির্ধারিত একটি অংশের মালিক বানিয়ে দেয়া।
মাসআলাঃ নিছক ভোগ করার অনুমতি দিলে যাকাত আদায় হবে না। যেমন ফক্বীরকে যাকাতের নিয়্যতে খাবার খাওয়ানো হলো। যাকাত আদায় হবে না। কারণ এর দ্বারা মালিক বানিয়ে দেয়া হলো না। তবে যদি খাবার  দিয়ে দেয়া হয় এবং তার ইচ্ছে হলে খাবে বা নিয়ে যাবে তাহলে আদায় হয়ে যাবে।
মাসআলাঃ মালিক করার জন্য এটাও প্রয়োজন যে, এমন লোককে যাকাত দেবে, যে গ্রহণ করতে জানে। অর্থাৎ এমন কাউকে যেন দেয়া না হয়, যে ফেলে দেবে বা ধোঁকা খাবে। এমনটি হলে যাকাত আদায় হবে না। যেমন ছোট শিশু বা পাগলকে যাকাত দিলে আদায় হবে না। যে শিশুর গ্রহণ করার মত জ্ঞান হয়নি তার পক্ষে তার গরীব পিতা গ্রহণ করতে পারে বা ওই শিশুর যিম্মাদার বা ওই শিশুর লালন পালনকারী গ্রহণ করতে পারে। [দুর্রুল মুখতার]
মাসআলাঃ যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছেঃ

১. মুসলমান হওয়া
২. বালেগ হওয়া
৩. বিবেকবান হওয়া
৪. পূর্ণভাবে মালিক হওয়া
৫. নেসাব ঋণমুক্ত হওয়া
৬. নেসাব ব্যবহারিক সামগ্রীর অতিরিক্ত হওয়া। সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য অথবা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ অথবা এর সমপরিমাণ টাকা
৭. সম্পদ বৃদ্ধি পাওয়া ও
৮. এক বছর অতিবাহিত হওয়া।
‘যাকাত’ শাব্দিকভাবে ‘বৃদ্ধি পাওয়া’, ‘পবিত্রতা লাভ করা’,  ‘প্রাচুর্য বা বরকতমন্ডিত হওয়া’ ইত্যদিকে বুঝায়। যাকাত দ্বারা যাকাতদাতার সম্পদের যেমন পবিত্রতা ও বৃদ্ধি আসে তেমনি আত্মার ও পরিশুদ্ধতা লাভ হয় বিধায় যাকাতকে যাকাত বলা হয়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র ক্বোরআন বলছে-

خُذْ مِنْ اَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيْهِمْ بِهَا

‘হে মাহবুব! তাদের সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ করুন’, ‘যা দ্বারা আপনি তাদেরকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করবেন। [সূরা তাওবা, আয়াত-১০৩]

يَمْحَقُ اللهُ الرِّبوا وَيُرْبِىْ الصَّدَقَاتِ

আল্লাহ তা’আলা ধ্বংস করেন সুদকে আর (উভয় জগতে) বর্ধিত করেন (সাদক্বা যাকাত ইত্যাদি) দানকে। [সূরা বাকারা আয়াত-২৭৬]

وَمَآ اَنْفَقْتُمْ مِنْ شَئٍ فَهُوَ يُخْلِفُه‘

‘আর যা কিছু তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করো, তিনি তার পরিবর্তে আরো অধিক দেবেন।’ [সূরা সাবা আয়াত- ৩৯]
পরিভাষায়- মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত সম্পদের একাংশ মুসলিম দরিদ্র ব্যক্তিকে বিনা স্বার্থে প্রদান করে মালিক বানিয়ে দেয়ার নাম ‘যাকাত’। হিজরতের পর দ্বিতীয় সালে যাকাত ফরয ও সবিস্তারে প্রবর্তিত হয়। -সুত্রঃ গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব-