জান্নাতের বিবরণ

আল্লপাকের মহব্বতে যাহারা নিজেকে বিসর্জন দিয়াছেন তাহারাই এই চির সুখময় বেহেশতের অধিকারী হইবে । যাহারা আল্লাহপাকের মহব্বতে আপন শির কোরবান করিয়াছেন, তাহারাই বেহেশতের ফল খাইবার অধিকারী হইবে । যাহারা সবসময় আল্লাহপাকের জেকেরে লিপ্ত আছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, রমজানে রোজা রাখে, রাত্রিকালে নির্জনে, নিরালায় আল্লাহপাকের ভয়ে অথবা আল্লাহপাকের মহব্বতে রোদন করে, আপন গোনাহর জন্য অনুতপ্ত হইয়া ক্রন্দন করে ও ক্ষমা প্রার্থনা করে তাহারাই চির সুখময় বেহেশতের অধিকারী হইবে ।
আল্লাহপাক বেহেশতীদিগকে উন্নতমানের পোষাক পরিধান করাইবেণ প্রত্যেক পোষাকের ভিন্ন ভিন্ন রঙ হইবে । বেহেশতবাসীদের দশ আঙ্গুলে দশটি আংটি থাকিবে, উহার প্রত্যেকটিতে বিভিন্ন লেখা অংকিত থাকিবে।

  • প্রথম আংটিতে লেখা থাকিবে, “তোমাদের উপর ছালাম ।
  • দ্বিতীয়টিতে লেখা থাকিবে, “তোমরা বেহেশতে সবসময় আল্লাহপাকের দিদার লাভ করিবে ।
  • তৃতীয়টিতে লেখা থকিবে, “যাহারা আল্লাহর ইবাদত করিয়াছে তাহারা অনন্তকাল বেহেশতে বাস করিবে ।
  • চুতুর্থটিতে লেখা থকিবে, “আল্লাহপাক তোমাদের উপর সন্তুষ্ট ।
  • পঞ্চমটিতে লেখা থকিবে, “হুরগণ সবসময় তোমাদের খিদমতে নিয়োজিত থাকবে ।
  • সপ্তমটিতে লেখা থকিবে, “তোমাদের ইচ্ছামত হুরগণ, নবী অলি ও সিদ্দিকগণের সহিত বসবাস করিতে থাক ।
  • নবমটিতে লেখা থকিবে, “তোমাদের যৌবন কখন লোপ পাইবে না ।
  • দশটিতে লেখা থাকিবে, “পরশীগণ তোমাদিগকে কষ্ট দিবে না ।

হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলিয়াছেন, আল্লাহপাক বলিয়াছেন যে আমার নেক বান্দাদিগের জন্য এমন নেয়ামত তৈরী করিয়া রাখিয়াছি, যাহা কোন চুখ দেখে নাই, কোন কর্ণ তাহা শুনে নাই, কোন মানব তাহা কল্পনাও করে নাই ।
বেহেশতের দালানসমূহের একখানা সোনার ইটের সহিত মেসক দ্বারা আর একখানা রূপার ইটের সহিত জোরা দেওয়া হইয়াছে । উহার কঙ্কর সমূহ মতি ও ইয়াকুতের তৈরী । যাহারা বেহেশতে যাইবে তাহাদের আর কোন দঃখ-কষ্টই থকিবে না । তাহাদের পায়খানা-প্রস্রাবের প্রয়োজন হইবে না, তাহাদের পোষাক-পরিচ্ছদ ময়লা হইবে না, কোন রোগ-শোক, ভাবনা-চিন্তা তাহাদিগকে স্পর্শ করিবে না । হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলিয়াছেন, বেহেশতের মধ্যে দুইটি বাগান হইবে, যাহার আসবাব-পত্র স্বর্ণের হইবে ।
বেহেশতের দালানগুলির একশতটি করিয়া তলা হইবে । যাহার একতলা হইতে অপর তলার দূরত্ব আসমান ও জমীনের দুরত্বের সমান হইবে । বেহেশতের মধ্যে সর্বাপো বড় বেহেশত হইতেছে “জান্নাতুল ফেরদাউস ।” জান্নাতুল ফেরদাউস হইতে চারটি ঝরণা প্রবাহিত হইতেছে । উহার একটি দুধের, একটি মধুর, একটি পবিত্র শরাবের এবং আর একটি স্বচ্ছ পানির । হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলিয়াছেন যে, তোমরা যদি আল্লাহ-পাকের নিকট বেহেশত চাও-তবে জান্নাতুল ফেরদাউস চাহিও ।
হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলিয়াছেন যে, যাহারা প্রথম বেহেশতে যাইবে তাহাদের চেহারা পূর্ণিমার চন্দ্রের ন্যায় উজ্জল হইবে । তাহার পরে যাহারা যাইবে, তাহাদের উজ্জলতা একটু কম হইবে । এইরূপ উজ্জলতা ক্রমশঃকম হইতে থাকিবে । বেহেশতীদের ঘর্ম ও থুথু হইতে মেসক ও জাফরানের সুগন্ধি নির্গত হইবে ।
বেহেশতের সুখ-সম্পদ ও সৌন্দর্য্যের পূর্ণ বর্ণনা করিবার ক্ষমতা মানুষের নাই, ইহা বেহেশতের অতি সামান্য পরিচয় মাত্র ।
বেহেশত আটটি ।  যথাঃ

  • জান্নাতুল খোলদ ।
  • দারুস সালাম ।
  • দারুল কারার ।
  • জান্নাতুল আদন ।
  • জান্নাতুল মাওয়া ।
  • জান্নাতুন্নায়ীম ।
  • জান্নাতুল ইলু্যয়্যি ।
  • জান্নাতুল ফেরদাউস ।

জান্নাত সম্পর্কিত কিছু হাদিস শরীফ

১নং- হযরত যায়দ ইবেন আরক্বাম (রাঃ) বলেন যে, জনৈক আহলে কিতাব হযরত রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু তা‌‌আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর খেদমতে এসে বলতে লাগলো, আপনার মতে কি জান্নাতে খানা-পিনার ব্যবস্থা আছে? তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু তা‌‌আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফরমালেন, হাঁ জান্নাতে এক ব্যাক্তিকে পনাহার ও সহবাসের ক্ষেত্রে এক শত ব্যক্তর শক্তি দেওয়া হবে।
সে বলতে লাগলো, পানাহারের পর তো পেশাব পায়খানা অবশ্যই হয়ে থাকে, তাহলে জান্নাতের মত পবিত্র স্থানে এমন নোংরা কাজ কিভাবে হবে?
তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু তা‌‌আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করলেন জান্নাতে পেশাব-পায়খানার প্রয়োজনই হবেনা, বরং মেশকের সুগন্ধি যুক্ত ঘাম বেরুবে মাত্র, এতেই খানা হজম হয়ে যাবে।

২নং- হযরত সোহাইব (রাঃ) বলেন যে, হুজুর আকরাম (সাল্লাল্লাহু তা‌‌আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেনঃ যখন জান্নাতীরা জান্নাতে এবং দোজখীরা দোজখে চলে যাবে, তখন এক জন ঘোষক ডাক দিয়ে বলবেন হে জান্নাতীগণ! আল্লাহ্ পাক তোমাদের কাছে (যে) ওয়াদা করেছিলেন, সে ওয়াদা এখন পুরন করতে চান। জান্নাতীগণ বলবেন, সেটা আবার কি? আল্লাহ্ কি আমাদের মীজান ভারী করে দেন নি? আমাদের চেহারা কি উজ্জ্বল করেন নি? আমাদেরকে কি জান্নাতে প্রবেশ করান নি? এবং দোজখ থেকে কি মুক্তি দেন নি? (তাহলে আবার কি ওয়াদা বাকী রইল)।

আল্লাহ্ রাসূল (সাল্লাল্লাহু তা‌‌আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম)  এর এরশাদ করেন, এ অবস্থায় তখন পর্দা উঠিয়ে দেয়া হবে, ফলে জান্নাতীগণ আল্লাহর দীদারে সৌভাগ্যবান হবেন। আল্লাহর কসম! জান্নাতীগণের জন্যে এর চেয়ে অধিক প্রিয় এবং উত্তম নেয়াতম কোনটাই হবেনা।

৩নং- হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু তা‌‌আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম)  এরশাদ করেছেন : জান্নাতে এক হুর আছে, যার নাম লু’বা। তাঁকে চারটি জিনিস দিয়ে বানানো হয়েছে মেশক, আস্বর, কাফুর ও জাফরান। আবার এমন জিনিসকে “মায়ে হায়ওয়ান” (এক প্রকার বিশেষ পানি) দ্বারা মিশানো হয়েছে। জান্নাতের সমস্ত হুর তার উপর আশেক। যদি সে সমূদ্রে থুথু ফেলে, তাহলে সমস্ত পানি মিষ্টি হয়ে যাবে। তার কপালে লেখা আছেঃ “যে আমাকে চায়, সে যেন তার পরওয়ার দেগারের অনুগত্য করে”।

৪নং- হযরত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু তা‌‌আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেনঃ বেহেশতে একটি বৃক্ষ আছে, যার ছায়ায় জান্নাতীরা শত বছর চললেও শেষ হবে না। জান্নাতে এমন নেয়ামত আছে, যা কোন চুক্ষ কোন দিন দেখেনি, কোন কান কোন দিন শূনে নি, কোন হ্রদয় কোনদিন কল্পনাও করত পারেনি।
যেমন এরশাদ হয়েছে –

فَلاَ تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا اُخْفِىَ لَهُمْ مِّنْ قُرَّ ةِ اَعْيُنِ

“কেউ জানেনা যে, সেখানে চোখের শীতলতা কি পরিমানে লুকায়িত আছে” জান্নাতে এক চাবুক পরিমান স্থান দুনিয়া ও দুনিয়াস্থিত সমস্ত জিনিস অপেক্ষা শ্রেয়।

৪নং- হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন যে, আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু তা‌‌আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে জানতে চেয়েছিলাম যে, জান্নাত কী জিনিস থেকে বানোনো হয়েছে ?
এরশাদ করলেন, পানি থেকে। আমরা আরজ করলাম আমাদের উদ্দেশ্য, জান্নাতের ইমারত সম্পর্কে জানা। এরশাদ করলেন, একটি ইট স্বর্ণের, আরেকটি রৌপ্যের, আর গাঁথুনীর মসল্লা মেশকের। মাটি জাফরানের, কাংকর মূতি ও ইয়াকূতের।
যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে কোন প্রকার নেয়াতম থেকেই নিরাশ ও বঞ্চিত হবে না। সে সব সময় স্থায়ী ভাবে জান্নাতে থাকবে কখনো মৃত্যু আসবে না, তার কাপড় কখনো পুরান হবে না, যৌবন কখনো শেষ হবে না
অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু তা‌‌আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করলেন : তিন ব্যক্তির দোয়া প্রত্যাখান হয় না, ১) ন্যয় পরায়ন বাদশাহ বা বিচারকের দোয়া ২) রোযাদারের ইফতারকালীন দোয়া ৩) মজলুমের দোয়া।

সুত্র: তাম্বীহুল গাফেলীন

দোজখের বিবরণ

গোনাহগার বেঈমানদের সমুচিত শাস্তি দিবার জন্য আল্লাহ পাক যে কঠিন আজাবের স্থান নির্দিষ্ট করিয়া রাখিয়াছেন তাহাই দোজখ । ইহা অতিশয় কষ্টের স্থান এবং বিভিন্ন বিভীষিকাময় জিনিষে পরিপূর্ণ। সুখ-শান্তি, আরাম-আয়েশ বলিতে সেখানে কিছুই নেই । দোজখ আল্লাহপাকে গজবের আগুণে প্রজ্জ্বলিত । যাহারা আল্লাহপাকের নাফরমানী করিয়া নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হইয়া (তওবা না করিয়া)_ মরিয়া যাইবে, তাহারা আখেরাতে অনন্তকাল দোজখের কঠোর শাস্তি ভোগ করিবে ।পবিত্র কোরআন ও হাদিস শরীফে দোজখ সমন্ধে যে সকল বিবরণ পাওয়া যায়, তাহা শুনিলে শরীর শিহরিয়া উঠে । দেজখের সমান্যতম আগুণ দুনিয়ায় আনিয়া সাত সমুদ্রের পানিতে ৭০ বার ধৌত করিলে উহার উত্তাপ দুনয়ার আগুন হইতে সহস্রগুণ বেশী থাকিবে ।দুনিয়ার সমস্ত কাষ্ঠ একত্র করিয়া প্রজ্জ্বলিত করিলে যে পরিমাণ উত্তাপ সৃষ্টি হইবে, দোজখের আগুণের উত্তাপ তাহা হইতেও সহস্রগুণ অধিক ।

একদিন হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) সাহাবীদিগকে সঙ্গে লইয়া বসিয়া কথোপকথোন করিতেছিলেন, এমন সময়ে তাহারা একটি ভীষণ শব্দ শুনিতে পাইলেন । সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করিলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ! ইহা কিসের শব্দ? তদুততরে হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলিলেন যে, ৭০ বৎসর আগে দোজখের কিনারা হইতে একখানা পাথর নীচের দিকে পড়িতে আরম্ভ করিয়াছিল, অদ্য ৭০ বৎসর পরে সেই পাথর খানা দোজখের তলায় যাইয়া ঠেকিল, ইহা তাহারই শব্দ । ইহা হইতে দোজখের গভীরতা সম্বন্ধে কিছুটা অনুমান করা যায়।

আল্লাহপাক তাহার পাক কালাম কোরআন মজিদে ফরমাইয়াছেনঃ

وَقِيْلَ لَهُمْ ذَوقُوْا عَذَابُ النَّا رِالَّذِىْ كُنْتُمْ بِهِ تَكْذِبُوْنَ

-অনুবাদঃ পাপীদিগকে বলা হইবে, তোমরা এখন দোজখের আগুণের স্বাদ গ্রহন কর ।

আল্লাহ ও রাসূলের কথায় বিশ্বাস কর নাই, কোরআন ও হাদীসকে মিথ্যা জানিয়াছিলে, দোজখের আজাবকে তখন মিথ্যা জানিয়াছিলে, এখন তাহার শাস্তি ভোগ কর; দেখ কে তোমাদিগকে সাহায্য করিতে আসে ।

হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলিয়াছেন, দোজখের লোকদিগকে জকুম নামক এক প্রকার বৃক্ষের ফল আহার করিতে দেওয়া হইবে । ইহা এত তিক্ত যে, যদি উহার এক টুকরা দুনিয়ার পানিতে ফেলিয়া দেওয়া হয়, তবে দুনিয়ার সমস্ত পানি তিক্ত হইয়া যাইবে ।এক সময়ে হযরত জিব্রাইল (আঃ) হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এর নিকট আগমণ করিলেন, তখন তাহার চোহারা অত্যন্ত খারাপ দেখাইতেছিল । হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করায় জিব্রাইল (আঃ) বলিলেন, দোজখের অগি্নভয়ে আমার অন্তকরণ থর থর করিয়া কাঁপিতেছে । হযরত নবী করীম (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বলিলেন যে, দোজখীদিগকে যে কাপড় পরিধান করান হইবে, তাহার এক ইঞ্চি পরিমাণ যদি দুনিয়ার এক প্রান্তে লটকাইয়া দেওয়া হয়, তবে তাহার দুর্গন্ধে দুনিয়ার সকল প্রাণী মরিয়া যাইবে । আর দোজখীদিগকে যে জিঞ্জির দ্বারা বন্ধন করা ইহবে, তাহার একতলা পরিমাণ যদি দুনিয়ার সর্বোচ্চ পর্বতের উপর স্থাপন করা যায়, তবে পর্বত ভষ্ম হইয়া সপ্তস্তর জমিন ভেদ করিয়া দোজখের জিঞ্জির দোজখে গিয়া পোঁছবে ।

হযরত আদম (আঃ) যখন প্রথম দুনিয়াতে আগমণ করেন, তখন তাহার খাদ্য পাকাইবার জন্য আগুনের প্রয়োজন হইলে আল্লাহপাকের আদেশে হযরত জিব্রাইল (আঃ) দোজখের দারোগা মালেকের নিকট হইতে এক মটর পরিমাণ আগুন লইয়া সপ্ত সমুদ্রে ৭০ বার ধৌত করিয়া উহা দুনিয়ার পূর্ব প্রান্তে ‘ছাহেফ’ পাহাড়ের উপর রাখিলেন । তখই পাহার আগুনের উত্তাপ সহ্য করিতে না পারিয়া পুড়িয়া ভষ্ম হইয়া গেল । শুধু ধুম রহিয়া গেল, সেই ধুম হইতেই দুনিয়ার অগ্নির সৃষ্টি । দোজখের অগ্নির তেজ এত বেশী হইবার কারণ এই যে, পাথর দ্বারা ইহার ইন্ধন দেওয়া হয় । সকলেই জানেন যে, কাঠের  আগুনের  চেয়ে পাথরের কয়লার  আগুনের তেজ বেশী । আর শুধু খাঁটি পাথর দ্বারা যে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত রাখা হইবে, তাহার তেজ আরও অধিক হওয়া স্বাভাবিক ।

দোজখীদিগকে গরম পানি ও দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ পান করিতে দেওয়া হইবে, যাহাতে তাহাদের নাড়ী-ভূড়ী সব খসিয়া পড়িবে । আর তাহাদের শরীর দুর্গন্ধে ভরিয়া যাইবে । প্রত্যহ তাহাদিগকে ৭০ বার করিয়া জ্বালাইয়া ফেলা হইবে, অতপর সেই মূহুর্তেই আবার পুর্বের মত শরীর হইয়া যাইবে । এদের সম্বন্ধে আল্লাহপাক বলিয়াছেনঃ

لاَيَمُوْ تُفِيْهَاوَلاَيَحْىَ

অনুবাদঃ ‘সেখানে তাহারা মরিবেও না, বাঁচবেও না।’সেখান হইতে উদ্ধার পাইবার জন্য তাহারা আল্লাপাকের নিকট ও শাস্তি প্রদানকারী ফেরেশতাদের নিকট কত কাকুতি মিনতি করিবে। কিন্তু কেহই তাহাদের কথায় কর্ণপাত করিবে না; বরং আল্লাহপাক তাহাদিগকে বলিবেনঃ –

فَذُوْقُوْ فَلَنْ نَذِيْدَ كُمْ اِلاَّ عَذَابَ

অনুবাদঃ হে গোণাহগারগণ! তোমরা দোজখের স্বাদ গ্রহণ কর, দোজখের শাস্তি ভোগ করিতে থাক । আমি তোমাদের আজাব শুধু বর্ধিতই করিব । দুনিয়াতে আমার কথা শুন নাই, কোরান হাদিস মান নাই, আজ তাহার ফল ভোগ কর ।

পাপীদিগকে দোজখে নিক্ষেপ করিলে তাহাদের হাত-পা বলিবে যে, দুনিয়ায় যেমন আল্লাহপাকের হুকুন মান নাই, আজ তেমন শাস্তি ভোগ কর । দোজখের উত্তাপে অস্থির হইয়া বৃষ্টি পার্থনা করিলে আকাশে কালো মেঘ দেখা দিবে এবং উহা হইতে অসংখ্য সাপ ও বিচ্ছু দোজখীদের দেহে পতিত হইতে থাকিবে । ঐ সমস্ত সাপ বিচ্ছু একবার দংশন করিলে হাজার বৎসর পর্যন্ত তাহার যন্ত্রণা থকিবে, অথচ অনবরতই উহারা তাহাদিগকে দংশন করিতে থাকিবে ।

দোজখের সাতটি স্তর । উহার একটির নিম্নে অপরটি অবস্থিত । যে স্তর যত বেশী নিম্নে তাহার উত্তাপ ও শাস্তির পরিমাণ তত বেশী । একটি হইতে অপরটির উত্তাপ ৭০ গুণ বেশী ।

প্রথম দোজখের নাম “হাবিয়া” ফেরাউন-নমরুদ প্রভূতি কাফেরগণ এই দোজখে বাস করিবে ।

দ্বিতীয় দোজখের নাম “ছায়িরা” মুশরেকগণ এই দোজখে বাস করিবে ।

তৃতীয় দোজখের নাম “ছাকার” মুর্তিপূজারীগণ এই দোজখে বাস করিবে ।

চতুর্থ দোজখের নাম “জ্বাহীম” শয়তান ও অগ্নিপূজারীগণ এই দোজখে বাস করিবে ।

পঞ্চম দোজখের নাম “হুতামা” ইহুদিগণ এই দোজখে বাস করিবে ।

ষষ্ট দোজখের নাম “ওয়াইল” আমাদের আখেরী নবীর উম্মতগণের মধ্যে যাহারা গোনাহের কাজ করিয়া বিনা তওবায় মরিয়া যাইবে, তাহারা এই দোজখে বাস করিবে ।

সুত্র: তাম্বীহুল গাফেলীন

মৃত্যুযন্ত্রনা

হযরত হাসান (রাঃ) বলেন যে, হযরত রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু তা‌‌আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম): ফরমায়েছেন, মুত্যুর কষ্ট তরবারীর তিন শত আঘাতের সমান। আরো এরশাদ করেছেন যে, মৃত্যুর যন্ত্রনা ও কষ্ট আমার উম্মতের জন্যে নসীহত স্বরূপত।

সুত্র: তাম্বীহুল গাফেলীন

মৃত্যুর বিবরণ

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলিয়াছেন —

كُلُّ نَفْسٍ ذَائِكَةُ الْمَوُتِ

“কুল্লু নাফসিন্ জায়িকাতুল মাওত ।” অর্থৎ প্রত্রেক সৃষ্টজীবই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবে ।
নিদৃষ্ট সময় শেষ হইবার সাথে সাথে প্রত্যেকের মৃত্যু উপস্থিত হইয়া জীবন প্রদীপ নিভাইয়া ফেলিবে । এ সম্পর্কে কোরআন মজিদে আল্লাহপাক আরও বলিয়াছেনঃ

اِذَجَاءَاَجْلَهُمْ لاَيَسْتَا خِرُوْنَ سَاَعَةُوَلاَيَسْتَقْدِ مُوْنَ-

অর্থাৎ -মৃত্যুকাল উপস্থিত হইলে একটি মুহূর্তও অগ্র-পশ্চাত হইবে না ।
এই মৃত্যুকে তার নির্দিষ্ট সময় হইতে কিছুকালের জন্য পিচাইয়া দেওয়ার অথবা নির্ধারিত সময়ের কিছু পূর্বে আনয়ন করা কোনটাই সম্ভব নহে । কাজেই ইচ্ছা কি অনিচ্চায়,যেভাবেই হউক আমাদের মনে এই কথা একীন রাখিতে হইবে যে, মৃত্যু অনিবার্য এবং উহার সময়ও সুনির্দিষ্ট ।

সুত্র: তাম্বীহুল গাফেলীন

পাঁচটি পাঁচটির আগে গনীমত

হযরত মায়মূন ইবনে মেহরান (রা:) থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু তা‌‌আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম)– এরশাদ করেছেন: পাঁচটিকে পাঁচের আগে গনীমত জান।* বার্দ্ধক্যের আগে যৌবনকে।
* অসুস্থতার আগে সুস্থতাকে।
* ব্যস্ততার আগে অবসরকে।
* দৈন্যতার আগে প্রাচুর্য্যকে।
* মৃত্যুর আগে যিন্দেগীকে।

সুত্র: তাম্বীহুল গাফেলীন

মৃত্যুর দৃষ্টান্ত

হযরত ওমর রাজিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হযরত কা’ব রাজিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে বললেন, মুত্যুর কিছু অবস্থা বর্ণনা করেন। বললেন, মৃত্যুকে একটি কাঁটা যুক্ত বৃক্ষ মনে করেন, যা মানুষের পেটে ঢুকিয়ে দেয়া হয় এবং এর এক একটি কাঁটা তাঁর রগে ও আঁতে বিদ্ধ হয়ে যায়, অতঃপর কোন শক্তিশালী মানুষ এটাকে জোরে টেনে বের করে, আর সে বৃক্ষ গোশত ও চামড়া ছিড়ে বের হয়ে আসে। একটাই মৃত্যুর অবস্থা।

সুত্র: তাম্বীহুল গাফেলীন

তিনটি জিনিসকে ভূলা উচিৎ নয়

তিনটি জিনিসকে কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি ভূলতে পারে না,

১) দুনিয়া এবং দুনিয়ার ধ্বাংসাত্নক পরিস্থিতি

২) মুত্যু এবং

৩) সেই সব মুসীবত, যাত্থেকে মানুষ নিরাপদ হতে পারে না।

সুত্র: তাম্বীহুল গাফেলীন

মৃত্যু মোটা হতে দেয় না

হযরত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম এরশাদ করেছেন : মৃত্যু সম্পর্কে তোমরা যতটুকু জান, যদি জীব-জন্তু তা জানত, তাহলে তোমাদের কখনো মোটা গোশত খাইবার নসীব হতো না।

সুত্র: তাম্বীহুল গাফেলীন

মৃত্যু-স্বাদ বড়ই তিক্ত

হযরত ঈসা (আঃ) এর কাছে জনৈক ব্যক্তি বললো, আপনি তো সদ্য মৃত যিন্দা করতে পারেন, তাহলে কোন পুরানো মৃতকে জীবিত করে দেখান। তাঁর দাবীর প্রেক্ষিতে তিনি সামা ইবনে নূহ (আঃ) কে আলাহ্’র হুকুমে জীবিত করলেন। সুতরাং যখন তিনি ক্ববর থেকে উঠলেন, তখন মাথার চুল ও দাঁড়ি সাদা ছিল, হযরত ঈসা (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন, এ শুভ্রতা কিভাবে হল ? আপনার সময়ে তো বার্দ্ধক্যতা ছিল না।

তিনি বললেন যে, যে আওয়াজ শুনেছি, এতে মনে করেছি যে, কিয়ামত হয়ে গেছে, তাই এটার ভয়েই চুল সাদা হয়ে গেছে। অতঃপর জানতে চাইলেন যে, আপনার ইন্তেকাল কবে হয়েছিল বললেন, চার হাজার বছর আগে, কিন্তু এখনো মুত্যুর স্বাদ শেষ হয়নি।

সুত্র: তাম্বীহুল গাফেলীন

পছন্দনীয় তিনটি জিনিস

হযরত আবুদ্দারদারহ (রাঃ) বলেন যে,

১) আমি দৈন্যতাকে পছন্দ করি যাতে, আল্লাহ্ পাকের জন্যে বিনয়ী হতে থাকি

২) অসুস্থতাকে পছন্দ করি যাতে এর মাধ্যমে আমার গুনাহ মাফ হতে থাকে।

৩) মৃত্যুকে পছন্দ করি , যাতে পরওয়ার দেগারের সাথে সাক্ষাত হয়ে যায়।

সুত্র: তাম্বীহুল গাফেলীন