দরিদ্রকে ঘৃণাকারী ব্যক্তি অভিশপ্ত

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি মালদারকে (তার মাল-সম্পদের কারনে) সম্মান করে এবং দরিদ্রকে (তার দৈন্যতার কারনে) তুচ্ছ জানে, ঘৃণা করে, সে মালউন, অভিশপ্ত।
হযরত আবুদ্দারদা (রাঃ)-এর এরশাদ
হযরত আবুদ্দারদা (রাঃ) বলেন যে, আমরা আমাদের মালদার ভাইদের সাথে ইনসাফ করি না, খাওয়া, পান করা, পরিধান করার মধ্যে আমরা সবাই সমান। শুধু এসব বস্তুর ধরনের মধ্যে পার্থক্য। মালদার ব্যক্তি তার অতিরিক্ত মাল ব্যবহার করতে পারে না, তবে হাঁ অবশ্যই দেখতে পায়। যা আমরাও দেখতে পাই, তাদের উপর এটার হেফাজত করার অতিরিক্ত দায়িত্ব আছে, মালের হিসাব নেয়া হবে, আর আমরা তা থেকে নিরাপদে থেকে যাবো।

সুত্র: তাম্বীহুল গাফেলীন

কল্যাণ থেকে দুরে রাখে চারটি অভ্যাস

জনৈক বিজ্ঞ ব্যক্তি বলেছেন, যে ব্যক্তির মধ্যে চারটি বিষয় পাওয়া যাবে, সে সমস্ত কল্যাণ থেকে বঞ্চিত থাকবে।
১। স্বীয় অধীনস্তদের উপর জুলুম ও অতিরঞ্জিত করা
২। পিতা-মাতার নাফরমানী করা
৩। গরীব লোকদের তুচ্ছ জানা
৪। ফকীর-মিসকীনদের লজ্জা দেয়া।

সম্পদ, বিদ্বেষ ও শত্রুতা

আমীরুল মু’মিনীন হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) এর নিকট যখন কাদেসিয়া যুদ্ধে বিজয়ী মালে গনীমত আনা হল, তখন তিনি তা উলট-পালট করে দেখতে ছিলেন এবং কাঁদতে ছিলেণ।
হযরত আবদুল ইবনে আউফ (রাঃ) আরজ করলেন, হে আমীরুল মু’মেনীন! এটা তো আনন্দ ও খুশীর সময়, দুঃখ ও ব্যথিত হবার তো সময় নয়। বললেন, হাঁ! তবে যে জাতির মধ্যে মাল এসে যায়, যে জাতির মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি অপরিহার্য হয়ে পড়ে। (হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি মাল সম্পদের অপরিহার্য ফসল, যা রাত দিন বাস্তব দেখা যাচ্ছে।)
হযরত রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু তা‌‌আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম)– এরশাদ করেছেন- প্রত্যেক উম্মতের জন্যে একটি ফেতনা আছে, আমার উম্মতের ফেতনা হলো মাল।
তিনি হযরত রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু তা‌‌আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম)– আরো ফরমায়েছেন, আল্লাহ্ তা’আলার সবচে প্রিয়তম বান্দাহ হলো গরীব ও দরিদ্রগণ, এ জন্যেই অধিকাংশ নবীগণ আলাইহিমুচ্ছালাম সম্পদশালী ছিলেন না।
আহাদীছ

ا) قَالَرَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسُلَّمَ مَاذِئْبَانِ جَائِعَانِ اَرْسِلاًقِئْ غَنَمٍ بِاَفِسَدٍ لَّهَا مَنْحَرَضَ الْمَاك عَلَى الْمَالُ وَالشَّرَفُ  لِدِيْنِه – ترمذى شريف

১। “হযরত রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু তা‌‌আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম)– এরশাদ করেছেন- দুটি ভূখার্ত নেকড়ে বাঘ বকরীর জন্যে এতটুকু বিপজ্জনক নয়, যতটুকু মাল ও সম্পদের লোভ দ্বীনের জন্যে বিপজ্জনক”। তিরমিজী শরীফ

ب) يَهْرَمُ ابْنِ اَدَمُ وَيَشُبُّ مِنْهُ اِشْنَانِ الْحَرلَصِ عَلَى الْمَال وَالْحَرَص عَلَى الْعُمَرُ – (متفق عليه)

২। মানুষ বুড়ো হতে থাকে কিন্তু তার দুটি জিনিস জওয়ান হতে থাকে- ক) মাল বৃদ্ধির লোভ ও খ) অধিক বয়স বৃদ্ধির লোভ। – বুখারী ও মুছলিম শরীফ।

ت) لاَيَزَالُ قَلْبُ الْكَبِيْرُ شَابًّا قِىْ اِثْنَيْنِ قِىْ حُبِّالدُّنْيَا وَطَوْلُ الْمَامِلُ (متفق علييه)

৩। বৃদ্ধ মানুষের মন সব সময় দুটি বিষয়ে যুবক থাকে খ) দুনিয়ার মুহব্বত ও খ) দীর্ঘ আকাংখা।- বুখারী ও মুসলিম শরীফ।

ث) اُعْذُرُ اللهِ الَى اَمَرَاَخَرَاَجِلَّه‘ حَتَّى بَلِّغْه‘ سِتِّيِنَ سَنَةً (بخارى)

৪। যে ব্যক্তির বয়স আল্লাহ্ তা’আলা ষাট বছরে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, তার ওজর করার অবকাশ নাই।
অর্থাৎ মানুষ যৌবন কালে এই ধারণা করে যে, এখনো তো বার্ধ্যক্য কাল অনেক দূরে আছে, বার্ধক্য কালের নিদর্শন প্রকাশ পেলেই তওবা করে নেবো। কিন্তু বয়স যখন ষাট বছরে পৌঁছে যায়, তখন তার জন্যে কোন ওজর করার সুযোগ থাকেনা, যদ্দরুন সে তওবা করতে বিলম্ব করতে পারে। সুতরাং তাকে তৎক্ষনাৎ তওবা করার প্রতি মানোনিবেশ করা উচিত, কর্তব্য।

মিথ্যা

হযরত রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু তা‌‌আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন: সত্য বলাকে নিজের উপর অপরিহার্য করে নাও। কেননা সত্যবাদীতা নেকীর দিকে আর নেকী জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।

যে মানুষ সত্য বলে আর এ জন্যে চেষ্ট করতে থাকে, এতে সে আল্লাহ্ তা’আলার কাছে সত্যবাদীদের তালিকায় লিপিবদ্ধ হয়ে যায়।

 মিথ্যা থেকে বিরত থাক, কেননা মিথ্যা গুনাহ ও অশ্লীলতার দিকে আর গুনাহ এবং অশ্লীলতা জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।

যে মানুষ মিথ্যা বলতে থাকে আর এ দিকে আল্লাহ্’র কাছে তার নাম মিথ্যাবাদীদের তালিকায় লিপিবদ্ধ হয়ে যায়।

হযরত লুক্বমান (রাঃ) এর উক্তি

হযরত লক্বমান (রাঃ) এর কাছে কেউ জিজ্ঞেস করেছিল : আপনি এত উচ্চ মক্বাম ও মরযাদা কিভাবে হাসিল করেছেন? বললেন, সত্যবাদীতাও আমানতদারী অবলম্বন এবং বেহুদা বিষয় পরিত্যাগ করার মাধমে।

সুত্র: তাম্বীহুল গাফেলীন

হিংসা

হযরত রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু তা‌‌আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এরশাদ করেছেনঃ হিংসা ও বিদ্বেষে নেকী সমূহ এমন ভাবে খেয়ে যায় (অর্থাৎ নষ্ট হয়ে যায়, মেমন ভাবে আগুন লাকড়ীকে খেয়ে ফেলে (অর্থা ভস্মিভূত করে ফেলে)।

হযরত রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু তা‌‌আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এরশাদ করেছেনঃ তিনটি বিষয়ে অধিকাংশ মানুষ লিপ্ত।

১। কু-ধারনা ২। হিংসা ৩। কোন কাজ থেকে অশুভ লক্ষণ মনে করা।

কোন এক জন আরজ করলেঃ

এ তিনটি বিষয়ের অনিষ্টতা থেকে বাঁচার উপায় কি? এরশাদ করলেন- ১। কারো কাছে স্বীয় হিংসা প্রকাশ করবে না এবং যার উপর হিংসা করা হয়, তার দোষ বর্ণনা করবে না।

২। কোথাও যেতে রাস্তায় কাক বা অনিষ্টকারী পোকা ইত্যাদী দেখলে বা নিজের কোন অঙ্গ (চোখ, কান ইত্যাদি) নড়ে উঠলে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করবেনা বরং অতিক্রম করে যাবে, (অর্থাৎ এসব জিনিস দেখে ভাবী অশূভ লক্ষণ মনে করবে না এবং যাত্রাও বন্ধ করবেনা। এভাবেই তুমি এসবের অনিষ্টতা থেকে বেঁচে থাকবে।

সুত্র: তাম্বীহুল গাফেলীন

হিংসার পরিনাম প্রথমে হিংসুকের উপর পতিত হয়

ফকীহ আবুল লাইছ (রহঃ) বলেছেন : হিংসা সমস্ত মন্দ কাজ থেকে অধিক ধ্বংসাত্নক। কারণ যার প্রতি হিংসা করা হয়, তার উপর হিংসার প্রভাব প্রতিভাত হইবার আগে হিংসুক নিজে পাঁচটি শাস্তিতে পতিত হয়ে যায় –

১। এমন চিন্তা-পেরেশানী হয়, যার কোন অন্ত নেই

২। এমন মুসীবত হয়, যাতে কোন ছওয়াব নেই

৩। চুতুর্দিকে শুধু নিন্দাই নিন্দা হয়, কোথাও কোন প্রশংসা হয় না

৪। আল্লাহ তা’আলার অসন্তষ্টী পতিত হয়

৫। তার জন্যে তওফিকের দ্বার বন্ধ হয়ে যায়।

সুত্র: তাম্বীহুল গাফেলীন

হিংসুক আল্লাহ্’র নেয়ামতের দুশমন

হযরত রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু তা‌‌আলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এরশাদ করেছেনঃ কিছু লোক আল্লাহ্’র নেয়ামতের দুশমন হয়, জনৈক ব্যক্তি আরজ করলেন, এরা কারা? এরশাদ করলেন, সুখ-সাচ্ছন্দশীল ব্যক্তিদের প্রতি যারা হিংসা করে।

হিংসার ব্যাধিতে সবচে আলেমগণ বেশী আক্রান্ত

হযরত মালেক ইবনে দীনার (রহঃ) বলেন : আমি সমস্ত দুনিয়ার উপর ওলামাদের স্বাক্ষী গ্রহণ করবো, কিন্তু ওলামাদের স্বাক্ষী ওলামাদের ব্যাপারে গ্রহণ যোগ্য নয়। কারণ আমি ওলামাদের মধ্যে সবচে বেশী হিংসার প্রবনতা পেয়েছি।

হিংসুক আল্লাহ্ পাকের মুকাবেলা করে

কোন বিজ্ঞ হাকীম বলেন যে, হিংসুক ব্যক্তি পাঁচ ভাবে আল্লাহ্’র মুকাবেলা করে –
১। সে অন্যজনের উপর আল্লাহ্’র প্রদত্ত নেয়ামত সমূহ ঘৃণা করে (প্রতিদ্বন্ধিতা করে)।
২। স্বীয় হিংসার মাধ্যমে আল্লাহ্ পাকের বন্টন কৃত নেয়ামত সমূহের প্রতি অসন্তষ্টী প্রকাশ করে (সে আল্লাহ্’র বন্টনকে সঠিক মনে করে না)।
৩। সে আল্লাহ্’র করুনা মেহেরবানীর সাথে কৃপনতা করে (অর্থাৎ আল্লাহ যাকে ইচ্ছে, তার উপরই মেহেরবানী করেন, কিন্তু সে এটা চায় না)।
৪। সে আল্লাহ্’র ওলীকে অপমান করে (অর্থাৎ আল্লাহ পাক যার উপর অনুগ্রহ করেন, সে এটা অবসানের আকাংখা করে, তাই এটা মূলত তাকে অপমান করার শামিল।
৫। সে আল্লাহ্ পাকের দুশমন ইবলীশের সাহায্য করে, (কেননা প্রত্যেকে আল্লাহ্ তা’আলার অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করা ইবলীশের জীবনের স্বাদ, ও মুখ্য উদ্দেশ্য। তাই তাকে সহায়তা করা হলো।

সুত্র: তাম্বীহুল গাফেলীন

ক’টি চমৎকার উক্তি

হযরত আহনাফ ইবনে ক্বায়স (রহঃ) বলেন যে-
১। হিংসুকের কখনো প্রশান্তি হাসিল হয় না।
২। কৃপনের ভিতর কখনো কোমল হৃদয় হয় না।
৩। সংকীর্ণ অন্তরের অধিকারী মানুষের কোন বন্ধু হয় না।
৪। মিথ্যাবাদীর মধ্যে মানবতা হয় না।
৫। খেয়ানতকারী ব্যক্তি কখনো নির্ভর যোগ্য হয় না।
৬। অসৎ চরিত্রবান ব্যক্তির মধ্যে ভালবাসা হয় না।
কারো উপরই হিংসা করা উচিৎ নয়
হযরত মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রহঃ) বলেন যে, আমি দুনিয়ার ব্যাপারে কারো উপর কখনো হিংসা করি নাই। কেননা প্রত্যেক ব্যক্তির দু’টি দিক আছে –
১। যদি সে নেক ও জান্নাতী হয়, তাহলে তার উপর কি ভাবে হিংসা করা যায়?
২। আর যদি সে জান্নামী হয়, তাহলে জাহান্নামীর উপর হিংসা করার অর্থই হয় না।

সুত্র: তাম্বীহুল গাফেলীন