বালেগ হওয়ার পরিচয়

ছেলে মেয়েদের বয়স বাড়িতে বাড়িতে এক পর্যায়ে তাহাদের দেহে কতকগুলো লক্ষণ প্রকাশ পায়। তখন তাহারা বালেগ বা বালেগা বলিয়া বিবেচিত হয়। বয়ঃপ্রাপ্তির সাথে সাথে শরীয়তের যাবতীয় বিধি নিষেধ তাহাদের উপর বর্তায় । নিম্নে বালেগ বালেগার পরিচয় বর্ণনা করা হইতেছে।
ইসলামী শরীয়ত অনুসারে স্বপ্নদোষ হওয়াই ছেলেদের বালেগ হওয়ার পরিচয়। স্বপ্নযোগে কাহারও সহিত সঙ্গম করার ফলে বীর্যপাত হইলে তখন হইতেই ছেলেকে বালেগ বলিয়া ধরিতে হইবে।
ইহা ছাড়া আরও কয়েকটি লক্ষণ আছে যাহা সাবালকত্বের সাক্ষ দেয়। যথা দাড়ি গোফ গজানো নাভীর নিম্নদেশে লোমোদগম হওয়া এবং গলার স্বর পরিবর্তিত হওয়া বয়ঃপ্রাপ্তিকালে দেহে এইসব পরিবর্তন অবর্শ্যই হয় কিন্তু জলবায়ু ভৌগোলিক পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যগত কারণে ও এইসব হইতে পারে বলিয়া বালেগ হওয়ার  ব্যাপারে শরীয়তে এইগুলির এতেবার নাই।
মেয়েদের বালেগা হওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরিচয় হইল হায়েজ বা ঋতুস্রাব। বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া বিভিন্ন রকম এই কারণে বিভিন্ন দেশের মেয়েরা বিভিন্ন বয়সে বালেগা হইয়া থাকে। আমাদের দেশের আবহাওয়া গরম বলিয়া এখানকার মেয়েরা সাধারণতঃ এগার হইতে ষোল বৎসর বয়সের সধ্যে ঋতুবর্তী হইয়া থাকে। বয়সের এই তারতম্যের কারণে ইসলাম এই ব্যাপারে একটা বয়ঃসীমা নির্ধারিত করিয়া দিয়াছে। তাহা এই যে নয় বৎসর বয়সের পূর্বে কোন মেয়েকে বালেগা ধরা হইবে না। যদি নয় বৎসর হওয়ার পূর্বে রক্তস্রাব হয় তবে উহা রোগ বলিয়া গণ্য হইবে। আর সর্বোচ্চ মেয়াদ পনের বৎসর হওয়ার পরও কোন মেয়ের হায়েজ না হইলে তাহাকেও বালেগা বলিয়া ধরিতে হইবে। কোন মেয়ের এখনও হায়েজ চালু হয় নাই কিন্তু সে স্বপ্নে কোনও পুরুষের সহিত সঙ্গম করিতে দেখিলে এবং উহাতে লজ্জা পাইয়া থাকিলে ও মণি বাহির হইয়া থাকিলে তাহাকেও বালেগা বলিয়া গণ্য করিতে হইবে। স্তনযুগল উন্নত হওয়া যোনীদ্বার প্রশস্ত হওয়া নাভীর নিম্নদেশে লোম গজালো এই গুলোকেও মেয়েদের বালেগা হওয়ার লক্ষণ বলা হয়। কিন্তু শরীয়তে এইগুলি নির্ভরযোগ্য নয়।

হায়েজ

বালেগা স্ত্রীলোকের গর্ভ হইতে বিনা কষ্টে মাসে মাসে যে রক্তস্রাব হয় উহাকে হায়েজ বলে। ৯বৎসর হইতে ৫৫ বৎসর বয়স পর্যন্ত স্ত্রীলোকের যে কোন রং এর রক্তস্রাবকে হায়েজ বলা হয়।
নয় বৎসরের কম বয়স্কা বলিকার রক্তস্রাব হইলে  তাহা হায়েজ নয় বৎসরের কম বয়স্কা বালিকার রক্তস্রাব হইলে তাহা হায়েজ বলিয়া গণ্য হইবে না। পঞ্চান্ন বৎসরের ঊর্ধ্ব বয়স্কা স্ত্রীলোকের খুব বেশী লাল কিংবা কাল বর্ণের রক্তস্রাব হইলে উহা হায়েজ নয় বরং এস্তেহাজা তবে পঞ্চান্ন বৎসর বয়সের পূর্বেও যদি সবুজ মেটে বা হলদে রঙের রক্তস্রাব হওয়ার অভ্যাস থাকিয়া থাকে তাহা হইলে পরের ঐ রক্তকেও হায়েজ ধরিতে হইবে। পূর্বের অভ্যস্ত বর্ণের বিপরীত বর্ণ  হইলে হায়েজ ধরা হইবে না।

হায়েজের সময়সীমা ও মাসয়ালা

হায়েজের নিম্নতম মুদ্দত তিনদিন তিনরাত্রি এবং সর্বোচ্চ মুদ্দত দশদিন দশরাত্রি। দুই হায়েজের মধ্যখানে কমপক্ষে পনের দিন পাক থাকে। অধিক কালও পাক থাকিতে পারে, ততদিনই পাক রহিল বলিয়া বুঝিতে হইবে।
কোন স্ত্রীলোকের মাসে ৩ দিন কি ৫ দিন করিয়া হায়েজ হওয়ার নিয়ম  ছিল কিন্তু কোন একবার ৮কি ৯ দিন পর্যন্ত রক্তস্রাব হইল। এমতাবস্থায় এই ৮/৯ দিনকে হায়েজ ধরিতে হইবে এবং মনে করিতে হইবে পূর্বের নিয়ম পরিবর্তন হইয়া গিয়াছে। কিন্তু দশদিনের বেশী  সময় পর্যন্ত রক্ত দেখা গেলে পূর্বের নিয়মানুসারে ৩ কি ৫ দিন হায়েজ ধরিয়া বাকী দিনগুলিকে এস্তেহাজা বা বিমারী মনে করি এবং ঐ সকল দিনের কাজা নামাজ পড়িবে।
যে স্ত্রীলোকের হায়েজের কোন নিয়ম নাই যেমন কোন মাসে ৭ দিন আবার কোন মাসে ৮ দিন এই রূপ অনিয়মিত অবস্থায় যে মাসে যে কয়দিন রক্তস্রাব দেখিবে সেই কয়দিনই হায়েজের মধ্যে গণ্য হইবে। হায়েজওয়ালী মহিলার কোন মাসে দশদিনের বেশী সময় রক্তস্রাব দেখিলে উহার পুর্ববর্তী মাসে যে কয়দিন হায়েজ ছিল সেই কয়দিন হায়েজের মধ্যে গণ্য করিয়া বাকী কয়দিনকে এস্তেহাজা বা বিমারী ধরিবে।

নেফাস এর বর্ণনা

স্ত্রীলোকের সন্তান প্রসবের পর গর্ভ হইতে যে রক্তস্রাব হয় উহাকে নেফাস বলে। নেফাসের সর্বোচ্চ মুদ্দত ৪০ দিন কম মুদ্দতের কোন সীমা নাই। ৪০ দিনের বেশী রক্ত দেখা গেলে উহাকেও এস্তেহাজা বা রোগ মনে করিতে হইবে।
নেফাসের রক্ত ১৫,২০,২৫,২৭,৩০,৩৫ দিনের মধ্যে কিংবা উক্ত মুদ্দতের মধ্যে যে কোনদিন বন্ধ হইতে দেখিলে তখন গোসল করিয়া নামাজ দোআ পড়া ইত্যাদি কার্য করিবে।

হায়েজ ও নেফাস অবস্থার হুকুম

হায়েজ অথবা নেফাস ওয়ালী স্ত্রীলোক মসজিদে প্রবেশ করিতে পারিবে না। কোরআন শরীফ বা উহার কোনও আয়াত স্পর্শ করিতে বা মুখস্ত পড়িতে পারিবে না। তবে কোরআন শরীফ গেলাফে জড়ানো থাকিলে গেলাফের উপর দিয়া স্পর্শ করা দুরুস্ত আছে। অনেকে নাপাক অবস্থায় পরনের শাড়ী দোপাট্রা বা কামিজের আচল দ্বারা কোরআন শরীফ স্পর্শ করে। ইহাও দুরুস্ত নাই। পরিধানের কাপড় ছাড়া আলাদা কোন পাক কাপরে সাহায্যে স্পর্শ করিলে দুরুস্ত হইবে।
যে মহিলা ছাত্র ছাত্রীদের কোরআন শরীফ পড়ান নিজের হায়েজ নেফাসের অবস্থায়ও যদি তাহার পড়াইতে হয় তবে শুধু বানান পড়াইবেন মতন পড়াইবেন না। আর যদি মতনও পড়াইতে  হয় তবে প্রত্যেক আয়াতকে আলাদা আলাদা অংশ করিয়া দুই এক শব্দের পরপর নিঃশ্বাস ছাড়িয়া পড়াইবেন যেন প্রতিটি অংশ কোরআন শরীফের ক্ষুদ্রতম আয়াত  অপেক্ষা ছোট থাকে। ছোট আয়াতের সমান হইয়া গেলে গুনাহগার হইবে।
কিন্তু আলহামদু লিল্লাহে সুরা কিংবা কোরআন শরীফ উল্লেখিত কোন দোয়ার আয়াত যেমন রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাও অথবা রাব্বানা জালামনা আনফুসানা ইত্যাদি দোয়ার নিয়তে পড়িলে গুনাহগার হইবে না। তেলাওয়াতের নিয়তে পড়িলে গুনাহগার হইবে।
হায়েজ কিংবা নেফাসের সময়ে নামাজ রোজা কাবা শরীফের তাওয়াফ নিষিদ্ধ। হায়েজের সময়ে যে কয় ওয়াকতের নামাজ পড়িতে না পারে পাক হওয়ার পর সেইগুলির কাজা করিতে হইবে না। কিন্তু রোজা মাফ নাই। রোজার কাজা করিতে হইবে।
হায়েজ চলাকালে নামাজের সময় হইলে ওজু করিয়া কোন পাক জায়গায় কিছুক্ষণ চুপচাপ বসিয়া থাকিয়া আল্লাহ আল্লাহ করিবে নামাজ পড়িবে না। এইরূপ করা মুস্তাহাব।
হায়েজ নেফাসের কালে স্বামী স্ত্রীর সঙ্গম হারাম এবং এই সময়ে স্ত্রীর হাটু হইতে নাভী পর্যন্ত স্থানের প্রতি নযর দেওয়াও মাকরূহে তাহরিমী। হায়েজ কিংবা নেফাসের সময়ে হালাল করিলে কবীরা গুনাহ হইবে। তবে স্ত্রীর হাটু হইতে নাভী পর্যন্ত ছাড়া শরীরের অন্যান্য অঙ্গ স্পর্শ করা একত্রে আহার করা ও একত্রে শয়ন করা দুরুস্ত আছে।  স্ত্রীর নাপাক অবস্থায় স্ত্রী সঙ্গমের সুযোগ না পাওয়ায় যদি স্বামী যৌবনের উম্মদনায় ও কামরিপুর তাড়নায় এমনই অস্থির হইয়া পড়ে  যে অন্যত্র পাপ করিয়া ফেলিতে পারে তবে স্ত্রীর রাণে ঘষিয়া অথবা তাহার দ্বারা হস্ত মৈথুন করাইয়া কামোত্তজনা দমন করিতে পারিবে।
হায়েজ নেফাসের সময়ে এক টুকরা কাপড় কয়েক পরতে ভাজ করিয়া (অথবা ডাক্তারখানা হইতে মেডিকেটেড তুলা আনিয়া) উহা গুপ্তাঙ্গের মুখে রাখিয়া দিবে এবং উহার উপরিভাগে একখানি লেংটি পরিবে যেন রক্তের দাগ বাহিরে প্রকাশ না পায়।
এস্তেহাজা অর্থাৎ রক্তস্রাবের বিমারীতে নামাজ রোজা ইত্যাদি সবই করিতে পারিবে। কেননা এই প্রকার স্ত্রীলোকেরা মাজুর বলিয়া বিবেচিত।
নেফাসের সময় নামাজ রোজা কোনটাই করিতে পারিবে না। ভাল হইলে রোজার কাজা করিতে হইবে। নামাজের কাজা করিতে হইবে না।