পবিত্র ক্বোরআন ও হাদীসের আলোকে যাকাত প্রবর্তনের হিকমত ও ফযীলত

মানবতার কল্যাণের ধর্ম ইসলাম। এর প্রতিটি বিধান প্রবর্তনের ক্ষেত্রে রয়েছে অপরিসীম গুরুত্ব ও মহাত্ম্য। যাকাতও ইসলামের অন্যতম বিধান। এর গুরুত্ব ও মহিমাগুলো দেখলে সত্যিই অভিভূত হতে হয়। এ প্রসঙ্গে কিছু আলোচনা করা হচ্ছে-
১. পবিত্র ক্বোরআনে মত্তাক্বীদের বেহেশতের উত্তরাধীকারী বলা হয়েছে আর যাকাত দান করাকে মুত্তাক্বী হওয়ার আলামত বলা হয়েছে যেমন-

ا. تِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِىْ نُوْرِثُ مِنْ عِبَادِنَا مَنْ كَانَ تَقِيَّا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُوْنَ

তরজমাঃ ওই জান্নাত যার আমি আমার বান্দাদের থেকে তাকেই ওয়ারিস (মালিক) করি এবং মুত্তাক্বী যে যারা আমার প্রদত্ত সম্পদ থেকে (আমার পথে) ব্যয় করে।
২. যাকাত প্রদানের মাধ্যমে বান্দা সম্পদে এবং আত্মিকভাবে তথা যাহির ও বাতিনে বিত্রতা অর্জন করতে পারে। যেমন ক্বোরআনের বাণী-

خُذْ مِنْ اَمْوَالِهِمْ صَدَقَةُ تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيْهِمْ بِهَا

তরজমাঃ হে হাবীব! আপনি তাদের থেকে যাকাত ক্ববূল করুন যা দ্বারা তাদেরকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করেন।
৩. যাকাত দ্বারা সম্পদ বৃদ্ধি পায়। আল্লাহপাক ইরশাদ ফরমাচ্ছেন-

وَيُرْبِىْ الصَّدَقَاتِ

তরজমাঃ এবং তিনি সাদক্বাহগুলোকে বর্দ্ধিত করেন।

وَمَا اَنْفَقْتُمْ مِنْ شَىْءٍ فَهُوَ يُخْلِفُه‘

তরজমাঃ তোমরা যা কিছু ব্যয় করো তাকে তিনি বর্দ্ধিত করে অবশিষ্ট রাখেন।
৪. হাদীস পাকে রয়েছে-

مَانَقَصَ مَالٌ مِنْ صَدَقَةٍ

অর্থাৎ যাকাতের কারণে সম্পদ কমে না।
৫. যাকাতের বিধান চালু থাকলে ধনীদের পাশাপাশি গরীবরাও সুখে স্বাচ্ছন্দে বসবাস করতে পারে। কারণ যাকাত আদায়ের ফলে কারো সম্পদ কুক্ষিগত থাকে না। পবিত্র ক্বোরআন বলছে-

كَىْ لايَكُوْنَ دُوْلَةًبَيْنَ الْاَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ

৬. রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমান-

تُوْ خَذُ مِنْ اَغْنِيَآئِهِمْ فَتُرَدُّ عَلى فُقَرَآئِهِمْ

অর্থাৎ তাদের মধ্যে ধনীদের নিকট থেকে গ্রহণ করা হবে অতঃপর তোমাদের গরীবদের মধ্যে ফেরানো হবে।
৭. হাদীসে পাকে আরো এসেছে-

اَلزَّكوةُ قَنْطَرَةُ الْاِسْلَامِ

অর্থাৎ যাকাত ইসলামের সেতু।
৮. যাকাত জনকল্যাণ মূলক কাজের সহায়ক। এতে মানুষের লোভ-লালসা নিবারিত হয়। যাকাত চারিত্রিক সংশোধনে সাহায্য করে। এ বিষয় পবিত্র হাদীস থেকে একটি আকর্ষণীয় ঘটনা দেখুন-
বুযর্গ সাহাবী হযরত সাইয়েদুনা আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু প্রিয়তম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন- পূর্ববর্তী উম্মতের জনৈক খোদাভীরু ব্যক্তি একদিন মনে মনে সংকল্প করলেন রাতের অন্ধকারে অতি সংগোপনে আল্লাহর পথে দান করবেন। তিনি নিশিতে যাকাতের অর্থ নিয়ে কোন উপযুক্ত পাত্রের খোজে বের হয়ে পড়লেন। অনেক ঘোরাঘুরির পর আধাঁরে বসে থাকা এক ব্যক্তিকে দেখতে পেয়ে সঠিক পাত্র মনে করে টাকাগুলো তাকে দিয়ে দ্রুত সরে পড়লেন। ভাগ্যের পরিহাস! লোকটা ছিল একজন চোর। চুরির আশায় সে ওখানে ওৎপেতে বসেছিলো। বিনাশ্রমে এতগুলো টাকা পেয়ে সে সত্যিই আশ্চর্যান্বিত হলো। খুশীতে সে চুরি না করেই চলে গেলো। পরদিন যেকোন ভাবে একটা লোক মুখে রটে গেল যে, গত রাতে এক ব্যক্তি এক চোরের হাতে প্রচুর যাকাতের টাকা দিয়ে চলে গেল। এ রটনা ওই দানশীল ব্যক্তির কানে গেলে এ ভেবে বড়ই অনুতপ্ত হলেন যে, আমার দানগুলো চোরের হাতেই গেল!
পরদিন আবার সংকল্প করে রাতের অন্ধকারে বের হয়ে পড়লেন। অনেক দুর হাঁটতে হাঁটতে খদ্দেরের আশায় অপেক্ষমান এক ব্যভিচারিণী পতিতাকে উপযুক্ত মনে করেই মালগুলো তাকে দিয়ে চলে এলেন। পরদিন বলাবলি শুরু হয়ে গেল একজন ব্যক্তি এক বেশ্যা রমণীর হাতে যাকাতের টাকা দিয়ে গেছে! লোকটা আজও এ ভেবে বড়ই মর্মাহত হলেন- টাকাগুলো দিলাম তো একজন নষ্টা মেয়েকেই দিলাম।
আল্লাহর উপর ভরসা করে গোপনে দান করার আশায় তৃতীয় রজনীতে আবার বের হয়ে পড়লেন। আজ বহু যাচাই-বাছাই করছেন। শেষ পর্যন্ত রাতের শেষ ভাগে এক ব্যক্তিকে যথাযথ পাত্র হিসেবে চিহ্নিত করলেন। অতি সন্তর্পণে তার হাতে টাকাগুলো দিয়ে ফিরে এলেন। লোকটা ছিল এলাকার কৃপণ শ্রেণীর এক ধনাঢ্য ব্যক্তি। পরদিন চতুর্দিকে রটে গেলো, একজন ধনীর হাতে (অর্থাৎ অনুপযুক্ত লোকের হাতেই) যাকাতের টাকা দেয়া হয়েছে।
লোকটা ক্ষোভে-দুঃখে অনুশোচনা করে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন, হে আল্লাহ তোমারই শোকর। তোমার হিকমত বুঝতে পারছিনা। এত যাচাই করার পরও চোর, যেনাকারিণী আর একজন ধনীর হাতেই আমার যাকাতগুলো দিলাম। তিনি এলহাম (স্বর্গীয় প্রেরণা) প্রাপ্ত হলেন, তোমার চিন্তার কোন কারণ নেই। যেহেতু তোমার এ বদান্যতা ও গোপন দান তারা তিনজনেরই জীবন চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে। চোর চুরি বিদ্যা আর ব্যভিচারীনী পতিতাবৃত্তি ছেড়ে সারা জীবনের জন্যে সৎ বনে গেছে এবং কৃপণ ধনী ব্যক্তিটি বুঝতে পেরেছে দানশীলতার মাহাত্ম্য।
৯. মহান আল্লাহর বাণী-

وَفِىْ اَمْوَ الِهِمْ حَقٌّ مَّعْلُوْمٌ لِلسَّآئِلِ وَالْمَحْرُوْمِ

অর্থাৎ ধনীদের সম্পদে দরিদ্র ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে। একমাত্র বাধ্যতামূলক এ যাকাতের বিধান দ্বারাই এটা প্রতিষ্ঠিত হয়।
১০. যাকাত ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়নে সমাজ ও রাষ্ট্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থনীতি গড়ে ওঠার ফলে চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাই, খুন-খারাবী বন্ধ হয়ে যায়। সমাজে যাকাতদাতার একটি সম্মানজনক অবস্থান সৃষ্টি হয়। এক কথায় সুষম অর্থনৈতিক বন্টন, সামাজিক উন্নয়ন, রাষ্ট্রে পারষ্পরিক ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে যাকাতের সুদূর প্রসারী ভূমিকার কথা কে অস্বীকার করতে পারে? -সুত্রঃ গাউসিয়া তারবিয়াতী নেসাব-

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply